“ কিরে ? একটু গতর নাড়িয়ে জলটা তুলে দে না !! ” মায়ের ডাকে রাহুল বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুল । ওদিকে মায়ের কথা কিন্তু থামছে না । বাবার শরীর খারাপ, রিটায়ার্ড, দামড়া ছেলে ছুটির দিন কাজ না করে কিকরে যে মোবাইল-এ টুক টুক করে কেউ বোঝে না। এসব শুনে বিরক্ত রাহুল যখন শেষমেশ উঠল, ততক্ষণে মা চেঁচিয়ে ক্লান্ত হয়ে কাজগুলো করে নিয়েছে। যাক, এই সুযোগে, টুক টুক করে “মা ডাকছে, আসছি” মেসেজ করে দিয়ে কিছুটা সময় পাওয়া গেছে।

রাহুল টিভি চালাল। কোথাও একটা আগুন লেগেছে বলে খবর দিচ্ছে, ব্রেকিং নিউজ-এ।উদাসীন চোখ দুটো , একটা “ধাত্তেরি” নজর দিয়ে চ্যানেল ঘোরাতে বলল অন্যদিকে। মাথা সেটা শুনল, চালু হল একটা আইটেম গান, অন্য একটা চ্যানেল-এ। ‘বেটার’ বলল চোখ। বেশ খানিক সময় পেরিয়ে গেছে, ফোনের দিকে আবার নজর, টকাটক রেপ্লাই , টকাটক কথা। মুখে অনেক কিছুই বলা যায়ে না, মনে আসে না সেগুলো বলার কথা, তবে লেখায়ে সে বাধা নেই।

যা খুশি লেখ, ভাল না লাগলে তো একটা ‘সরি’ আছেই।

“এই, আজ বেরবি? চল কফি খাই, সি সি ডি ?”

“উম্, আচ্ছা চল।“

“হাউ আন রোমান্টিক !! বিরক্তিকর!!”

“খাব বলছি তো!!”

দুপুরে ভাত ডাল পোস্ত ছিল। রাহুল মুখ বেকিয়ে বলল, “ধুর এ আবার মানুষে খায়ে?”

“আজ তো নিরামিষ।” রান্নাঘর আওয়াজ দিল।

“বুদ্ধ পূর্ণিমা বলে নিরামিষ? কি ব্যাক ডেটেড থট মা!”

যাক, কোন ভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
New Doc 15_1

রনিতা অপেক্ষারত, সেও টকটকদুরস্ত। রাহুল আসতেই মুখ বেকিয়ে বলল, “আসছি বেবি? এই তোর আসছি বেবি? ৩০ মিনিট লেট!!”

“আরে বাসটা লেট করলে কি করব? জ্যাম ছিল।“

চলল দুজনের একসাথে বসে বিভিন্ন আলাপ, আলোচনা, সিনেমা, অর্ডার দেওয়া, কফি খাওয়া, আরও অনেক কিছু। শুধু মাঝে মাঝে চলল, চোখ তুলে একবার একে অপর কে দেখা, আর চোখ নামিয়ে টক টক করা।

ফোন যে কখনো হাল ছেড়ে দেবে এটা ভাবা যায় না বোধয়। অন্তত রাহুল কখনই সেটা ভাবে নি।

তাও রাস্তার মাঝখানে। তবে ভাগ্যিস হাল ছেড়েছিল। মুখটা তুলেই রাহুল বুঝেছিল যে আরেকটু হলেই ও চলন্ত বাসের তলায় চাপা পড়তো। টকটকানিতে মশগুল হয়ে রাস্তা পেরনোর সময় সিগন্যাল-এর চকচকানি চোখে পড়েনি।

হাত ফসকে ফোন রাস্তায়ে, আর বাসের চাকা ফোনের ওপরে। অজস্র লোকের ‘কি হোল কি হোল’ রব , আর ‘খুব বেঁচে গেছো ভায়া’ শোনার মাঝে রাহুল বুঝল, আজ অনেক দিন পর, ও ফোনের দিকে মাথা না ঝুকিয়ে হাঁটছে।

নতুন রাস্তাটা পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে। কয়েকটা নতুন বাড়ি বানানো হচ্ছে , আর তাদের ফাঁকে পূর্ণিমার চাঁদটা উঁকি মারছে। নাহ, রনিতাকে আজ একটা কল করতে হবে, খুব চেঁচাবে, তাও, ওর গলাটা শুনতে চায় রাহুল।

মাথা গুঁজলে তো শুধু ফোনে টকটকানি, আর বাস ট্যাক্সি চাপা পড়া, আর লুকিয়ে থাকা।

সবসময় নাহক, কিছুটা সময় তো মুখ মাথা তুলে জগতটা দেখা যেতেই পারে। তার সৌন্দর্য একদম অকৃত্রিম।

সামনেই বোধয় নজরুল জয়ন্তী, গলিতে ঢুকবার সময় কোন এক বাড়িতে কেউ আবৃতি করছে “বল বীর, বল উন্নত মম শির”

এবার রাহুলের বকা খাবার পালা শুরু, “কিরে, ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?”।

রাহুলের কপালে আজ খুব দুঃখ আছে।

পার্থ মুখার্জী

পার্থ মুখার্জী

পেশায় তথ্য-প্রযুক্তি - কিন্তু নেশা ছবি আঁকা। ব্যাগে সব সময় থাকে কাগজ কলম না হলে ফোন ভরসা। যে কোন মিডিয়ামে অভ্যস্ত। ও কলকাতার নবীন লেখক ও শিল্পী।
পার্থ মুখার্জী

Latest posts by পার্থ মুখার্জী (see all)