অটো
বর্ননাঃ
তিনটে চাকা, হ্যান্ডেলে ঝোলানো খুচরোর ব্যাগ আর চাকরি না পাওয়া ছোট দেওরের মত বাই ডিফল্ট কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় আর একখানা লম্বা-পনা হ্যাণ্ডেল ছাড়া যে যানের আর সমস্ত কিছু অদ্ভুত রকমের অনিশ্চিত তাকে অটো বলে। কিন্তু সেই বেকার যুবকটিকে যেরকম বাড়ির বাইরের কেউ অপমান করলে বৌদি ভয়ংকর রকম চটে যান সেরকম ভাবেই এই হ্যান্ডলের ওপর পা রাখা যায়না। মানে দরকার পড়লে মালাইচাকিটা পাশের গাড়িকে দিয়ে দিতে পারেন কিন্তু ওটার ওপর একেবারেই নয়।
প্রত্যেক সাধারণ মানুষের জীবনেই এমন একটা চায়ের দোকান ছিল বা আছে যেখানকার চা-টা কিনে খেতে হয় শুধুমাত্র সেখানে আড্ডা মারতে দেয় বলে। অটোও হল সেইরকম। তাই, জ্বালা, যন্ত্রণা, ব্যথা, লাইন, ভয়, অপমান এই সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা অটো ভালোবাসি। একই জায়গায় যাওয়ার সময় বাস আর অটো দুটোর অপশন থাকলে আমরা অটোটাই বেছে নেই। অটো ছাড়া কলকাতা হল খোসা ছাড়া বাদামের মত।

স্ট্যান্ড আর রুট:
যে জিনিস দুটো সল্টলেকের অটোর থাকেনা তাদের স্ট্যান্ড আর রুট বলা হয়। এক স্ট্যান্ড থেকে আরেক স্ট্যান্ডের মধ্যবর্তী রাস্তা কে বলা হয় রুট। বেশির ভাগ স্ট্যান্ডের আশে পাশেই একটা বাজার বা স্টেশন থাকে। দেখবেন কলকাতা যখন খটখটে শুকনো, পিচ ফিচ ফেটে গেছে, মানুষ একটু আর্দ্রতার জন্য মায় মানত অবধি করে ফেলেছে, তখনও বাজার আর স্টেশন নিকটবর্তী এলাকায় কাদা থাকে। এই কাদা কেন এবং কিভাবে সেটা কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু থাকে, থাকবেই, তা লাইনেও এসে পড়ে।
এবার ধরুন আপনি আধঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর লাইনের একদম সামনে চলে এলেন। এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে। দু-তিনটে অটো এসে ঠিক আপনার সামনে দাঁড়াবে। তারপর চালক ভাই তার থেকে নেমে খুচরোর ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে কোথাও একটা চলে যাবেন। কেন যাবেনা জিজ্ঞেস করার যে মানেই নেই সেটা এতদিনে সকলে বুঝে গেছেন।
আরেক রকম হয়। আর এটা ঠিক তখনই হবে যখন আপনার সবচাইতে বেশি তাড়া থাকবে। মানে ধরুন প্রেমিকা অপেক্ষা করছে, বা বোতল। আপনি স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখলেন লাইন নেই। অটোতে উঠে পড়লেন, আরও দুজন জুটে গেলো, অথচ অটো ছাড়ছেনা। কারণ আর একজন জুটছেনা। ওই একজন যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ শুধুই অপেক্ষা। আপনার, প্রেমিকার, গেলাসের।
সবচাইতে বেশি অগ্রাধিকার পান যারা ওই একা আছেন তারা। “একজন” ডাক শুনে তারা লাইনের একদম শেষ থেকে হাত তুলে লুফে নেন বাকিদের ঈর্ষা। সামনে বসে রাজার মত এগিয়ে যান নিজের গন্তব্যে।

