“একটা গন্ধ পাচ্ছিস ? সোঁদা গন্ধ? ” – হাঁটা থামিয়ে, প্রাণায়ামের ভঙ্গিতে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে প্রশ্নটা ছুড়েদেয় সুমন। মুখেচোখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তির ভাব, ঠিক যেন মোক্ষলাভের আগের স্টেজ এ পৌঁছে গেছে। “জঙ্গলেরগন্ধ। এ জিনিস কিন্তু তোর ক্যামেরার লেন্সে ধরা যাবে না।”

কোলকাতার বাইরে বেরোলেই সুমনের মধ্যে রোমান্স জেগে ওঠে। কালকূট, নীললোহিত সবাই একসঙ্গে ভর করে ওকে। শেষের কথাটা যার উদ্দেশ্যে বলা, সে খানিকটা এগিয়ে গেছে ।

– “বকবক না করে পা চালা। ফেরার সময় প্রাণ ভরে শুঁকিস।” – গাইড সুলভ ভঙ্গিতে জবাব দেয় তীর্থ।

– “তাড়া কিসের? সবে তো সোয়া চারটে।”- আমি ঘড়ি দেখে বললাম। “এমন সুন্দর রাস্তায় তাড়াহুড়ো করে হাঁটার কোন মানে হয় না।”

– “কারণ আমি আর ওয়েট করতে পারছি না ভাই। তোদের এই নেচারোলজির ক্লাস করার জন্য তো আরও দুদিন আছে।” একটা ফিচেল হাসি হেসে তীর্থ হাঁটার গতি বাড়াল। অগত্যা আমরাও।

রাস্তাটা সত্যিই সুন্দর। এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে। জন মানুষ নেই, গাড়ি – ঘোড়া ট্রাফিক জ্যাম নেই, বিষাক্ত বাতাস নেই, আর অসহ্যকর হর্নের আওয়াজ ও নেই। দুপাশে জঙ্গল, খানিকটা দূরে দূরে পুরুলিয়ার ট্রেডমার্ক টিলা পাহাড় চোখে পরছে। আজ সকালেই আমরা এসে পৌঁছেছি বরন্তী – তে। পুরুলিয়া জেলার এই গ্রাম,কলকাতাবাসীদের উইক-এন্ড গন্তব্য হিসেবে চমৎকার। বিশাল বড় একটা লেক, জঙ্গল, ছোট ছোট টিলা পাহাড় আর সর্বোপরি অপার শান্তি।

– “অরণ্যের দিনরাত্রি-র সিনটা মনে পড়ছে ?”

সুমনের প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললাম। সত্যি মনে পড়ারই কথা। কারণ আমাদের এই বৈকালিক অভিযান এর গন্তব্য হল বরন্তী থেকে সামান্য দূরে রামজীবনপুর গ্রাম, উদ্দেশ্য – মহুয়ার সন্ধান করা। আর তীর্থর লিডার-সুলভ ভাবভঙ্গিও অনেকটা অসীমের মতই। পুরুলিয়ায় এসে মহুয়া না খাওয়া আর কাশী গিয়ে মাথায় গঙ্গাজল না ছোঁয়ানো অনেকটা সমার্থক, দুটোই ঘোর পাপ। হোটেল ম্যানেজারের বাতলে দেওয়া পথে আমরা এখন হেঁটে চলেছি রামজীবনপুরের দিকে।

প্রায় মিনিট কুড়ি হেঁটে, দূরে একটা গ্রামের চিহ্ন দেখতে পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে।সম্ভবত ওটাই রামজীবনপুর। আমরা প্রবল উৎসাহে এগিয়ে চললাম।

রামজীবনপুর একেবারে নিপাট গ্রাম, মাটির দেওয়াল আর খড় বা টালির চালের অধিকাংশ বাড়ি। একেবারে শরৎবাবুর লেখা থেকে উঠে আসা। একমাত্র স্কুল বিল্ডিংটাই যা চোখে পড়ল বাঁধানো। ইলেকট্রিক এর পোস্ট আরে এক আধটা ডিশ টিভি ছাড়া, আধুনিক সভ্যতার চিহ্ন প্রায় নেই। লোকজন বিশেষ চোখে পড়ল না, সম্ভবত কাজ থেকে ফেরেনি।

তীর্থ অনেকটা এগিয়ে গেছিল। গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা ছোট্ট ঝুপড়ি মত চালাঘর, দেখলাম সেটা থেকেই এক বৃদ্ধের সাথে তীর্থ বেরিয়ে আসছে। বৃদ্ধের খালি গা, শীর্ণ চেহারা। তীর্থ ‘কাকা’ পাতিয়ে নিয়েছে তাঁর সাথে।আমাদের চালাঘরে বসতে বলে কাকা হাঁটা দিলেন তাঁর বাড়ির দিকে। তীর্থর মুখে এভারেস্ট জয়ের হাসি – “ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এক বোতল পঞ্চাশ টাকা।”

