Bodhan

বড় মাঠের মাঝে প্যান্ডেল করে পুজো। সারা গ্রামের এই একটাই দুর্গাপুজো। ঈশ্বরের কৃপায় চাষবাস ভালোই হয় এই গ্রামে। পরিকাঠামোগত কিছু সমস্যা ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা বা দারিদ্রের প্রকোপ নেই চণ্ডীপুরে। অতএব বেশ জাঁকজমক করেই পুজোটা হয়। বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুঁড়ি ওড়ানোর হৈ চৈ এর পর গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে দুর্গাপুজো নিয়ে। এই সময়টা খেলাধুলোও প্রায় বন্ধ। স্কুল থেকে ফিরেই সব গিয়ে জড় হয় পুজোর মাঠে। হ্যাঁ, এই মাঠেই সব পুজো হয় বলে মাঠটার নামই হয়ে গেছে পুজোর মাঠ। প্রতিমা শহর থেকে আনানো হয়না। মাঠেরই একধারে বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে ছোট প্যান্ডেল করে সেখানেই ঠাকুর গড়েন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা।

আর এইখানেই কচি কাচাদের যত আকর্ষণ। অবাক বিস্ময়ে ওরা দেখে কাকু, জেঠুরা বাঁশের কাঠামোয় খড় বেঁধে তাতে মাটির প্রলেপ লাগিয়ে কিভাবে তিলতিল করে প্রতিমা গড়ে তুলছে। দেখতে দেখতে খুব লোভ হয় কাজে হাত লাগানোর। চেয়ে চিনতে অনেক বায়না করে কখনো বা একটু সুযোগ মেলে গণেশের ভুঁড়িতে গোলাপি রঙের কয়েক টান মারার অথবা কার্তিকের ময়ূরের গলায় নীল বা সিংহের গায়ে হলুদ রঙের ছোঁয়া দেওয়ার। তবে সবচেয়ে বেশি মজা শেষের দিকে, প্রতিমা গড়ার কাজ শেষ করে তখন সাজসজ্জার পালা। শোলা, জড়ি, চুমকি এসবে ছোটদের লোভ তো চিরন্তন। আর ভাগ্যক্রমে যদি একটু জড়ি বা চুমকি মাটি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া যায় তাহলে তো আর কথাই নেই।

গ্রামের বাকি ছেলেমেয়েদের মত অপু-দুর্গা ও স্কুলের পরে সটান হাজির হয় মাঠে। নাম আর দুই ভাই বোনের সম্পর্ক ছাড়া আর বিশেষ কিছু মিল নেই ওদের পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার সাথে। অভাব অনটনের জ্বালা নেই ওদের। অবশ্য বিভূতিভূষণের সেই গ্রাম ও নেই আর। ওদের বাবা কেন্দ্র সরকারের বেতনভোগী, মা গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের দিদিমণি। হ্যাঁ, পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার সঙ্গে মিল আছে বটে আরেকটা জায়গায়। হরিহরের মত ওদের বাবাও ওদের সঙ্গে থাকতে পারে না। ওদের বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করে। সুতরাং সারাবছরে কেবল একটি মাস ই বাড়িতে থাকতে পারে। বাকি সারাবছরই জলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, পর্বতে পড়ে থাকতে হয়।

বাবাকে নিয়ে খুব গর্ব দুর্গার। ওর বাবার মত কিছু মানুষ নিজেদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ, পরিবার সব ত্যাগ করে দেশের সেবা করে বলেই তো বাকি দেশশুদ্ধু লোক নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। যুদ্ধই হোক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে অন্যের প্রাণ বাঁচানোর মত কলজের জোর কজনের থাকে? শুধু দুর্গা নয়, ওর বাবাকে নিয়ে গ্রামের সকলের গর্ব। এই গ্রাম থেকে প্রথম কেউ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। চিরকালই খুব ডাকাবুকো অথচ সহজ, সরল, পরোপকারী ছেলে। কারগিলের যুদ্ধে বীরত্বের জন্য মেডেল পাওয়ার পর যখন ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, ট্রেন থেকে নেমে আর কেউ হাঁটতে দেয় নি ওকে। বাড়ি অবধি কাঁধে করে নিয়ে গেছিল।

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও উত্তেজনার ঠেলায় কদিন ধরে ইন্দ্রজিতের ঘুম আসছে না। কতবছর পর পুজোয় বাড়ি যাবে। শেষ কবে পুজোয় বাড়ি গেছে মনেও পড়ে না। বাড়িতে বলে রেখেছে একদিন সকলে মিলে কলকাতায় গিয়ে পুজোর কেনাকাটা করবে। দুর্গা বলেছে ওর ‘আনারকলি সালওয়ার’ চাই। ইন্দ্রজিৎ অতশত বোঝে না। জিজ্ঞেস করেছিল “সেটা আবার কি রে?” মেয়ে বলেছিল ” তোমায় অত বুঝতে হবে না বাবা, ও আমি ঠিক দেখে কিনে নেব।” মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে ঠোঁটের কোনায় হাঁসি খেলে গেল। সত্যি মেয়েটা কত বড় হয়ে গেল, এই সেদিন জন্মাল। অপুর জামা কাপড়ে কোনো লোভ নেই। শুধু বলেছে “বাবা আমি মেট্রো চড়ব আর বিরিয়ানি খাব।” পরমার তো নিজস্ব কোনো চাহিদাই নেই। যা কিনে দেবে তাতেই খুশি। পরমার কাছে ইন্দ্রজিৎ ঋণী। বছরের পর বছর একা হাতে সবকিছু সামলে যাচ্ছে পরমা। হাঁসিমুখে।

