আমদের প্রজন্মটাকে সময় বস্তুটা চিরকালই হাঃ মুগ্ধ করে রেখেছে। একমাত্র ফুচকাওয়ালার হাত ধোওয়ার সাবান বাদ দিয়ে এমন কোনো জিনিস নেই যা আমরা দেখিনি (সোলজার কিন্তু হিট করেছিলো ফলে ওই প্রসঙ্গ আনা গেলোনা)। সেই জন্ম থেকে শুরু করে বর্তমানে পাড়ায় নির্ভয়ে সিগারেট খাওয়া/ মায়েরটা ছেড়ে নিজের জন্য শাড়ি কেনা অথবা দুটোই একসাথে অবধি। সারাটাক্ষন যেন এক অদৃশ্য হাত রোজনামচার চলতিতে ধরিয়ে দিচ্ছে অবাক হওয়ার ইস্তেহার। আর সে এমনই আদেখলা হওয়ার নিমন্ত্রন যাকে মুঁড়িয়ে ফেলে দেওয়ার যান্ত্রিকতা আমাদের ছিলনা, নেই, হবেও না।

আর হবেই বা কি করে। হরলিক্স তো এই হালে বলছে শিশুর আসলি মানসিক বিকাশ হয় ছানা-পোনা বেলায়। আর আমাদের কি শিখিয়েছে, এমনি এমনি খাও। আর গণ্ডগোলটা এখনেই। মুকেশ খান্না দেখিয়েছিলেন বীরদর্পে সত্যের পথে এগোনো মানেই চকমকে লাল, আঙ্গুল তুলে ফাকফাকফাকফাকফাক। চিন সরকার আর চ্যাপেল তো এই সেদিন বলল আসল মানেটা। জুরাসিক পার্কের ডাইনোর সাথে লড়ে গেছি প্রায় অনায়াসে তাই এখনও খুচরো না থাকলেও অটোতে ওঠার সাহস দেখাইনা। আমাদের ছুটি ছুটি তে লালকমল-নীলকমল আর ত্রিডিতে ডেথলী হ্যালোস, দুটোই “আরিব্বাসিয়”আমোদ দেয়।

সুযোগ পেয়েছি আলিশার গানে মিলিন্দ সুমান আর ঐশর্য রাই, দুজনকেই নাচতে দেখার। সাথে নেচেছে আসমুদ্র ডাল লেক যখন লাইভ পর্দায় শচীন দুশো করেছে আর দাদা জামা উড়িয়ে ঝামা ঘষে এসেছে উন্নাসিকতার মামাবাড়িতে। আমরা ভিসিআরে “বাজিগর” দেখেছি, “এই বেশ ভালো আছি” থেকে পেন্সিলের সাহায্যে টেপ-রের্কডারটাকে বারবার নীলাঞ্জনা মুখর করেছি, তিরিশ টাকায় দেড়শো গানের লক্ষ লক্ষ চাকতি জমিয়েছি, আর এখন, ক্লিকাই।

সাদা-কালো সুপারহিট মুকাবলার তালে তাল রেখে প্লাজমার অ্যান্ড্রয়েডিয় উত্থানে হবিট সুলভ প্রযুক্তির বির্বতন উইটনেস করাটা আমাদের হ্যাবিটে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা কন্ট্রা হয়ে একপেশে দৌড়েছি এখন দৌড়ে দৌড়ে ভারচুয়াল কবাডি খেলি। আমরা চন্দ্রকান্তার জন্য রোববার সকাল নটায় উঠেছি আর এখন সেটার সিড পেলেই নামিয়ে ফেলার তালে আছি। আমরা আরেকটা রিভার্স এভিলিউশনেরও সাক্ষী। ফোন কে গাবদা থেকে ছোট্ট হয়ে আবার গাবদা হতে দেখছি। ওয়াকম্যান টা পকেটে ঢুকত না বলে বেল্টে ঢুকিয়েছি আর এখন হেডফোনটা ব্যাগে ঢোকেনা বলে গলায় ঝোলাই।

