আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #১১

কফির কাপটা সশব্দে টেবিলে রেখে চলে যাওয়ার সময় বউ বলে উঠলো, “কাল থেকে নিজের কফি নিজেই বানিয়ে নিও। আমার হাতের কফি তো তোমার মুখে রোচেনা।” কফি বানাত বটে বিরূপাক্ষ বাবুর মা। সারা বাড়ি ম ম করতো কফির খোশবু তে। কফি আসতো বাবার পছন্দের এক দোকান থেকে। সময় পাল্টাতে কফির স্বাদ ও পাল্টে গেল। বাবা কফি খাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। কাপে চুমুক দিয়ে, বিস্বাদে, মুখ বিকৃত করে বিরূপাক্ষ আপনমনে বলে উঠলেন, “আজ অফিস ফেরতা বাবার পছন্দের সেই কফির দোকানটা হয়ে ফিরব।” বসার ঘরের ফটো ফ্রেম থেকে বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা খুক করে হেসে উঠলেন।
বিরূপাক্ষ কথা #১২

বৃষ্টি নামলেই বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ করে। ভেজা মাটির গন্ধে, তাতে মিশে থাকা কোনও অজানা ফুলের মিষ্টি গন্ধে, মন কেমন করা অনুভূতিরা দানা বাঁধে চোখের কোনে। মনে পড়ে তাদের পুরনো বাড়িটার কথা, ছাদের ঘর, দালান কোঠা… রাঙাদাদুর ঘরের ফিলিপ্স রেকর্ড প্লেয়ার থেকে ভেসে আসা মেহেদি হাসানের কণ্ঠ “মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে, তেরি মেহফিল মেঁ লেকিন হম না হোঙ্গে।” রাঙাদাদু বিয়ে করেননি। শোনা যায় বিদেশে থাকাকালীন একজন কে ভালবেসেছিলেন। রাঙাদাদুর বাবা রাজি হননি। ছেলেও জিদ্দি বাপের মতন। বেঁকে বসলেন বিয়ে করবেননা বলে। ছেলের জেদের কাছে বাপ হার মেনেছিল। রাঙাদাদু যেদিন মারা যান, আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছিল। উঠোনে শোয়ানো দেহটার ওপর বিরূপাক্ষ বাবুর বাবা একটা ছবি রেখে দিয়েছিলেন। তাতে এক জার্মান মহিলা, সম্ভবত সেই জন যাকে রাঙাদাদু ভালোবাসতেন। শ্মশানে দাদুর সাথে ছবিটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাইরে তাকিয়ে বিরূপাক্ষ বাবু গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন “অগর তু ইত্তিফকন মিল ভি যায়ে, তেরি ফুরকত কে সদমে কম না হোঙ্গে মহব্বত করনেওয়ালে কম না হোঙ্গে।
বিরূপাক্ষ কথা #১৩

মন্দিরের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কপালে হাত ঠেকাতেই পাশের সিটে বসা বৌদি খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আবার ভগবানে ভক্তি হল কবে থেকে?” বিরূপাক্ষ মুচকি হেসে বললেন, “রক্তমাংসের মানুষরা দু বেলা বিশ্বাস ভাঙ্গছে। চেনা সব লোক। এও না হয় ভাঙ্গবে। একে চোখেও দেখিনি, চিনিওনা। তাই ড্যামেজ কম, রিস্ক ও”। বউ মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো, “একটা উন্মাদ লোককে বিয়ে করে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল।” বিরূপাক্ষ বাবু শুনেও শুনলেন না। আজ মাসের পয়লা, বুয়াকাকার বাড়ি যাওয়া আছে।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৪

হাসপাতালে এক বন্ধুর মাকে দেখে বেরোনোর সময় চোখ পরে গেল স্ট্রেচারে শোয়ানো একটা দেহের দিকে। বছর চব্বিশ বয়েস, মাথার পেছন দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সাদা চাদর ভিজিয়ে দিয়েছে। পাশে দাঁড়ানো ওয়ার্ড বয় বলে উঠলো বেওয়ারিশ লাশ,মর্গে পাঠানো হবে। নিজের গায়ের থেকে চাদরটা খুলে দেহটা ঢেকে দিলেন বিরূপাক্ষ। অবাক চোখে ওয়ার্ড বয় জিজ্ঞেস করলো, “চেনেন নাকি?” “জানিনা” বলে বেড়িয়ে এলেন বিরূপাক্ষ বাবু। “পাগল, না কি?” কানে এলো ওয়ার্ড বয়ের গলা।

 

বিরূপাক্ষ কথা #১৫

হাতঘড়িটা আজ আবার বন্ধ হয়ে গেল। অফিস ফেরতা নিয়ে গেলেন লালবাজারে করিমের দোকানে। পুরনো খদ্দের, তাই করিম নিজেই ঘড়িটা নিয়ে বসে গেল ঠিক করতে। “এবার এটা পাল্টে নিন স্যার। এত পুরনো ঘড়ি, কদিন বাদে আর সারাই করাও যাবেনা। বেচলে বলুন, মোটামুটি ভালো দাম দেব।” “এই ঘড়ি দাদু এনেছিলেন লন্ডন থেকে। ওনার পরে বাবা পড়তেন, এখন আমি পড়ি। বোসেদের তিনপুরুষের দিনবদল দেখেছে এই ঘড়ি। তার কত দাম ধরবে করিম মিয়াঁ?” করিম এই সব বোঝেনা। ঘড়ির মেশিনে ফোঁটা ফোঁটা তেল ঢালতে ঢালতে আড় চোখে দেখে এই অদ্ভুত মানুষটাকে, যে মায়ার চোখে তাকিয়ে আছে ১০০ বছরের পুরনো ঘড়িটার দিকে।

 

(চলবে)