Okolkata_OK_-_Ramyarachona-1024x160

সেই অনেক কাল আগে, চন্দননগরে আমাদের একটা বাড়ি ছিল। সেই বাড়ির লাগোয়া এক বেশ বড় বাগান ছিল। সম্ভবতঃ বিঘেখানেক। সেই বাগানে একটা মাঝারি গোছের গোল চৌবাচ্চায় রঙিন মাছ পুষত মণিকাকু।সেখানে কলতলায় বিকেলবেলা গা ধুয়ে চুলে বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে আমার গরমের-ছুটিতে-বাপের-বাড়ি-বেড়াতে-আসা পিসিরা পাঁচিলের ওপাশের বাড়ির মেয়েদের সাথে গপ্পো করত। সেখানে সন্ধ্যের মুখে বাগান আলো করে ফুটত ম্যাজেন্টা, হলুদ আর সাদা সন্ধ্যামালতী। সন্ধ্যামালতী শেষ বিকেলে ফোটে, চাঁদ ডোবার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। সূয্যির সাথে তাদের সদ্ভাব নেই। সকালে সেইসব ঘুমিয়ে পড়া সন্ধ্যামালতীই জায়গা পেত ঠাকুরের আসনে। আমি আর মণিপিসি সেই ম্যাজেন্টা সন্ধ্যামালতীর ফুল জলে চটকে পুতুলের বিয়েতে শরবত বানাতাম। সেই বাগানের এক দিকের ভাঙা পাঁচিলের গায়ে একটা লাল টকটকে পঞ্চমুখী জবার গাছ সারা বছর আমাদের বাড়ির এবং আশে পাশের গোটা দুয়েক বাড়ির পুজোর ফুল যোগাত। আর ছিল টগর আর কল্‌কে ফুলের গাছ। সেই বাগানের এক কোনে একটা খাটা পায়খানাও ছিল। সেখানে বাড়ির পুরুষেরা গামছা পরনে, এক হাতে একখানা জঘন্য দেখতে বালতি ভরে জল নিয়ে আর অন্য হাতে বিড়ি বা সিগারেট লুকিয়ে সকালের প্রয়োজনীয় কম্ম সারতে যেত। সেই তিন ধাপ সিঁড়ি ওঠা ইঁট বেরোনো, শ্যাওলা ধরা ঘরটা, যেটার সম্পর্কে আমার যথেষ্ট ভয় ছিল, সেই অবধি যাওয়ার ছোট্ট পথ টুকু অতি পরিষ্কার করে ঝাঁট দেওয়া থাকত আর তার পাশ দিয়ে দিয়ে রং-বেরঙের পাতাবাহারের গাছ লাগানো ছিল। এহেন ‘ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনিং’ কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল কে জানে! সেই বাগানে আরো ছিল বেশ কয়েকটা আম গাছ; সাথে ছিল জামরুল, কাঁঠাল, কলা, নারকেল ইত্যাদি ফলের গাছ ছিল। গরমের ছুটিতে বাবা-কাকারা আমগাছে উঠে আম পাড়তেন। দাদুকে এক-দুবার দেখেছি নারকেল গাছে উঠে নারকেল পাড়তে। তখন দাদুর ষাট অবশ্যই পেরিয়েছিল। নারকেল পেড়ে বাগানের শেষ কোনায় মানকচুর জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা দাদুর পায়ে আটকে থাকা জোঁক ছাড়াতে নুন আনতে হত। আমাদের সেই নোনা ধরা দেওয়ালে ঘেরা, শামুক -পিঁপড়ে-জোঁক পরিপূর্ণ বাগানটা ছিল মণিপিসি আর আমার পুতুলের সংসারের জন্য এক অভাবনীয় সুপারমার্কেট।