কিন্তু এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে এসব তো যারা উনত্রিশ/ত্রিশের ওপারে তারাও প্রত্যক্ষ করেছে। তবে আমরা আলাদা হলুম কই? অব্যশ্যই আলাদা! কারণ যে বয়সে যে বিষয়টা সবথেকে বেশী কৌতুহলাক্রান্ত করে আমরা ঠিক সেই বয়সে সেই বিষয় গুলোর একেবারে আনকোরা বিস্ফোরনের সামনে পড়ে গেসলাম। আঁচড়ের দাগগুলো তাই বড়ই আদরের। আমরা যখন সদ্য টিভি চালাতে পারি তখন সিন্দাবাদ তিমি আর তালিব মালিকা হামিরার সাথে সাথে লড়ছে। যখন বন্ধু ব্যাপারটা কলার তুলব তুলব করছে তখন ফারহান আখতার লঞ্ছ করলেন। গেঁড়েপাকা স্টেজ়টায়, বাড়ির লোক কেবল কাকুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফ্যাশন টিভি কেটে দিতে বলছে। যখন রিকশোতে বিনুনি দেখে রেসিং সাইকেলের স্পীড আপনা থেকে কমে যাচ্ছে ।অল্পবয়েশি স্যারের সামনে বিয়ে শুনে কান্না পাচ্ছে ঠিক তখনই শাহরুখ খান অমিতাভ বচ্চনের মুখের ওপর তেড়ে বেহালা বাজিয়ে দিলো।

যখন চে-গ্যেভারার টি-শার্ট খুঁজছি কমদামে তখন মোমবাতি মিছিল পেলো একের পর এক যতার্থতা। যখন যেটা তখন সেটার এরকম হাতে গরম একেবারে পাত পেড়ে খেয়েছি বলেই “ভালো তবে আমাদের সময় বেশী ভালোছিলো”-র ঢং থাকবেই। কিন্তু কয়েকটা জিনিসের ক্ষেত্রে সেটা সত্যিও! উদাহরন- কার্টুন নেটওয়ার্ক, ডব্লু ডব্লু এফ, জীবনমুখি, দেখ ভাই দেখের মত সিরিয়াল, শারদীয় আননন্দমেলা, দু-ছক্কা-পাঁচ, নিজস্ব ডাইরী আরও কত কি! পরিবর্তন ব্যাপারটে ধাতে সয়ে গেছে আমাদের। সে নন্দীগ্রামের মর্মান্তিক ঘটনাই হোক বা এস আর এফ টি আই তে দেবকর্ম প্রদর্শন।

আমদের কনফিউজড জেনারশন হিসেবে খ্যাতি আছে। দোষটা আমাদের না। আসলে আমাদের করন জোহর এই বলছে শিল্পী সে-ই যে বন্ধু, পরিবার, পড়শী, কলেজ প্রিন্সিপাল, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি সকলকে সম্মান করে ইদিকে নিজেই আবার খিস্তিটাকে নিয়ে যাচ্ছেন শিল্পের পর্যায়। বেলাকে এই অঞ্জন দও তো এই রক্তচোষার প্রেমে পড়তে দেখছি। জি কে বলছে ঠিক, সংসদ ও বলছে ঠিক আর দু-জনেরই আলাদা আলাদা প্রমান আছে। আমরা বাইককে বাইকারের তলায়, আর ক্যামেরাকে যার তার গলায় চলে যাওয়ার সব কটা স্টেজ একে একে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বাবা সাইগেলের গান দেখলে বকুনি খেতে হতো এখন ন্যাপি পরা আদোআদো “তাল বোতোল বোদকাহ” গেয়ে আদর খায়। ফলে কনফিউশনটাই স্বাভাবিক।

আর তাই স্বাভাবিক ভাবেই মোদের তুলনা মোরাই। আমারা প্রেম কে ভাই আর সঞ্জয় দত্তকে মুন্নাভাই হতে দেখেছি। টি টোয়েন্টি, আইপিএল, অপমান করে স্মার্ট হওয়ার ক্ষমতা, এল ও এল, এ এস এ পি, টি কে সি আর, ইংরাজি শব্দের পাসে “ইয়ে” বসিয়ে সেটাকে ট্রান্সলেটিয়ে সময় বাঁচানো ইত্যাদির প্রভৃতির আবিষ্কারটা ঠিক যখন আমাদের সব থেকে দরকার ছিলো তখন-ই হয়েছে। আমরা কলকে মিল কল, এসএমএস কে হাইক, আর দরকার কে হোয়াটসআপ হতে দেখেছি।

আর তাই মোদের তুলনা মোরাই। আমরা আর যাই হইনা কেন বুড়ো-বুড়ি কোনোদিনও হবেনা। কারন বয়স কেবলমাত্র একটা নম্বর। আর এখন গ্রেডের যুগ। তাই বাকি আর সমস্ত কিছুর মতই সেটাও আমাদের বুকপকেটে জায়গা করে নেবে। আমরা বারবার ঠকতে পারি, তবে ঠকাবো না। কারন আমরা সাবানের বুদবুদ বানাতাম, কিনতাম না। নতুনত্বকে ওপেন চ্যালেঞ্জ। পারলে চমকে দেখা। উল্লাস।