poribesh diboshসারাদিন অফিস ঠেলে বাড়ি ফিরছি। সায়েন্স সিটির সামনে বিস্তর জ্যাম। বাতাসে একরাশ ধুলো, মাথার ওপর ফ্লাইওভার – বিরক্তি এড়াতে এফ এম। অবশ্য আজকাল রেডিও বিরক্তি কমায় না বাড়ায় সেটা ঠিক বোঝা যায় না – তাও জ্যাম, ঘাম আর সারাদিনের ক্লেদ ভুলতে চারানার গান আর বারো-আনার এডভার্টাইজমেন্ট নিয়ে ঐ এক এফএমই সম্বল। এমন সময় এই রেডিওই মিনে করাল জুন পাঁচ তারিখ বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

পরিবেশ দিবসে আমার কিচ্ছু করার নেই। কারণ বছরে একদিন গাছ লাগিয়ে আর বাকি ৩৬৪ দিন গাছ শুকিয়ে পরিবেশের সেবা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যা বারোটা বাজার তা বেজে গেছে। এই পরিবেশ দিবস পালন করে কিছু শুধরোবে সে আশা যে নিতান্তই গুড়ে বালি। এসব আর দশটা লোকের মত আমারও মজ্জায় গেঁথে গেছে। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল – বাধ সাদল একটা ভিডিও।

হ্যাঁ – একটা ভিডিওই। কোনও এক বন্ধু শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। নিউজিল্যান্ডের ডেয়ারি ফার্মের ঘটনা। কিভাবে দুধের প্রোডাকশন বাড়ানর জন্য বাছুর হওয়ামাত্র তাদের আলাদা করে দেওয়া হয় – আর শুধু তাই নয় সেই বাচ্ছাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কসাইখানায়। খুব ধাক্কা খেলাম একটা। পড়তে শুরু করলাম কিছু হেলথ রিপোর্ট। যে সব তথ্য উঠে এল তা মর্মান্তিক বললে কম বলা হয়।

এক এক করে দেখে নেওয়া যাক অবস্থাটা কতটা খারাপ। গরুর সাথে মানুষের সবচেয়ে বড় মিল এই যে একটি বাছুরও তার মায়ের গর্ভে প্রায় ন’মাস সময় কাটায়। এখন দুধের প্রয়োজনে গাইগুলিকে বছরে একবার করে বাধ্যতামূলক ফোর্সড প্রেগন্যান্সি করান হয় এবং হরমোন ট্রিটমেন্ট করে মাতৃত্ব যে পরিমাণ দুধ উৎপন্ন করতে পারে তার প্রায় দশ-বারো গুন দুধ তৈরী করান হয়। এই অবস্থায় চার-পাঁচ বছরের বেশী দুধ দেওয়ার ক্ষমতা গাইদের থাকে না। তখন তাদের ঠাঁই হয় কষাইখানায়। এবারে আসি তাদের সন্তানের কথায়। পুরুষ হলে তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই – নিলামের জন্য। কয়েক মাসে মধ্যে তাদের গন্তব্যও হয় কষাইখানায়। স্ত্রী হলেও তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় আর অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্য ভালোদের মধ্যে কয়েকজনকে দুধের জন্য রেখে বাকীদের ও বিক্রিই করে দেওয়া হয়। যারা জন্মের পর ঠিক করে উঠে দাঁড়াতে পারে না, তাদের বলা হয় ‘ট্র‍্যাশ’।

স্ট্যাটিস্টিকস বলছে বছরে এরকম একুশ কোটি বাছুর মেরে ফেলা হয়। প্রায় ৯৭% বাছুরই জন্মের কয়েক ঘন্টার মধ্যে হারায় তাদের মাকে। নিউজিল্যান্ড হোক বা আমেরিকা ছবিটা একই রকমের। পরিবেশ দিবস শুনে অন্য কিছু ভাবতে পারলাম না। এমনিওটিক ফ্লুইডের আস্তরণ কাটিয়ে না উঠতে পারা একটি বাছুর তার মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আর আমরা নৃশংসভাবে তাকে তাড়িয়ে তুলছি ভ্যানে। কখনও তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলছি। শুধু রক্তে ভাসাচ্ছি না, পরিবেশের নিয়ম, মাতৃত্বের নিয়ম ভাঙছি শুধু লোভে। আশার কথা এটাই যে অনেক শহরে আস্তে আস্তে বাছুরের মাংস ব্যান করা হচ্ছে। সরকারি নিয়মে এই বাছুরদের চালান করার ক্রেট বে-আইনি করা হয়েছে। পরিবর্তন হবেই কিনা বলা যাচ্ছে না – তবু প্রথম ধাপ তো বটেই।

পরিবেশ দিবসে আমাদের পাঠকদের অনুরোধ করব ব্র‍্যান্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে, যা ইউরোপ আমেরিকায় শুরু হয়েছে এইসব ডেয়ারি ফার্মের বিরুদ্ধে – ছোট হলেও এই চূড়ান্ত অমানবিকতাকে চ্যালেঞ্জ করছেন কনসিউমাররা, যেটা খুব জরুরী ছিল। বেঁচে থাকার অধিকার কারও কম নয়। তাই বছরে একটা দিন নয়, পরিবেশকে বাঁচানর দায়িত্ব হোক চিরন্তন। ভালো থাকুন সব্বাই।

Latest posts by অভ্র পাল (see all)