হঠাৎ দেখা
রেলগাড়ীর কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন..। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যদি ‘হঠাৎ দেখা’ হয়ে যায় প্রাক্তনের সাথে? কি বলব আমি..কি শুধাবে সে..বলবে কি সে “আমাদের যা গেছে একেবারেই কি গেছে?কিছুই কি নেই বাকি..?উত্তরে কি বলতে পারব “রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে..”
এরকমই এক গল্পের সামনে দাঁড় করায় প্রাক্তন ।
রবিঠাকুরের এই কবিতা,‘হঠাৎ দেখা’ পর্দা জুড়ে যত্ন করে এঁকেছেন পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সিনেমাপ্রেমী মানুষদের কাছে এই পরিচালকের জুটি যে কতটা পছন্দের তার রেশ পাওয়া যায় প্রতিবার ওনাদের ছবি মুক্তির সময়।একেবারে নতুন কনসেপ্ট এ তৈরী এই গল্প বলিয়েদের ছবি প্রথম থেকেই বাংলা ছবির বাজারে হিট।
ইচ্ছে, মুক্তধারা, রামধনু, অলিক সুখ- তাঁদের প্রতিটি ছবির বিষয় সবসময় নতুনের আনন্দ দিয়েছে। খুব সাধারণ গল্প এই পরিচালকদ্বয়ের ক্যানভাসে নতুনভাবে ছবি হয়ে ওঠে।
আর বেলাশেষে শুধু রেকর্ডই ভাঙেনি আমাদের নিয়ে গেছে সেই পুরনো দিনের ভালোবাসার গল্পে- যে গল্প আমরা নতুন প্রজন্মরা খুব কমই দেখার সুযোগ পেয়েছি।তাই বেলাশেষের পর প্রাক্তন এর অপেক্ষায় ছিল ছবিপ্রেমী বাঙালিরা।
ছবি শুরু হয় মুম্বাই এর ট্রেন যাত্রা দিয়ে আর এগিয়ে চলে নিজের গতিতে।সেই মুম্বাইয়ের ট্রেনে ছায়া ফেলে ছেড়ে আসা প্রেম, পুরনো অভ্যাস, হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তরা আর শুরু হয় প্রাক্তনের যাত্রা।ছবি এগিয়ে চলে..পুরনো প্রেম আনাগোনা করে..হারানো ভালোবাসা, চেনা অভ্যাস, হারিয়ে যাওয়া কথারা ফিরে আসে প্রাক্তনের হাত ধরে।সামনে এসে সে বলে “সময় কোথা সময় নষ্ট করবার”..জীবনের নিয়মে এগিয়ে চলাই নিয়ম- তবু থমকে দাঁড়াতে মন চায়..একবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে পিছুটানের দিকে।

ছবির গল্প বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ এতদিনে অনেকেই এটি দেখে ফেলেছেন আর যাদের দেখা হয়নি তারা যাওয়ার প্ল্যানও সেরে ফেলেছেন। ছবির নাম যখন ‘প্রাক্তন’ তখন তার গল্পও যে প্রাক্তনের হবে এ আর নতুন কি কথা? কিন্ত এখানেও আছে একটা নতুনত্ব- মূল গল্পের মধ্যে আছে অনেকগুলো সাব-প্লট আর সেই চরিত্রগুলো সকলেই অতীতের গল্পে আটকে থাকা।যেখানে এক গানওয়ালা একরাশ অভিমান নিয়ে ছেড়ে এসেছে তার জোড়িদার আরেক গানওয়ালা বন্ধুকে- এক নবদম্পতি তাদের প্রাক্তনদের ছেড়ে এসে পথচলা শুরু করেছে একসাথে- ছেড়ে যাওয়ার গল্পে আছে এক ছেলে যে তার মা-বাবাকে ছাড়তেও পিছপা হয়নি। এইভাবেই প্রাক্তন আর বর্তমান মিলেমিশে এগিয়ে চলে।
