কতটা সেকেলে হয়ে গেছি তা একটা প্রমাণ পেলুম আজকে। সিনেমা দেখতে গেছি – ভালো কথা। চলতে চলতে একটা সময় সে সিনেমা শেষও হয়ে গেছে, মানে ঐ নাম দেখাতে শুরু করেছে আর কি – হাফ লোক উঠে হাঁটা লাগিয়েছে -ভিড় – ঠেলাঠেলি – দেখি কিছু পাবলিক তখনও চোখে চশমা সেঁটে বসে আছে। মনে মনে ভাবলাম একি কেস? কিন্তু তাতেও তারা ওঠেনা দেখে মনে হল এত পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেছে, বোধহয় শেষ অবধি নাম দেখানটুকু দেখবে। এমনি করতে করতে প্রায় বেরিয়ে এসেচি – তখন দেখি স্ক্রিনে নামের বদলে আরেকটু কি সব দেখাচ্ছে। ভাবলাম এ কি রে বাবা – আবার প্রথম থেকে রিলটা ঘুরতে শুরু করল নাকি? পরে বুঝলুম না তা নয় – আরেকটু গপ্প দেখান হচ্ছে। সেই কমিকের শেষ পাতায় যেমন ক্লিফ হ্যাঙ্গার করা হত এক কালে – সেইরকম। মানে দর্শককে আরও একটু তাতিয়ে দেওয়া – বেরিয়ে আসার পর শুনলাম এরকম নাকি মার্ভেল সব সিনেমায় করে থাকে – আর নিজেকে বললাম – শালা, বেকুবিরও একটা সীমা থাকে – এদ্দিন ধরে সিনেমার পর্দায় ঢিসুম ঢাসুম গিলছি – আর এইটাও জানতাম না? বোঝ কাণ্ড। যাক গে – সে বেকুবির কথা এখন থাক। সিনেমার কথায় আসি।

আমিও কাপ্তান

হ্যাঁ, নতুন অ্যাভেঞ্জার সিনেমার কথাই বলছি। ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা – সিভিল ওয়ার। তা সিভিল ওয়ার বলতে যা বোঝায় সেই গৃহযুদ্ধ কাপ্তান করেছেন ভালোই মানতে হবে – সেই ধোঁয়া, আগুন, গোলা বারুদ, বন্দুক,পিস্তল, ঢাল তরোয়াল, স্পাইডারম্যান – সবে মিলে এক্কেবারে জমজমাট ব্যাপার। তবে কিনা হ্যাঁ – কেউ যদি এই সিরিজের আগের কোন সিনেমা নাই দেখে থাকেন, তাহলে বুঝতে একটু অসুবিধে হতে পারে। যেমন আমার পাশের সিটের কয়েকজন দম্পতির হচ্ছিল। বার বার উঠে পপকর্ন খাব, আলুভাজা খাব, মোমো খাব। অনেকটা যেন আলিবাবার গল্পে বন্ধ দরজার সামনে কাশিমের ‘চিচিং ফাঁক’ ভুলে গিয়ে খেতে না পেলে মানুষ কি করে – ‘খাই খাই ফাঁক’ আওড়ান টাইপের ব্যাপার – যা পাব তাই ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে যেব নইলে বার করে দেব – সেরকম ধান্দা থাকলে আপনার কাছে ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকাও যা, পাগলুও তাই। সিরিয়াসলি হোয়াট দা ফাঁক।