– “এদিকে আয় অভি, একটা এক্সপিরিয়েন্স করে যা ।” – দেখি সুমন ততক্ষণে চালাঘরে ঢুকে পড়েছে। উঁকি মেরে দেখি সেটা আসলে চায়ের দোকান, তখনো উনুন জ্বলেনি যদিও। একপাশে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো মাচা ধরণের বসার জায়গা। বুঝলাম সন্ধেবেলা এখানে আড্ডা টাড্ডা বসে।

– “ভেবে দেখ, এদের কিন্তু সিসিডি নেই। আড্ডা মারার জন্যে এদের এসি বা চিকেন স্যান্ডুইচ ও নেই। চা আর মুড়ি তেলেভাজাই যথেষ্ট…

-“ চলে আয়।” বাইরে থেকে হাঁক পাড়ল তীর্থ। সুমনের মুড়ি তেলেভাজার রোমান্সের সবটুকু আর শোনা হল না।বেরিয়ে দেখি কাকা হাতে একটা কাঁচের বোতল আর কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে। বোতলের ভেতরে একটা স্বচ্ছ তরল। এই সেই মহুয়ার মদ ? যার এত গুণগান শুনে এসেছি ? বোতলটা মাঝারি মাপের, বড়জোর হাফলিটার হবে। দেখে বিশেষ ভক্তি এলো না। চোলাই টোলাই না তো ?

তীর্থ ইতিমধ্যে বোতলটা খুলে ফেলেছে, আমার দিকে এগিয়ে বলল – “শুঁকে দেখ।” একটা ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ পেলাম। খানিকটা মধুর মতো, কিন্তু বেশ তীব্র। নাহ, এটা চোলাই হতে পারে না।

কাকা আমাদের নিয়ে চলল তাঁর বাড়ির উঠোনে। একরাশ খড় ডাই করা ছিল একপাশে, তারই থেকে কিছু পেতে দিল আমাদের বসার জন্য। সব ব্যবস্থা দেখে বেশ খুশি হলাম। মহুয়া খেতে হলে এমনভাবেই খাওয়া উচিৎ। এ জিনিস ড্রয়িংরুমে কাঁচের গ্লাসে মানাবে না। মাটিতে বাবু হয়ে বসে, তীর্থর বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়ালাম। বেশ কড়া। সত্যি বলতে, স্বাদ আহামরি কিছু লাগল না। কিন্তু ঐ পরিবেশটা, মাথার ওপর খোলা আকাশ, মাটির বাড়ির উঠোন, খড়ের আসন – এই সব কিছু মিলেমিশে কেমন একটা ঘোর মত লেগে গেল।

কাকা আমাদের পাশেই বসে ছিল, দেখলাম একটু আড়ষ্ট আড়ষ্ট ভাব। তীর্থর বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটা প্রত্যাখ্যান করলেন, ওনার দোকান খোলার সময় হয়ে এসেছে বলে। আমি নাম জিজ্ঞেস করলাম ।

-“বাবুরাম কিস্কু।” বুঝলাম স্বল্পভাষী মানুষ। আমরা এটা সেটা প্রশ্ন করতে লাগলাম, কাকাও আস্তে আস্তে সহজ হলেন। বললেন এই পানীয়টি তাঁর স্বহস্তেই বানানো। ওনাদের গ্রামের সান্ধ্য আড্ডায় আলুর চপ সহযোগে এটি পান করেন ওনারা। সরকারি ভাবে মহুয়া বিক্রি করা নিষিদ্ধ, তাই গ্রামের বাইরে নিয়ে যায় না।

ছোট বোতল, তিন জনের শেষ করতে বেশী সময় লাগল না। এবার ফিরতে হবে। একটু পড়েই অন্ধকার পড়বে, সঙ্গে টর্চ ও নেই। গা ঝারা দিয়ে সবাই উঠলাম। বাড়ি থেকে বেড়িয়ে কাকাও আমাদের সঙ্গে ওর দোকান অবধি এলেন হাঁটতে হাঁটতে। এবার সি-অফ করার পালা। বললাম – “ আসি কাকা। তোমাদের গ্রাম খুব সুন্দর, আবার আসব।”

কাকার মুখের আলতো হাসির রেখা দেখা দিল, গত এক ঘণ্টায় এই প্রথম –“শীতকালে আসলে খেজুরতাড়ি খাওয়াবো।”

Latest posts by অভিদীপ চৌধুরী (see all)