13233071_10154322403992494_4425883300170376015_nসেই বাগানে আর ছিল একটা ফলসা গাছ। সেটা আমাদের অতি প্রিয় ছিল । আমার শহুরে বন্ধুবান্ধবেরা এবং আত্মীয়েরা অনেকেই ‘ফলসা’ চেনেন না। সেই ছোট্ট ছোট্ট ঘোর লালচে বেগুনী রঙের ফলের টক-মিষ্টি স্বাদের ধারণা অনেকেরই নেই। আমাদের ও থাকার কথা নয়। কিন্তু থেকে গেছিল, ওই একখানা ফলসা গাছের দৌলতে। আমি আর মণিপিসি সেই ফলসা গাছের তলা থেকে পাকা ফলসা কুড়িয়ে নিয়ে এসে জলে ধুয়ে খেতাম। ফলসা যাঁরা চেনেন না বা দেখেন নি, তাঁদের সুবিধার জন্য বলি, এই ফল খুব ছোট ছোট আয়তনের হয়। একটা পরিপক্ক ফলসা মোটামুটি একটা জলে ভেজানো মটরের মত , বা তার থেকে ছোট অবশ্যই। বড় কখনই নয়। কাঁচা অবস্থায় ফলসার রং হালকা সবুজ; যত পাকে সবুজ থেকে রং ক্রমশঃ কালচে বেগুনি হয়ে যায়। ভেতরে একটা কালো বীজ থাকে।ফলসা গাছ বেশ বড় হয়। স্মৃতি বলছে আম গাছের মত না হলেও, অন্তত পেয়ারা গাছের মত অবশ্যই হয়, কারণ আমরা মাঝেমধ্যে নিচু ডালে হাত বাড়িয়ে আধপাকা ফল ছেঁড়ার চেষ্টা করতাম। পাকা ফলসা খেতে বড়ই ভাল। আমরা মোটামুটি ফেলে ছড়িয়ে, একটু কামড়ে, একটু নষ্ট হয়ে যাওয়া দিকগুলি ফেলে দিয়ে দিব্যি গ্রীষ্মের ছুটিতে আম-জামরুল-কাঁঠালের সাথে ফলসাও খেতাম।

জীবনে বেশিরভাগ ভাল জিনিষই যেমন ক্ষণস্থায়ী, আমাদের বিস্তৃত যৌথ পরিবারের কাছে সেই বাড়ি এবং বাগানের মালিকানার সুখ ও তেমনি ক্ষণস্থায়ী ছিল। কালের গতিকে সেই বাড়ি-বাগান ইত্যাদি একদিন বিক্রি হয়ে গেল। জীবন থেকে অনেক কিছুর সাথে ফলসার ও বিদায় ঘটল। তারপরে কেটে গেল বেশ কিছু বছর। পশ্চিমবঙ্গের বিহার সীমান্তবর্তী এক বসতি অঞ্চলে আমাদের বাড়িতে অন্য অনেক কিছুর গাছ থাকলেও , ফলসা গাছ ছিল না। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কলকাতায় এসে হাওড়া স্টেশনের বাইরে বহুবছর পরে আবার ফলসার সাথে মোলাকাত হল। আমি তখন নেহাতই অনভিজ্ঞ মফস্বলী তেলা-মাথায়-দুই-বিনুনি মেয়ে একটা। তাই তার সাথে অবাক বিস্ময়ে এটাও জানলাম- পেয়ারা, পেঁপে এবং জামরুলের মত ফল ও লোকে যথেষ্ট পয়সা দিয়ে কিনে খায় ! আমি তো জানতাম ওই সব গাছ বাড়িতে থাকা বাধ্যতামূলক, সেটাই স্বাভাবিক।

তারপরে মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক , বাজারে বা রাস্তার মোড়ে, কদাচিৎ ফলসার সাথে দেখা হয়েছে। এক আধবার খুব অল্প, এক ঠোঙা হয়ত কিনেও খেয়েছি। বেশিরভাগ গ্রীষ্মেই আম বা তরমুজের মত ফলসা সেইভাবে দেখতে পাইনা।খুব কম দিনের জন্য চোখে পড়ে গড়িয়াহাট বাজারে বা নিউ মার্কেটের ফুটপাথে। কিন্তু বিক্রেতারা ভয়ানক রকম দাম চায়। একশো গ্রাম আধা শুকনো মরা মরা ফলসা একশো টাকা, দেড়শো টাকা ইত্যাদি শুনে শুনে ফলসা কেনার শখ মোটামুটি জীবন থেকে ঘুচে গেছে। পকেটে নাই ট্যাহা, কিন্তু শখ ষোলআনা।মগজের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা ছোটবেলার স্মৃতি মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে। তাই ফলসা বিক্রি হচ্ছে দেখলেই দাম জিজ্ঞেস করি। তারপরেই অবধারিতভাবে ‘এ-ত দা-ম কে-এ-ন?’ জিজ্ঞেস করলেই বিক্রেতা আমার দিকে এমন করে তাকায় যেন আমার সাথে কথা বলেছে বলে এবার তাকে অবেলায় গঙ্গায় ডুব দিয়ে আসতে হবে !

