13046098_1239062649454718_938753217_n

বলেছিলাম কারিগরি কথা লিখব না। কিন্তু দেখলেন তো সেই কথাই এসে গেল। আসলে আমাদের কাজটা এতটাই কারিগরি নির্ভর যে একে বাদ দিয়ে, আমাদের আর অস্তিত্ব কোথায়?

১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালের কাজ শুরু হল। আমাদের কাজ শুরু মানে তো সলতে পাকানো থেকে। স্ক্রিপ্ট তৈরী করা। তার থেকে লোকেশন তালিকা, চরিত্র তালিকা তৈরী করা। চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রী বাছাই করা। ঘুরে ঘুরে কোথায় কোথায় শুটিং করা যেতে পারে বা আমাদের গল্প অনুযায়ী খাপ খাওয়ানো যেতে পারে, সেসব জায়গা নির্ধারণ করা। পোষাক পরিকল্পনা করা। আরো আরো কত কাজ।

এসব কাজে আনন্দ পেতাম। ভালোবেসে করতাম। কোনোদিন ক্লান্তি বোধ করিনি। নিজে নিজে অনেক উপায় উদ্ভাবন করতাম, কি করে কতটা সহজ করে করা যায় কাজটা। এমন একটা লিস্টি বানাতে হবে যেটা সব কলাকুশলীদের সামনে থাকবে এবং তারা এক চোখ বুলিয়েই সব কাজটা বুঝে নিতে পারবে। আমার সব সময় চেষ্টা থাকত এমন সব কিছু করার।

‘অপূর্ণ’ ছবির পোষাকের তালিকা তৈরী করেছিলাম, বিভিন্ন রঙের ব্যবহারে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারত, কোন চরিত্র, কখন, কোন পোষাক পরবে এবং কোথায় তার পোষাক পরিবর্তীত হবে। দেবকুমার দা এবং দেব দত্ত দা দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন এবং আমাকে বাহবা দিয়েছিলেন। বাহবা পাওয়ার জন্য নয়, ওঁনাদের উৎসাহ পেয়েছিলাম বলেই, আরও নতুন কিছু করার তাগিদ থাকত সব সময়।

এই রঙের কোড ব্যবহার এখন হয়ত নতুনত্ব কিছু নয়। কিন্তু ছাব্বিশ বছর আগে এইভাবে কেউ ভেবে দেখেনি বা করেনি। এমন অনেক তালিকাই তখন আমার উদ্ভাবনি চিন্তা দিয়ে তৈরী করেছিলাম, যা পরবর্তী কাজেও ব্যবহার করেছি। সেগুলির নমুনা দেখাতে পারলে বোঝানো সম্ভব হত। এখানে তার উপায় নেই।

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’এর যে গল্প থেকে ‘বিবাহ অভিযান’ সিরিয়ালটি তৈরী হয়, তার নাম ‘গনশার বিয়ে’। এই গল্প থেকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বর যাত্রী’ হয়ে গেছে অনেকদিন। সেই চলচ্ছবি থেকেই উঠে এসেছিলেন পরবর্তী সময়ের নামী অভিনেতা কালী ব্যানার্জী। শোনা যায়, ওঁনার কথা আটকে যাওয়ার যে ঝোঁক, সেটা ওই গনশার চরিত্র করার সময় থেকেই তার সঙ্গে থেকে যায়। কারণ গনশা ছিল তোতলা।

আমাদের গনশা হল শঙ্কর চক্রবর্তী। অসাধারণ অভিনয় করে সবার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল সে। তার সঙ্গে এই জগতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে বরাবরের মত, ঐ অভিনয় থেকেই। এই ধারাবাহিক এ শঙ্করের মত অনেকেই প্রথম অভিনয় করতে আসেন। পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে অপরিহার্য হয়ে যান তাঁরা সকলেই। শুভাশিষ মুখার্জী, রাহুল বর্মন, জয় বাদলানী, দীপন তপাদার, রঞ্জন ব্যানার্জী। দীপন পরে দেবকুমার দা’র পরিচালনায় একটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। কিন্তু সেই ছবিতে তার যে নায়িকা ছিল তাকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে, দুজনেই এ জগত থেকে সরে গেছে। আমার প্রথম কাজের সঙ্গে এঁদেরও যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বিবাহ অভিযান’ তাই এদের সাথে আত্মীক যোগাযোগটা আজও রয়ে গেছে।

প্রথম পর্বের শুটিং শুরু হল জয়নগর মজিলপুর এ। জায়গাটার নাম যে একসাথে জয়নগর মজিলপুর, ওখানে গিয়ে জানলাম। যেখানকার মোয়া সর্বজনবিদিত। এর পরের ক’দিন সকাল সন্ধ্যে প্রাতঃরাশ আর সন্ধ্যের জলখাবারে মোয়া খেতে খেতে অত্যিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম।

১৯৯০ এর ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা সদলবলে সেখানে গিয়ে তাঁবু গাড়লাম। তাঁবু গাড়াই প্রায়। এখন কেমন বলতে পারব না। তবে তখন ওখানে থাকার মত কোনো হোটেল ছিলনা। বিভিন্ন লোকের বাড়িতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতাম। এক বাড়ির যে ঘরে দেবকুমার দা’র থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানেই আশ্রয় মিলেছিল আমার আর আমার এক সহকর্মীর।

তখন আবহাওয়ার এত অবনতি হয়নি। খুব ঠান্ডা পড়ত শহরে। আর জয়নগর তো শহর থেকে অনেক দূরে। বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। দেবকুমার দা শুতেন একটা তক্তাপোষে। আর আমরা দুজন শুতাম মাটিতে। মোটা করে খড় বিছিয়ে তার ওপর চাদর পেতে। ঘরে আলো নিভে যাবার পরেও আমাদের আলোচনা চলত। যেমন আজকের কাজে কি কি ভুল হল না হল না, কাল কি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেটা আমার শিক্ষানবিশীর, মণি মুক্তো কুড়িয়ে নেবার সময়। সে সময়গুলো কোনোদিন ভোলা যাবে না। কথাবার্তা চলতে চলতেই কখন যে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসত, টের পেতাম না।