আকাশটা যেন আরও কাছে চলে এসেছে।সামনের সবুজ ফাঁকা জায়গাটার বেশীরভাগটাই আজ কংক্রিটের দখলে।আজকাল সবকিছুই যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে শীতটাও কেমন যান তাড়াতাড়ি চলে গেল। বসন্ত এসে গেছে। এক অদ্ভুত গুমোট ভাব। গতকাল এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে, আজকে তার সামান্য রেশ মাত্র নেই। একটা হাল্কা হাওয়া তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ ছাদের ধারে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কমলেশ্বর বাবু। কমলেশ্বর সেন। আজকাল মানুষ ভীষণ যান্ত্রিক। কমলেশ্বর হতে পারেন নি। মোবাইলটা আজও চার্জের অভাবে। নিস্তেজ হয়ে পকেটে ঘুমিয়ে আছে। বাবলু ছাদের লাইটটা জ্বালাতে এসে জিজ্ঞাসা করলো-“ কি জেঠু, এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, নিচে যাবেন না?” তন্দ্রাটা হঠাৎ করে ভেঙে গেল। এই সব কিছু তার কত আপন, এই ছাদ, এই হাওয়া, এই আকাশ, সামনের জঙ্গল সব। ছাদের এই জায়গাটা থেকে মনে হয় আকাশের ভীষণ কাছে চলে এসেছে, ইন্দিরাও দেখতে পাচ্ছে। আজ তিনবছর হল ইন্দিরা চলে গেছে, আজ একবছর উনি ফ্ল্যাটে।

প্রথম যখন ইন্দিরাকে এই জায়গাটা দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন, বাড়ী গিয়ে ইন্দিরা তিনদিন কেঁদেছিল।প্রায় এক সপ্তাহ কথা বলেনি। শহর থেকে অনেক দূরে এই জমিটা কেনার আগে কমলেশ্বর কোনও আলোচনাই করেনি ইন্দিরার সাথে। এছাড়া কোনও উপায় ও ছিল না।

দেশভাগের সময় নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এসে সারাটা জীবন বাবা একটা নিজের বাড়ী খুঁজেছিলেন, পাননি। কমলেশ্বরের মধ্যে সেই অন্বেষণের বীজ বপন করে ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। তার কিছুদিন পর মাও চলে গেলেন। নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা শেষ করে একটি আধা সরকারী অফিসে চাকরী যোগাড় করেন। তারপর ইন্দিরাকে বিয়ে করে সংসার পাতেন হাতিবাগানের একটি ছোট্ট দুই কামরার বাড়ীতে। তারপর সরকারী ব্যবস্থাপনায় শহর থেকে বেশ দূরে এই জমিটি কেনেন বেশ সস্তায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।

বাড়ি তৈরি করে দেন আস্তে আস্তে। প্রথমে ইন্দিরা কোন উৎসাহই দেখাতো না। কমলেশ্বর প্রায় রোজ বাড়ি ফিরে এসে নতুন বাড়ীর খুঁটিনাটি ইন্দিরাকে শোনাত কতদূর এগোল, কোথা থেকে ইট আনছেন, মার্বেল দিচ্ছেন কোনখানে, মোজাইক করবেন না লাল মেঝে, বারান্দাটাতে গ্রিল কি দেওয়া হচ্ছে। আসলে বাড়ীটার সাথে ইন্দিরাকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতেন। “কি গো একদিন যাবে নাকি তোমার নতুন বাড়ী দেখতে” কমলেশ্বর জিঞ্জাসাও করেছিলেন। খুব শান্ত ভাবে ইন্দিরা উত্তর দিয়েছিল, “ আমার নয়, বাড়ীটা তোমার। যেদিন বলবে সেইদিনই যাব।” তারপর থেকে ইন্দিরাকে বাড়ীর ব্যাপারে বিশেষ কিছু বলতেন না কমলেশ্বর।

মানুষ যখন নিষ্ঠা নিয়ে কোন কাজ করে, এবং প্রতিদিন সেটাকে পুরো করার অঙ্গিকার নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন সময়ের নিয়মে সেটা শেষও হয়। সেই একই নিয়মে বাড়ী তৈরিটাও শেষ হয়।

একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ী, নিচের তলায় তিনটে ঘর, একটি বারান্দা, সামনে একটি বসার যায়গা, বাড়ীর সামনে একটু যায়গায় ছোট্ট একটা ফুলের বাগান, ইন্দিরা ফুল ভালবাসে। বাড়ীর নাম “ইন্দিরা ভবন”।