চালক:
এই একজন হলেন অটোর দেশের বেতাজ বাদশা। এনার মুড ভালো থাকলে আপনাকে ১০০ টাকাও ভাঙ্গিয়ে দেবে আর খারাপ থাকলে ৮ টাকাও খুচরোতে চাইবে। অটোতে উঠেই নিজের ভাড়াটা খুচরোতে দিয়ে দিলে মনে হয় চালক ভাইয়ের থেকে আপন আর কেউ হয়না।
এনাদের ভেতরেও নানা রকম প্রভেদ আছে। যাদের বয়স অল্প, তারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে অটোটাকে সাজিয়ে তোলেন। লাল নীল আলো আর অসম্ভব জোরে উব-উব-উব-উব বেসনাদে মাতিয়ে রাখেন। বাস, ট্রাম, লরি কিচ্ছুর তোয়াক্কা করেননা। যে করে হোক অলে গলে যাবে। আর স্পিড! কে বলবে অটো!
বাকিরা হলেন বর্ষীয়ান। এনারা “যাবেন?” জিজ্ঞেস করলে জাস্ট মাথা নেড়ে উত্তর দেন। রাস্তায় বেয়াড়া ট্যাক্সি, দাঁড়িয়ে থাকা বাইক, এখনও ঠিক করে বসতে না শেখা প্যাসেঞ্জার সব্বাইকে ট্রাফিক আইন আর সহবৎ শিখিয়ে দিতে পারেন সেরকম দরকার হলে। এনাদের পুরো ব্যাপারটাই অসাধারণ। ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তা, বর্তমান পলিটিক্স সেই সঙ্গে খেলা সমস্ত কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন মনের মত প্যাসেঞ্জার পেলে।

প্যাসেঞ্জার:
অটো হল পৃথিবীর একমাত্র যান যেখানে সামনে চারজন পেছনে তিনজন বসেন। প্যাসেঞ্জার মানে আমাদের একটা প্যাটার্ন আছে। কেউ কেউ “আমি সামনে নামব” বলে যেন তেন প্রকারেণ ধারের সিট দখল করি। আবার সেই আমরাই যে করে হোক বৃষ্টির সময় মাঝে বসি। কারণ ধারে বসলে যে ধারে বসব জামার সেই ধার চপচপে হবেই। কেউ আটকাতে পারবেনা। কেউ না। বৃষ্টি না থাকলে রডে জমে থাকা জল চুইয়ে চুইয়ে এসে নিঃশব্দে ভিজিয়ে দেবে। কেউ কেউ, এই প্রবণতা সাধান-রত বাড়ন্ত বাচ্চাদের দেখা যায়, তারা পেছন পুরো ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও সামনে গিয়ে বসে।
আবার আমদের অনেক সময় এই ভেবে বিরক্ত লাগে যে পাশের লোকটা কেন বুঝতে পারছেনা অটোটা আমার বাপের সম্পত্তি। আমি একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রিলাক্সিয়ে বসব তা না। সেই শালা সরুন সরুন। আর না সরলে থাই কনুই দিয়ে জায়গা করে নেবে। ইকিরে! সে নয় আমরা একই ভাড়া দেব, একই জায়গায় যাব। তাই বলে আমার অন্যে ও একটু কষ্ট করতে পারবেনা? আমি একটু খুশি হতে পারি তাহলে।

উপসংহার:
খুশি থেকে মনে পড়লো। জীবনে প্রথমবার প্রেম হাত ধরেছিল অটোতে ওঠবার সময়ই। নাহ, ভুল লিখিনি। ধরেছিলাম নয় ওটা ধরেছিলই হবে। নাহলে আমি যা ক্যাবলা হয়তো ওই অটোতে উঠতেই পারতাম না। আবার লাইনে দাঁড়াতে হতো আর দেখে নিতে হতো বুকপকেটে খুচরো পাথর আছে কি নেই। তারপর হাত তুলত হত, যখন শুনতে পেতাম “একজন” !!