সে এক উত্তাল সময়। আবিষ্কারের সময়। কৈশর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে যৌবনকে ধরবার, কিন্তু সে তখনও বিভিন্ন যোজনার মত যোজন বছর দূরে। সবাই নাকি দেখেছে, সবাই নাকি জানে “কি করে হয়”। আতিপাতি খোঁজ চলছে। ইলেভেনের দিদিদের কিছুতেই দিদি বলতে মন চাইছে না। নতুন ম্যাডাম ক্লাসে এলে বসন্ত বিলাপ। এরকম এক টালমাটাল মুহুর্তে দেবদূতের মত হাজির সে। বোতাম টিপলেই সমস্ত গোপন স্বপ্ন বিড়াল হাঁটছে তো হাঁটছেই। বাবা মায়েরা চাইল্ড লক করেও আটকাতে পারছেননা অজানা কে আবিষ্কার করবার অদম্য ইচ্ছে। হাতে রিমোট নিয়ে বাড়ির সব চাইতে রিমোট এরিয়াতে চলছে না দেখা পৃথিবী যাপন।

আমরা এক ম্যাড়ম্যাড়ে সময়ে জন্মেছি। বলবার মত কোন উত্তেজনাই পাইনি। না উডস্টক না নকশাল, কোন বই ব্যান করা নেই। তাই বড়দের ব্যাপারে কৌতুহল ছিলো অপরিসীম। কিন্তু যোগান বলতে সেই টাইটানিকের “ছবি আঁকার সিন টা”-ই ছিলো সম্বল। কিন্তু এ মাধ্যম হয়ে উঠলো একেবারে আপনার, নিজস্ব রাজধানী। যেখানে কিচ্ছু যাপসা নয়। একেবারে চকচকে ঝকঝকে। এই চ্যানেল আমাদের আর কিছু শেখাক না শেখাক একটা জিনিস শিখিয়েছে। উচ্চারন।

যেহেতু মিউট করে দেখতে হয় তাই আমারা জানতাম এর মালিকের নাম মাইকেল আদাম। ক্লাসের সব থেকে ইফরমেটিভ ছেলেটা খোঁজ আনলো “ও হলো মাইকের জ্যাকসনের ভাই”। আমরা কেউ আপত্তি করিনি। কারন এর আগে ও খবর এনেছিলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল আসলে একটা “হেব্বি বিসাল” জন্তুর নাম। ওর চামড়া দিয়ে “জারোয়ারা” এক ধরনের পোষাক বানায় যার নাম বারমুডা। সেখান থেকে আমাদের বারমুডার নাম এসেছে। তারপর ও আবার নাসায় ঘুরতে গেস্লো যেটা ক্লাসে সব্বাইকে বলেনি তাই ওর দেওয়া তথ্য অস্বিকার করবার হিম্মত আমাদের কারোর ছিলোনা।

ওই একদিন এসে বলল – গন্ধ পাচ্ছিস? বাবা কিনে দিয়েছে, “চ্যানেল”(Chanel) এর সেন্ট। তারপর সত্যি বলছি সারাদিন যেন একটা দারুন মিঠে গন্ধ পেলাম। ওর ইজ্জত আরও খানিকটা বেড়ে গেলো। সব্বার মনে একটাই প্রশ্ন “লিঙ্গারী”(Lingerie) টা ঠিক কখন কখন দেখায়? “হিউট কাউন্টার”(Haute Couture) দেখে আরেক বন্ধুর অমর উক্তি “হাইডি কুলুম (Heidi Klum) যেন কেন এসব করে?” এছাড়া “ডলিস আর গাবানা”(Dolce ans Gabbana) “জরেজিয়োহ আমানি”(Giorgio Armani)(কে একজন বলেছলো ওদের “আর” টা উচ্চারন করতে নেই) এসব তো আছেই।

চ্যানেলটা ফাস্ট বেঞ্চ লাস্ট বেঞ্চের ভেদাভেদটা মুছে দিয়েছিলো। যে ছেলেটা জীবনে কোনদিন ইংরিজীতে পাশ করতে পারেনি সেও জানতো “মিডনাইট হট” কখন হয়। তাকে একবার টিচার জিজ্ঞেস করলো – “বল শি ইজ ফলিং মানে কি?” সে বলল “মেয়েটা হলো হেমন্ত”। বেশীরভাগ দিনই কেউ ছলছল চোখে এসে জানান দিত বাবা ধরে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে সব্বার একবাক্য প্রশ্ন- “কি চলছিলো?”। কেউ যদি উত্ত্র দিতো “ক্যালেন্ডার” তার দুঃখে আমরাই ধরে রাখতে পারতাম না চোখের জল।

ভুগোল স্যারের থেকেও ভালো পৃথিবী চিনিয়েছিলো এই চ্যানেল। মিলান, প্যারিস, মায়ামী হয়ে গেছিলো ঘরের উঠোন। “মডেলার”-রা (যারা মডেল হয় তারা মডেলার) যখন কেকের ওপর আগুন জ্বালিয়ে আমোদ করত আমারাও তখন তাদের খুশিতে পাগল হয়ে যেতাম। এক বন্ধু সেই দেখে কালী পূজোর দিন ফুলঝুরী জ্বালিয়ে জমাট বাঁধা খিঁচুড়ির ওপর লাগাতে গিয়ে বেকুব বনে গেলো। সেই ইনফরমেটিভ আবার বলল “ওগুলোর নাম ফুড ফায়ার। পুরোটা জ্বলে গেলে কাঠিটা চুষে চুষে খেতে হয়। ওর বিশাল দাম। পার্ক স্ট্রীটে পাওয়া যায়, আমি খেয়েছি”

দাম তো অবশ্যিই ছিলো। সেই অফুরান বোকামী গুলোর। বোকা বাক্সে আলাদীনের আশ্চর্য হীরেটা পেয়ে যাওয়ার দিন গুলোর। কেবলওয়ালাকে মারব বলে প্ল্যান করবার (চ্যানেলটা বন্ধ হয়ে গেলো বলে)। তারও দাম এখন অল্প, ফ্যাশন টিভিরও। চ্যানেলটাকে আর এখন কেউ পাত্তা দেয়না, চাইল্ড লক করেনা। দামী রেঁস্তোরা এখন সপরিবারে উপোভোগ করে ফ্যাব্রিকের কারুকাজ, মুখশ্রির উল্কি। আমরা যৌবন পেয়েছি আর চ্যানেলটা…নাহ তার যৌবন এখনও বেঁচে আছে, আমাদের কৈশরে, আমাদের বড় হওয়ার দিনগুলোতে, “লিঙ্গিরিতে”, “মৌলিন রুগের”(Moulin Rouge) নাচে। দাপটে বেঁচে আছে সে। থাকবেও। আমরন কাল, মিউট হয়ে রাতের অন্ধকারে।