এখন কোলকাতা থেকে সরাসরি কোনও বাস এখানে এসে পৌঁছায় না। যায়গাটা থেকে বেশ দূরে নেমে হেঁটে বা রিক্সাতে এখানে আসতে হবে। রিক্সাও সবসময় পাওয়া যায় বললে ভুল হয়। বাজারটাও বসে বেশ একটু দূরে।

সব না পাওয়াকে সাথে নিয়েই সংসারটাও জমে উঠলো কমলেশ্বর ও ইন্দিরার। ইন্দিরাও আস্তে আস্তে যায়গাটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো। আস্তে আস্তে একটার পর একটা বাড়ী তৈরি হতে আরম্ভ হল। নতুন প্রতিবেশীরাও বেশ ভাল। সবাই মিলে সুখ-দুঃখে একটি পরিবারের মতো বসবাস শুরু করলো শহরের উপকণ্ঠে। কমলেশ্বর আর অন্যদের তত্ত্বাবধানে যায়গাটা আরও সুন্দর হতে আরম্ভ করল। পাকা পিচ এর রাস্তা, আলো, একটা বাজার, সবকিছুই তৈরি হল কমলেশ্বরের চোখের সামনে।

আসলে প্রথম দিন থেকেই জায়গাটা কমলেশ্বরের পছন্দ হয়েছিল, যখনই দেখতেন কোন নতুন বাড়ীর ভিত পোঁতা হচ্ছে, তখনই তখনই বাড়ীর মালিকের সাথে ভাব জমিয়ে নিজেদের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে আসতেন। এইভাবে সবার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

ততদিনে কমলেশ্বর আর ইন্দিরার জীবনে এসে গেছে এক নতুন মানুষ, ওদের সন্তান ইন্দ্র। দিনগুলো খারাপ কাটছিল না। ইন্দ্র বড় হয়ে উঠছিল। সাথে সাথে এই নির্জন জায়গাটাও বেড়ে উঠছিল কালের নিয়মে। বসবাসকারী প্রত্যেকের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিবিড়তাও পেয়ে যাচ্ছিল কালক্রমে। শহর থেকে দূরে বলে এখন শহুরে দামালপনা জায়গাটাকে গ্রাস করেনি। প্রথম বছরের সার্বজনীন দুর্গোৎসবের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন কমলেশ্বর। নিজেদের বসা, আড্ডা মারার জন্য একটা ছোট্ট ক্লাবঘরও করা হয়েছে। উফঃ কই সুন্দর দিন ছিল তখন।

যায়গাটার সেই বৈচিত্র্য আর অবশিষ্ট নেই। শহর বৃদ্ধি পেয়েছে দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে। এই কয় বছরে প্রচুর নতুন মানুষ এইখানে এসে নিজেদের বসতি করেছে। যেই যায়গাতে আসার কথা শুনে ইন্দিরা প্রায় সাতদিন কথা বলেনি, সেই যায়গায় প্রচুর নতুন মানুষ প্রায় প্রতিদিন চলে আসছে। কমলেশ্বর শুনেছেন অনেকেই নাকি তার পৈত্রিক বাড়ী বিক্রি করে এইখানে চলে আসছে। মানুষের সংসার সাথে মাটির পরিমাণের সামঞ্জস্য দিনের পর দিন কমে যাচ্ছে। তাই সবাই এখন অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একটা ফ্ল্যাটে থাকে। সমগ্র বিশাল একটা আকাশচুম্বী বাড়ীর খুপরি খুপরি যায়গা। নিজেদের মাটিও না, আকাশও না। সবাই মাঝখানে ঝুলছে। কেউ কাউকে চেনে না। নিজেদের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ নেই। মানুষ একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

এইসব ভাবলেই কমলেশ্বরের আজকাল ভীষণ কষ্ট হয়। কমলেশ্বরের জীবনেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। ইন্দ্রর পড়াশোনা শেষ করে একটা ভাল চাকরি পেয়েছে। বছর দুয়েক হল ইন্দ্রর বিয়ে হয়েছে, আর তাদের একটি খুব সুন্দর সন্তান এসেছে। কমলেশ্বরের আদরের নাতনী রিনি। একবছর হয়ে গেছে ইন্দিরা ইহলোক ত্যাগ করেছে। কমলেশ্বরও চাকরী থেকে অবসর পেয়ে গেছেন। এখন প্রায় সারাদিন রিনির সাথে সময় কাটান। ভালই আছেন।

 

