মহারাজ বীরভদ্র নির্ধারিত দিনে শিকারের জন্য যাত্রা করলেন। অনবদ্য শিকারি হিসাবে তিনি সর্বজন বিদিত। কিছুকাল আগেও তিনি শিকারে গিয়েছিলেন। তা ছিল নেহাতই নিজের দক্ষতাকে শাণিত করার প্রয়োজনে। কিন্তু এবারে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আর প্রজাদের মঙ্গলসাধনের সৎ ইচ্ছায় তিনি তার রাজধানী ‘বসুন্ধরা’ পুরনগরীকে যথাসম্ভব আধুনিক করে তুলেছেন। তার মানসনগরী বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি যেমন তার প্রজাদের কাছ থেকে সম্ভ্রম ও আনুগত্য আদায় করেছেন, তেমনই ভিনদেশী রাজন্যবর্গের ঈর্ষাও তাকে আমোদিত করেছে। রাজধানী ব্যতীত রাজ্যব্যাপী তার নগরায়নের পরিকল্পনাও কারও অজানা নয়। এ হেন রাজ্যে খোদ রাজধানীতে অযাচিত এক উপদ্রবের সূত্রপাত হয়েছে, যাতে মহারাজ বীরভদ্রের গর্ব আহত।

বসুন্ধরা নগরীর একধারে রয়েছে রাজ্যেরই অন্তর্গত এক নিবিড় অরণ্য। যে অরণ্যকে আংশিক ভাবে বাসভূমিতে পরিবর্তন করেছিলেন মহারাজ বীরভদ্রের পূর্বপুরুষগণ। বংশানুক্রমিক ভাবে সেই বাসভূমিই বিবর্তিত আর পরিবর্ধিত হয়েই আজকের মহারাজ বীরভদ্রের রাজ্য এবং তার অন্তর্গত বসুন্ধরা নগরী। এই সেই অরণ্য, কৈশোরে যেখানে তিনি হরিণ, খরগোশ ইত্যাদি শিকার করা শিখেছেন। যৌবনকালে যেখানে তিনি বহু সংখ্যক বন্য-মহিষ এবং কিছু সংখ্যক বাঘ সংহার করেছেন। শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্য আজ মহারাজের উদ্যোগে আপাতভাবে নিরাপদ। এই অরণ্য তার রাজ্যকে জন্ম দিয়েছে। অরণ্যের অশির্বাদধন্য রাজধানী বসুন্ধরা পেয়েছে তার বাসভূমি, ভবন নির্মাণের ও ব্যবহারের প্রয়োজনীয় কাঠ আর খাদ্য। রাজা বীরভদ্র পেয়েছেন তার বীরত্বের গর্ব আর শ্রেষ্ঠ রাজার সম্মান।

কিছুদিন যাবত মহারাজ তার প্রজাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাচ্ছেন যে অরণ্য নিকটবর্তী অঞ্চলে গৃহপালিত পশুদের রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হচ্ছে। মৃত প্রাণীদের দেহাবশেষ এবং অন্যান্য উপস্থিত চিহ্ন দেখে প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিক্ষেত্রেই হত্যা করার পর মৃতদেহটিকে অরণ্যের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হত্যাকার্য দেখে অনুমান, এর মূলে কোনও শ্বাপদের ভূমিকা রয়েছে। মহারাজ এই সংবাদে যারপরনাই বিচলিত হয়েছেন। প্রজাদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা তার রাজধর্ম। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রজা শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও তাদের সম্পত্তি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে তারাও যে এই হিংস্র জানোয়ারের শিকার হবেনা তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। কোনও কারণে মহারাজ বীরভদ্র মনে মনে ধারণা পোষণ করছেন যে এই ঘটনা তার বীরত্বকে উপহাস করছে। তিনি খুশী হয়েই এই গুরুদায়িত্ব নিজের হাতে নিলেন।

যথেষ্ট লোক-লস্কর সহ গজাসনে উপবিষ্ট হয়ে তিনি অরণ্যের নিবিড় অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে লাগলেন। সেই পথেই অগ্রসর হলেন যেই পথে সেই হিংস্র শ্বাপদটি তার উপস্থিতির চিহ্ন রেখে গিয়েছিল। এই অরণ্যের সাথে তিনি দীর্ঘদিন পরিচিত। এখন তার সজল-শ্যামল রূপটি যেন আর খুঁজে পান না। মনে হয় যেন এক জনবসতিহীন নগর। দীর্ঘ যে বনস্পতিদের দিকে তিনি একসময় মাথা উঁচু করে বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন, তারা আজ অনুপস্থিত। তিনি জানেন তারা আজ তার নগরে ভিন্নরূপে বিদ্যমান। দিবসব্যাপী অনুসন্ধান শেষে দুই-একটি হরিণ ও কিছু খরগোশ ভিন্ন তেমন কোনও প্রাণী তাদের নজরে এলনা। একটু বিচলিত হলেন তিনি। পরক্ষণেই তার অধরে এক স্মিত গর্বিত হাসির রেখা দেখা দিল। অধিকাংশ পশুদের মৃতদেহ আজ রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন মহলের শোভাবর্ধন করছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে আজ রাত্রে তিনি ফাঁদ পেতে ওই শ্বাপদকে ধরবেন।