রাতের নিস্তব্ধতা চিড়ে গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠল পাহাড়ি উপত্যকা। রিফ্লেক্সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ইন্দ্রজিৎ। সতীর্থরাও সবাই। এ তো সীমান্তের লড়াই নয়, আওয়াজ তাঁবুর ঠিক বাইরে থেকেই আসছে। ছুটে বাইরে বেরোতে যাবে এমন সময় কান ফাটানো শব্দে ধেয়ে এল এক বিশালাকার আগুনের গোলা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন্ত জ্বলে গেল আঠারোটা তাজা প্রাণ। শেষমুহূর্তের আর্ত চিৎকার, করুণ প্রার্থনা সব চাপা পড়ে গেল গোলাগুলির পৈশাচিক শব্দে। ভোরের আলো যতক্ষণে ফুটল, ততক্ষণে সব শেষ। সেনা ছাউনিতে তখন শুধু মৃত্যুর হাহাকার। বারুদের কালো ধোঁয়া, পোড়া মাংসের গন্ধ আর বিকৃত শরীরের স্তুপ। অকালে চলে গেল কতগুলো জীবন, চুরমার হয়ে গেল কত স্বপ্ন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কতগুলো পরিবার। সন্ত্রাসের কারবারিরা সফল। এই তো চেয়েছিল তারা।

আজ ষষ্ঠী, দেবীর বোধন। সকাল থেকেই ঢাকে কাঠি পড়ে গেছে আশে পাশের গ্রামে। হৈ চৈ, উত্তেজনা। চণ্ডীপুরে তখন শ্মশানের স্তব্ধতা। বেলা গড়াতে চলল, এখনো সঙ্কল্পও হয়নি। পরিত্যক্ত প্যান্ডেলে স্বপরিবারে দাঁড়িয়ে আছেন মা দুর্গা। এবছর আর পুজো হবে না। সকলের ক্ষোভ আর অভিমান আছড়ে পড়েছে মা দুর্গার ওপর। মা, তুমি এমনটা করতে পারলে? এত নিষ্ঠুর তুমি? আজ বাড়ি ফেরার কথা ছিল ইন্দ্রজিতের। ফিরেছে। কফিনে বন্দী হয়ে, জাতীয় পতাকায় মুড়ে। খবরটা এসেছিল দুদিন আগেই।

স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল পরমা। অপু দুর্গা ইতিমধ্যেই চলে গেছে। মোবাইলটা বাজছিল। কপালে সিঁদুরের টিপ টা পড়তে পড়তে ব্যস্ত হাতে ফোনটা ধরল পরমা। সরাসরি ইস্টার্ন কমান্ড থেকে ফোন। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলায় শহিদ হয়েছেন ওর স্বামী। সিঁথিতে আর দেওয়া হল না সিঁদুর। শহীদের বাড়ির লোকেদের কাঁদতে নেই, তাতে শহিদের অসম্মান। শান্ত গলাতেই একে একে সকলকে জানালো দুঃসংবাদটা। বুকে জড়িয়ে ধরল বৃদ্ধা শাশুড়িকে। ওর তো কাঁদলে চলবে না। এই পরিবারকে আগলে রাখার দায়িত্ব এখন থেকে ওর একার।

‘গার্ড অফ অনার’ সহ পূর্ন সামরিক মর্যাদায় ইন্দ্রজিতের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল ওদেরই  গ্রামের শ্মশানে। মৃত স্বামীর বিকৃত শরীরটাকে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারেনি পরমা। ছেলে মেয়েদের দেখতে দেয়নি। গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা জড় হয়েছেন শ্মশানঘাটে। পরমার বুকফাটা কান্নায় সকলের চোখের জল বাঁধ ভেঙেছে। ছোট ভাইয়ের হাত ধরে দুর্গা এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মাঝে মাঝেই ডুকরে কেঁদে উঠছে অপু। চিতার আগুন তখন প্রায় নিভে এসেছে। দুর্গা এসে দাঁড়াল গ্রামের বৃদ্ধ পুরোহিতের সামনে “দাদু, তুমি পুজোর আয়োজন করো। আজ তো মায়ের বোধন। অশুভ শক্তির কাছে কি মা কখনো হেরে যেতে পারে? ওরা আমাদের একজনকে মারলে আমরা পাল্টে আরো দশজন গিয়ে সামনে দাঁড়াব। কতজনকে মারবে ওরা? আমিও বড় হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেব। আর আমার ভাই ও।” রামদাস পুরোহিত মুখ তুলে এক অন্য দুর্গাকে দেখলেন। এ কোনো ক্লাস নাইনে পড়া মেয়ে নয়, সাক্ষাৎ দানবদলনী মা দুর্গা। ধুতির খুঁটে চোখ মুছে উঠে পড়লেন বৃদ্ধ “যাই পুজোর আয়োজন করি, আজ দেবীর বোধনই বটে”…

 

Latest posts by Piyali Ganguli (see all)