“আমাদের কোনও কথাই কি তুমি শুনবে না বাবা ?” – বেশ চেঁচিয়েই বলেছিল ইন্দ্র। বেশ অবাক হয়েছিলেন কমলেশ্বর। ইন্দ্র এইভাবে কোনোদিন তাঁর সাথে কথা বলেনি। “কি অসুবিধা হচ্ছে আমি তো বুঝতেই পারছি না। তোমরা ওপরে থাক, আমি নিচে থাকি। এই বাড়ী আমি কাউকে দেব না”- দৃঢ় উত্তর দিয়েছিলেন কমলেশ্বর।

কয়েকদিন ধরেই এই ঝামেলাটা আরম্ভ হয়েছে। ইন্দ্র চায় বাড়ী ভেঙে একটা অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে। এখন ফ্ল্যাটে থাকাই ভাল। নিজেদের মত সাজানো যায়। এই কয়েকদিনে ফ্ল্যাটের প্রচুর উপকারিতা তালিকা জানিয়েছে কমলেশ্বরকে। ইন্দ্রর এক প্রোমোটার বন্ধু প্রায়ই বাড়ীতে যাতায়াত করছে।কমলেশ্বর এই ব্যাপারে ভীষণ জেদি, কিছুতেই বাড়ী উনি দেবেন না। বিভিন্ন দিক থেকে চাপ দেওয়ার পর ইন্দ্র সবথেকে বড় খেলাটা খেলল। রিনিকে তাঁর দাদুর কাছে আসা বন্ধ করে দিল। আসলের থেকে সুদের প্রতি মানুষের লোভ চিরকালই বেশী থাকে। কমলেশ্বর সেন এইবার ভেঙে গেলেন। বাড়ীর জন্য সংসারটাই যদি না থাকে তাহলে কি লাভ। ইন্দিরা চলে যাওয়ার সময়ও এত দুঃখ পাননি। নিজের জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি, সবথেকে বড় কৃতিত্ব চলে গেল, প্রোমোটারের হাতে।

আজ সাতদিন হয়েছে কমলেশ্বর ফ্ল্যাটে চলে এসেছেন। তিনতলায় সামনে পেছনে মিলিয়ে বেশ বড় একটা ফ্ল্যাট। প্রথম কদিন কমলেশ্বর শুধু তাঁর পুরনো বাড়ীর সাথে এই নতুন অবস্থানের তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। ভীষণ গুমোট মনে হয়েছে। ওনার একতলাটা হয়তো এর থেকে ছোট ছিল, কিন্তু কত নিজের ছিল। ইন্দ্রর সাথে আর স্বাভাবিক হতে পারেন না। নিজের ছেলেকে ভীষণ বড় খুনি মনে হয়। অনার আপন সন্তানের খুনের একমাত্র চক্রান্তকারী। আজ জীবনে যদি কোন টান থাকে তা হল রিনি। ওর মধ্যে কমলেশ্বর ইন্দিরার ছবি দেখতে পান।

লিফটের সাথে এখনও খুব একটা অভ্যস্ত হননি কমলেশ্বর। তাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা ব্যহত হচ্ছে। ফ্ল্যাটের বাকি বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করারও কোন সুযোগ নেই। এই অ্যাপার্টমেন্টের সবথেকে ভাল লেগেছে এইখানকার ছাদটা। বিশাল। আকাশের কাছাকাছি। এই ছাদ থেকে সামনের অনেকটা দেখা যায়, ভাল লাগে। আশেপাশের বাড়ীগুলোও আস্তে আস্তে অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে যাচ্ছে। এইসব মানুষগুলো কষ্টকরে নিজেদের মত করে এই যায়গাটা সাজিয়েছিলেন। বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব করেন আজকাল।

সবাই ছাদ থেকে ধরাধরি করে কমলেশ্বরের নিথর দেহটা নামাল তখন রাত এগারটা। ইন্দ্র অফিস থেকে এসে বিশ্রাম নিয়ে রাতে খাবার খাওয়ার অনেকক্ষণ পর, বাবার ঘরে আলো নেভানো দেখে একটু অবাক হয়েছিল। সৌমীকে জিজ্ঞাসা করে জানল যে ও কিছু জানেনা। সৌমী সিরিয়াল দেখছিল। “ বাবার আসাটা আমি লক্ষ্য করিনি”-সৌমী বলেছিল। বাবলু বলল সে জেঠুকে শেষবার ছাদে দেখেছিল।

শহরের গুমোট ভাবটা এখনও কাটেনি। আকাশটাও ঘোলাটে হয়ে আছে। বৃষ্টি পড়বে মনে হয় কংক্রিটের জঙ্গলে। জীবন এগিয়ে যাবে জীবনের মতো।

Latest posts by শমীন্দ্রনাথ ব্যাণার্জী (see all)