তা সেই ‘এ-ত দা-ম কে-এ-ন?’ -এর একটা সম্ভাব্য উত্তর পেলাম বেশ কয়েক বছর আগে, একটা হিন্দি ফিল্ম দেখতে দেখতে। আহা, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এবং তাঁর তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড হরমন বাওয়েজা অভিনীত একটি অতিদীর্ঘ , বেশ খানিকটা মজার ছবি হয়েছিল – ‘হোয়াট্‌স্‌ ইয়োর রাশি’ ; এই ছবিতে এন-আর-আই গুজরাতি নায়ক নিজের পাত্রী খোঁজার জন্য দেশে আসে; সে একশোর ও বেশি মেয়ের মধ্যে থেকে বারোটি মেয়ের সাথে দেখা করে, তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বারোটি রাশি। এবং তাদের চরিত্রও সেই রাশি বা জোডিয়াক অনুসারে বদলে বদলে যায়। সে শেষ অবধি এদের মধ্যে থেকে একজনকে বিয়ে করে। সেই বারোটি মেয়ের প্রত্যেকের চরিত্রেই অভিনয় করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। সে সবের জন্য পুরষ্কার-টুরষ্কার ও পেয়েছিলেন। গপ্পোটা সেটা নয়। গপ্পোটা হচ্ছে যে এই বারোটি মেয়ের মধ্যে একজন ছিল বেশ বড়লোক, সোশ্যালাইট গোছের; একটি দৃশ্যে সেই চরিত্র নায়ককে পার্টিতে ‘ফাআল্‌সে কা শরবত’ খেতে অনুরোধ করে, এক সুদৃশ্য গ্লাসে প্রায় রেড ওয়াইন রঙের একটি পানীয় এগিয়ে দেয়। এই দৃশ্য থেকে আমার মস্তিষ্কের বোকা মফস্বলী অংশে পিড়িং করে হলুদ বাল্ব জ্বলে ওঠে। আমার কেমন সন্দ সন্দ হতে থাকে, নিঘ্‌ঘাত এটা ফলসার শরবত, রং দেখে সেটাই মালুম হচ্ছে; আর এটা যদি গুজরাতিদের পছন্দসই ফল হয়, তাহলে হায় গরিব বঙ্গসন্তান, তোর আর প্রাণ ভরে ফলসা খাওয়া হল না !

তা সে সন্দেহ নিরসন করার জন্য আর ইন্টারনেট খুঁজে দেখার সময় হয়নি। কি করে হবে…চাদ্দিকে এমনিতেই এত এত লাল-নীল-সবুজ-গেরুয়া-রঙের এত খেল, তার সাথে বিশ্বায়ন-উষ্ণায়ন-উন্নয়ন-অবনয়ন -কোয়ালিশন- দাদা-দিদি-মাম্মি-পাপ্পু-চাচা-ভাতিজা-আমি থাকি-তুই যা ইত্যাদি… তার মাঝে
লুক্‌স্‌-লাইক-রেড-ওয়াইন’ -মার্কা-তুমি-কি-কেবলি-ছবি- নাহি-চেখে-দেখা পানীয়ের ইতিহাস-ভূগোল চর্চা করার কথা খেয়াল থাকে? তাই আমার ও ছেল নি!

কিন্তু সেই উৎসাহ আবার ফিরে এল এই মাত্র কয়েকদিন আগে জগুবাবুর বাজারে ফলের দোকানগুলির সামনে গিয়ে। সেই দেখি বড় ডালায় সবুজ কলাপাতার ওপর কালচে বেগুনি ফলসার একখানা ছোটখাটো টিলা। বেশিরভাগই আধা শুকনো। কলা, আম ইত্যাদি কিনে, সাহস করে দাম জিজ্ঞেস করতেই উত্তর – ‘আড়াইশো টাকায় একশো’। শুনেই আবার আমার চোখ বড় হয়ে গেল; মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল – ‘এ-ত দা-ম কে-এ-ন?’ তাতে সেই বিক্রেতা ঠিক অন্যদের মত নিতান্তই অবজ্ঞা এবং করুণা মিশ্রিত দৃষ্টি হেনে আমাকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল -‘ এ তো কমে গেছে; হাজার টাকা ‘শ ছিল ‘ ।

এই কথা শোনার পরেও যে আমি সেখানেই জ্ঞান হারাইনি এবং আস্ত-সমস্ত বাড়ি ফিরে এসে সাতদিন বাদে সেই গপ্পো করছি, তাতে একটাই কথা প্রমাণিত হয়- আমার কলজের বেজায় জোর; বাড়িতে যে বলত আমাদের উর্ধ্বতন ষষ্ঠ না সপ্তম পুরুষ কে যেন ডাকাত ছিলেন, সেটা নেয্যস সত্য !

