আগের পর্ব

বিরূপাক্ষ কথা #৬

ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে একটা ভালো চাকরি পেয়েছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। শত হোক, শিবপুর কলেজের সেরা ছাত্রদের মধ্যে একজন। যাওয়ার সব ঠিক, হঠাৎ বেঁকে বসলেন বিরূপাক্ষ। যে শহরের অলি গলি ওনার নিজের, যে শহরের প্রত্যেকটা মানুষ কোথাও না কোথাও গিয়ে তার নিজের লোক, সেই শহর ছেড়ে যাওয়া যায় নাকি?

বছর পনেরো পরে, বিদেশে সেটল করা বন্ধুদের সাথে স্কচ খেতে খেতে বিরূপাক্ষ বাবু বলে ওঠেন,

“এই শহরটার বড় মায়া গো। যেতে চাই, কিন্তু যেতে দেয়না। আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে মায়ের আঁচলের মতো।”

 

বিরূপাক্ষ কথা  #৭

পেল্লাই পরিবারটা ছোট হতে হতে যখন দুটো ৩ কামরার ফ্ল্যাটে এসে ঠেকলো, বিরূপাক্ষ বাবুর মন খারাপ বেড়ে চললো। কতগুলো মানুষ ফটো ফ্রেমে আটকা পড়ে গেল, শুকনো মালা ঝুলে রইলো জং ধরা পেরেকে। মাঝে মাঝেই পুরোনো কলকাতায় নিজেদের পুরোনো বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন উনি। এখানেই তো কত হাসি শোনা যেত একসময়। এখন পায়রার গুমরানো শোনা যায় কান পাতলে। শ্যাওলা ধরা ফলকে নামটা আর পড়া যায়না। মুচকি হেঁসে ফিরে আসেন বিরূপাক্ষ বাবু। অস্ফুটে বলে ওঠেন “ভালো থেকো”।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৮

বাপের চাপে বিয়ে করেছিলেন ঠিকই, এক ছেলের বাপ ও হয়েছিলেন, কিন্তু মনের মিল হয়নি বিরূপাক্ষ বাবুর। বউ কবিতা পড়েনা, গানেও বিশেষ রুচি নেই। সন্ধ্যে হতেই টিভি চ্যানেলে গুচ্ছের বাজে সিরিয়াল দেখে। ঘর আলাদা অনেকদিন ধরেই, কাছেও বিশেষ আসা হয়না। অফিস থেকে ফিরে আলমারি খুলে একটা পুরোনো হয়ে যাওয়া রুমাল বার করে প্রানভরে ঘ্রাণ নেন বিরূপাক্ষ বাবু। খোঁজেন সেই অতিপরিচিত ল্য অরিগান পারফিউমের গন্ধ। প্লাইউড আর ন্যাপথলিনের গন্ধ ওনার মন আরো খারাপ করে দেয়। বসার ঘর থেকে ভেসে আসে টিভির শব্দ। উঠে দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। রুমালটা ঠিক জায়গাতে রেখে জানলা খুলে বাইরে তাকান।
“তোমার পারফিউমের গন্ধে আমার মন খারাপ কেটে যায়।”
এক বৃষ্টির দুপুরে বলা কয়েকটা কথা মনে পড়ে যায়।

 

বিরূপাক্ষ কথা #৯

প্রথমে রাঙাদাদুর ল্যান্ডমাস্টার, পরে বাবার কালো ফিয়াট চালাতো বুয়া কাকা। মোটা গোঁফ, আর বিশাল একটা ভুঁড়ি, বুয়া কাকাকে দেখেই ভয় লাগতো ছোট বিরূপাক্ষর। সেই বুয়া কাকার কাছে গাড়ি চালানোর হাতেখড়ি। বিরাট ভুঁড়ির ওপর বসে, স্টিয়ারিং ধরে নিজেকে বড় ভাবতে ভাবতেই একদিন সব পাল্টে গেল। একে একে বিক্রি হয়ে গেলো ল্যান্ডমাস্টার, কালো ফিয়াট। এর সাথে কোথাও একটা চলে গেল বুয়া কাকা।
সেই বুয়া কাকা কে বাসস্ট্যান্ডে ভিক্ষে করতে দেখে এগিয়ে গেলেন বিরূপাক্ষ বাবু। সময় বড্ড নিষ্ঠুর। গিয়ে পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “চিনতে পারলে বুয়া কাকা? আমি বিরু, বোস বাড়ির বিরু”।
চোখ বেয়ে নেমে আসা জল বলে দিলো বুয়াকাকা কিছুই ভোলেননি। কাকার হাত ধরে রাস্তা পার করে নিয়ে এলেন অন্যদিকে। একজন কে দেবেন বলে হাজার দশেক টাকা তুলেছিলেন, সেটা পকেটেই ছিল। খামটা বার করে বুয়া কাকার হাতে তুলে দিলেন।
“প্রতি মাসে তোমাকে আমি টাকা দিয়ে যাবো। তুমি আর কারোর কাছে হাত পাতবেনা। না বোলোনা, আমি শুনবনা।”
ভেজা চোখে বুয়া কাকা তাকিয়ে রইলেন সেই ছোট্ট বিরুর দিকে, হাত দিয়ে চেপে ধরলেন ওর হাত, যে ভাবে একদিন স্টিয়ারিং ধরতে শিখিয়েছিলেন।
“বড় হয়ে গেলি বিরু।”
“তুমি বুড়ো হয়ে গেলে কাকা।”
যে গাড়ি সোজা রাখতে শিখিয়েছিল, তার হাত ধরে আজ বাড়ি পৌঁছে দিতে দিতে বিরূপাক্ষ বাবু মনে মনে ছেলেবেলাতে ঘুরে এলেন।

 

বিরূপাক্ষ কথা  #১০

এক অলস বিকেলে কলেজ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান খুঁজছিলেন বিরূপাক্ষ বাবু। রহমতের ওই দোকান থেকে একসময় অনেক দুষ্প্রাপ্য বই কিনেছেন তিনি। সময়ের অভাবে অনেকদিন আসা হয়নি। ঘন্টাখানেক খুঁজেও সেই দোকানটা দেখতে পেলেন না। একজন কে জিজ্ঞেস করতে সে অবাক মুখে বললো ওখানে কোনোদিনও ওরকম কোনো দোকান ছিলনা। রেগে বিরূপাক্ষ বলে উঠলেন, ধুর মশাই, বছর কয়েক আগেও আমি ওই দোকান থেকে বই কিনেছি, ছিলনা বললেই হবে? সেই লোকটি বলে উঠলো, ৫০ বছর এই তল্লাটে ব্যবসা করছি, ওরকম কোনো দোকান কস্মিনকালেও দেখিনি… রহমত বলে কোনো দোকানি এখানে নেই। আরো দু একজন ওর কথায় সায় দিলো। একটু অবাক হয়ে বাড়ি ফিরে, বইয়ের তাকে খুঁজলেন সেই সব বই যা তিনি রহমতের দোকান থেকে কিনেছিলেন। কোথাও কিছু নেই। শুধু একটা তাকে উইয়ে খাওয়া কিছু পাতা পড়ে আছে। হলদে হয়ে যাওয়া কিছু পাতা। হাতে ধরতেই গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

 

(চলবে)