গভীর রাত। বৃক্ষরাজির পত্র-গুচ্ছের আড়াল থেকে চাঁদের আলো এসে অরণ্যের অভ্যন্তরে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একটি ছাগশিশু একটি গাছের সাথে বাঁধা। গাছটি সেই শ্বাপদের ব্যবহৃত পথের ধারেই। মহারাজ তার লোক-লস্কর নিয়ে প্রস্তুত। প্রহর ধীর গতিতে অতিক্রান্ত হচ্ছে। বেশকিছু সময় পরে ছাগশিশুটির প্রাণান্তকর চিৎকার শুনে তিনি সতর্ক হলেন। ক্রমশ উপলব্ধি করলেন এক আগন্তুকের আবির্ভাব। ছাগশিশুটির চিৎকার তখন চরমে। অভিজ্ঞ শিকারি বীরভদ্র বুঝলেন আর মাত্র কয়েক মূহুর্তের অপেক্ষা। কিন্তু মূহুর্ত তখন প্রলম্বিত, অপেক্ষার শেষ নেই। হঠাৎই মূহুর্তের জন্য লক্ষ্য করলেন ছাগশিশুটি অন্ধকারের আড়ালে, আর আড়াল সরে গেলে শুধু বাঁধনের ছিন্ন অংশটুকু গাছের সঙ্গে আটকানো। তারপর শুধু এক বিলীয়মান মর্মান্তিক আর্তনাদ। এক মূহুর্ত বিলম্ব না করে তিনি সেই শব্দের দিকে ধাবিত হলেন। বেশকিছুদূর অতিক্রান্ত হলে খুব সতর্কভাবে অনুসন্ধান করতে অবশেষে তার নজরে এলো দুটি অগ্নিগোলক অন্ধকারে থমকে আছে। মহারাজের অনুসারীরা তৎক্ষণাৎ এসে পড়ায় তাদের মশালের আলোয় তিনি দেখতে পেলেন, একটি চিতাবাঘ হিংস্র দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর পাশেই বাঘটির শাবকেরা ছাগশিশুটির দেহটি ভক্ষণ করছে। ক্ষণিকের জন্য মহারাজ ভাবলেন, তবে কি খাদ্যাভাবের কারণেই বাঘটির জনবসতিতে আগমন? বাঘটি আক্রমণোদ্যত। আর কাল বিলম্ব করার অবকাশ নেই। মহাশিকারি মহারাজ বীরভদ্রর হাতের বর্শা অভ্রান্ত নিশানায় চিতাবাঘটির হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল। মুক্তি মিলল এক পাশবিকতার কবল থেকে, এক হিংস্রতার কবল থেকে। সকলের উল্লাস ধ্বনিতে জেগে উঠল রাতের অরণ্য। ঊষাকাল আগতপ্রায়। মহারাজের মুকুটে শোভিত হল আরও একটি উজ্জ্বল পালক। মহারাজ বাঘের শাবকগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে চাইলেন। এতদিন তার রাজপ্রাসাদে শুধু মৃত বাঘেরাই শোভা বর্ধন করত। এবার জীবন্ত বাঘ তিনি পালন করবেন। তার গর্ব আর সন্তুষ্টি আরও এক নতুন মাত্রা স্পর্শ করল।

পরদিন রাজদরবারে মহারাজ বীরভদ্র প্রজাদের কাছথেকে ভূয়সী প্রশংসা গ্রহণ করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, যে অরণ্যের আর মানুষকে কিছু দেওয়ার নেই, তাকে সংরক্ষণ করার অর্থ মানুষের সুরক্ষাকে অনিশ্চিত করা আর প্রজাদের বিপদকে সংরক্ষণ করা। তাছাড়া অব্যবহৃত মানে অপচয়ও বটে। তাই তিনি ওই অবশিষ্ট অরণ্যকে নগরে পরিবর্তিত করতে চান। প্রজাগণ এই ঘোষণায় উৎফুল্ল হয়ে মহারাজের জয়গান করতে করতে ফিরে গেল।

পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত। একদল ঘোড়সওয়ার যাযাবর ব্যবসায়ী এক দেশ থেকে আরেক দেশের উদ্দেশ্যে চলেছে। সঙ্গে তাদের পণ্যসামগ্রী। এখন যে পথ দিয়ে তারা চলছে সেই পথ খুব রুক্ষ। জলের আভাষটুকুও নেই। পথে তাদের নজরে এলো এক মৃত নগরের ভগ্ন তোরণদ্বার। তার ফলকে উৎকীর্ণ ‘বসুন্ধরা’।

সুদীপ্ত বন্দোপাধ্যায়

সুদীপ্ত বন্দোপাধ্যায়

কুসংষ্কার হোক বা গোঁড়ামি, সবরকম অযৌক্তিকতার বিরদ্ধে কলম ধরেছেন সুদীপ্ত। থাকেন কলকাতায়, কর্মসূত্রে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ।
সুদীপ্ত বন্দোপাধ্যায়

Latest posts by সুদীপ্ত বন্দোপাধ্যায় (see all)