আর এই সবের মাঝখানে এগিয়ে চলে উজান (প্রসেনজিত) আর সুদীপার (ঋতুপর্ণা)হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প। গল্প বলার ধরন বেশ সুন্দর- কখনো ফ্ল্যাশব্যাকে প্রেমের শহর কলকাতা আবার কখনো স্মৃতিভারাক্রান্ত মুম্বাই এর ট্রেন। ফিরে ফিরে আসে পুরনো ছবি, ভালবাসার মুহূর্ত, অভিমানের প্রহর। চেনা টুকরো টুকরো ঘটনা বার বার বলতে চায় শুধু ভালোবাসা নয় সম্পর্ক টিকে থাকে বোঝাপড়ায়- ভালোবাসার মানুষের সবটুকু আপন করে নিয়ে খুব যত্ন করে না রাখলে সম্পর্ক থাকেনা- ভালবাসা হারিয়ে যায়। এইভাবেই মুম্বাইগামী ট্রেন কলকাতায় ফেরে এক প্রেমের গল্প, বন্ধুত্বের গল্পের সাক্ষী হয়ে।
এবার আসা যাক অভিনয়ের প্রসঙ্গে। বাংলা সিনেমার সবথেকে জনপ্রিয় জুটি প্রসেনজিত আর ঋতুপর্ণা অভিনয়ের গুণে সম্পর্কের দোলাচল খুব সুন্দর ভাবে পর্দায় এনেছেন-তাঁদের ভালোবাসা-অভিমান-ঝগড়া, উজান-সুদীপার সম্পর্ককে জীবন্ত করে তুলেছে। এছাড়াও গল্পের একাধিক সাবপ্লটের বিভিন্ন চরিত্রে সকলেই নিজের নিজের মত করে সুন্দর। কিন্তু অপরাজিতা আঢ্য ছাপিয়ে গেছেন সকলকে। মন খোলা হাসি নিয়ে ওরকম প্রাণবন্ত অভিনয় এই ছবির অনেক বড় পাওনা।
শহর কলকাতা এই ছবিতে প্রেমের অনুঘটক। প্রিন্সেপ ঘাটের নৌকায় দেখা সূর্যাস্ত, ট্রামে টানা গাড়ির হাত ধরে এই শহরে প্রেম আসে- আর সেই প্রেম আরও গভীর হয় ময়দানের আড্ডায় আর চার্চের নিস্তব্ধতায়। কলকাতাকে যারা ভালোবাসেন তারা আরও একবার প্রেমে পড়বেন এই শহরের।
অনুপম রায়ের গান নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই- শহুরে, প্রাণবন্ত সবটাই যেমন প্রতিবার হয়। কিন্তু “অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর” গানটির প্রতিটি শব্দ অদ্ভুত রকমের সুন্দর- অনেকখানি মন কেমন করা ফাঁকা একটা অনুভূতি তৈরি করে। ইমন চক্রবর্তী এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা মিশিয়ে খুব যত্ন নিয়ে এই গানটি গেয়েছেন।
সবশেষে বলতেই হয় প্রাক্তন কোনও ব্যতিক্রমী ছবি নয়, এমনও নয় যে এই ছবিতে প্রচুর তত্ত্বকথা আছে, আবার এও নয় যে এই ছবি খুব ভাবায়। কিন্তু প্রাক্তন যেটা রেখে যায় তা হল মন কেমন করা একটা রেশ। ভালোলাগার রেশ, এগিয়ে যাওয়ার রেশ রেখে প্রাক্তন শেষ হয়। ছবিটি কারো কারো একটু বড় মনে হতে পারে, একটু টানাও মনে হতে পারে… কিন্ত আমি বলবো প্রাক্তনের সাথে দেখা যখন হল সময় তো থমকে দাঁড়াবেই, ফেলে আসা জীবনের পিছুটান একটু বড় তো হবেই!

Latest posts by সুদেষ্ণা সোম (see all)