তা সেই ডাকাতের মত বুকের পাটা নিয়ে এবার খানিক ইন্টারনেট ঘেঁটেই ফেললাম। দেখলাম হুঁ, মন প্রাণ ভরে ফলসা খেতে হলে বাংলার ডাকাতের বংশধর হয়ে কোন লাভ নেই, গৌরী সেন হতে হবে। ফলসা নাকি উত্তর এবং পশ্চিম ভারতে বেজায় জনপ্রিয় ফল। ‘ফালসে কা শরবত’-এর সেথায় বেজায় কদর। ফলসা চাষ করা বেশ কঠিন। গাছ প্রতি ফলন খুবই কম, মোটে এগারো কেজির আশেপাশে। তারপরে আছে ‘শেলফ্‌ লাইফ’; ফলসা দুই-তিন দিনের বেশি ঠিকই থাকে না। শুকিয়ে বা পচে যায়। তাই যত তাড়াতাড়ি যত দামে বেচা যায়, বিক্রেতার ততই লাভ। আলাদা করে ফলসার চাষ খুব কম লোকই করে। যা ফলন হয়, তার বেশিরভাগটাই বোতলজাত সিরাপ বা জ্যুস তৈরি করার জন্য কিনে নেওয়া হয়। তাই সাধারণতঃ যাদের বাড়িতে বা বাড়ির কাছাকাছি ফলসা গাছ আছে, তারাই রাস্তার ধারে বা বাজারে ফলসা বিক্রি করতে পারে। সেই জন্যই প্রিয়াঙ্কা চোপড়া সেই শরবতের গ্লাস নিয়ে গভীর মাসকারা-মারা চোখে নায়ককে মোহিত করার চেষ্টা করছিলেন ফিল্মের সেই দৃশ্যে।

‘দ্য ইন্ডিয়ান ভেগান’ নামক একটি ব্লগ আমাকে ফলসা সংক্রান্ত এত বাজার-সংক্রান্ত তথ্য এবং সাথে ফলসার ছবি যোগান দিল।

চন্দননগরের বাড়ি থেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া হয়ে গৌরী সেনে পৌঁছাতে যে পারলাম,তার পথ আমাকে দেখিয়েছেন স্বয়ং কাকেশ্বর কুচকুচে। তবে সেটা করব ভেবেছিলাম দিন সাতেক আগে। হয়নি। কি করে হবে? কে না জানে ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়…ইত্যাদি’; আগে তো ‘পাপী পেট কা সওয়াল’ কা জওয়াব দেনা হোগা না? ডেডলাইন-ডিজাইন-ক্যাচলাইন-হেডলাইন-কন্টেন্ট-গরমেন্ট- টেম্পোরারি-পারমানেন্ট ইত্যাদি পার করে এট্টুখানি সময় পেলে তবে তো প্রাণ খুলে লেখালিখি করব বা আড্ডা দেব। সেনমশাই তো এসে মাসের শেষে আমার বিলগুলো পেমেন্ট করে দিয়ে যাচ্ছেন না। অগত্যা এই অনিচ্ছাকৃত দেরি। ( যেন আমার এইসব হাবিজাবি দেরি হওয়াতে বিশ্বব্যাঙ্ক ( পড়ুন বিশ্ববাসীর গৌরী সেন )ভারতকে দুটো পয়সা কম ঋণ দেবে )।

মরাল অফ দ্য স্টোরি কি?

জীবনে একজন গৌরী সেনের খুব প্রয়োজন।
সব কিছু ভুলে দিকদিশাহীন গপ্পো আড্ডা মারার জন্য, হরমন বাওয়েজাকে নিয়ে রিসার্চ করার জন্য, গ্রীষ্মকালে ফলসা কেনার জন্যেও।

আর রিয়েলাইজেশন ফ্রম দ্য স্টোরি?
সন্ধ্যামালতী চটকে বানানো শরবত দেখতে বেশ খানিকটা ‘ফাআল্‌সে কা শরবত’ এর মতই।