সে যাই হোক। সিনেমায় আসি। এবারের সারপ্রাইজ প্যাকেজ নিঃসন্দেহে স্পাইডার-ম্যান। একদিকে তার চোখে সুপারহিরোদের প্রতি শ্রদ্ধার অন্ত নেই আবার তাদের সাথে লড়তেও হচ্ছে। এই দলে সে সবচেয়ে ছোট – কিন্তু সমান-তালে পাল্লা দিয়ে চলেছে বড়দের সাথে। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও অ্যান্ট ম্যানের ছুঁড়ে দেওয়া সংলাপও খুবই উপভোগ্য। আসলে দুই দলের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময়ে এই ছোটখাটো কনট্রাস্টই কিন্তু দৃশ্যটাকে বাঁচিয়ে রাখে – কখনও নির্মল হিউমার বা কখনও নির্মম স্যাটায়ার। গল্প বলে দিলে মজাটা হালকা হয়ে যাবে – আর তাছাড়া এরকম স্পেশাল এফেক্ট ছেড়ে আমার রিভিউ পড়বেন – সে দুধের স্বাদ অম্বলে মেটানোর মত অবস্থা হবে। হ্যাঁ, যেটুকু না বললেই নয়, তা হল আলট্রনের সাথে লড়াইয়ের সময় সোকোভিয়ায় নিজের পরিবারকে হারিয়ে এক সৈনিকের ষড়যন্ত্র ফাটল ধরাতে শুরু করে অ্যাভেঞ্জারদের অটুট দুর্গে – যেখানে ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকা আর আয়রন ম্যানের দলবল। বাদবাকিটা – শক্তিপদ চট্টোপাধ্যায় যেমন পাণ্ডব গোয়েন্দায় লিখতেন না – ‘ডিস্যুম’ – ঠিক তাই।

আমি বরাবর মার্ভেল ফ্র্যাঞ্চাইজির বেকুব ফ্যান (যে শেষ দৃশ্যের পরের দৃশ্য ব্যাপারটা এদ্দিন জানতো না) – কিন্তু লক্ষ্য করেছি যে অন্যান্য সুপারহিরো চরিত্রদের সিনেমাগুলোর তুলনায় ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকার গল্পের ঠাসবুনট একটু বেশি। সে প্রথম দিন থেকেই। সেই প্রথম সিনেমায় – ক্যাপ্টেনকে সিরাম দেওয়ার আগে একটা ফলস গ্রেনেড ছুঁড়ে পরীক্ষা করা হয় আর ক্যাপ্টেন সেটাকে দুরে সরিয়ে দেওয়ার বদলে গ্রেনেডটাকে মুড়ে শুয়ে পড়ে – আমার কাছে থেকে ক্রিস ইভান্স হিরো সেই দিন থেকেই – ঢাল তরোয়াল আর ফর্সা ভীমের মত বগলে ফোঁড়া নিয়ে হাঁটার স্টাইল তো পরের ঘটনা। সেই ফুটফুটে পেগি কার্টারের সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাক-ড্রপে হালকা প্রেম, পুরনো বন্ধুর জন্য জান কবুল করে দেওয়া অথবা কোনও নিয়ম শুনতে না চাওয়া – সবে মিলে কোথাও যেন ক্যাপ্টেন স্টিভ রজার্স যেন ক্যাপ্টেন আম্যেরিকার লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজটাকে ছুঁড়ে ফেলে ভিড়ের মধ্যে মিশে যান। সুপারহিরো সিনেমার হিসেবে এই সাফল্যটা অসাধারন।

ঐ যে অ্যাভেঞ্জারের প্রথম সিনেমায় ক্যাপ্টেনের এক পিস ডায়লগ ছিল না – “সুপারহিরোর স্যুটটা খুলে রাখলে তুমি কে?” যদিও ডায়লগটা অনেক বেশি বিখ্যাত আয়রন ম্যানের ‘জিনিয়াস-প্লেবয়-মিলিওনিয়ার-ফিল্যান্থ্রপিস্ট’ মার্কা ডাকাবুকো প্রত্যুত্তরের জন্য, কিন্তু আসল সত্যি তো এটাই যে সুপারহিরো সিনেমা আমাদের কাছে এক রোম্যান্টিক ইলিউশন ছাড়া আর কিছুই নয়। হলিউডে গল্প লেখা হয় না, তৈরি হয়। তবুও গল্পের লেখকদের তারিফ করতেই হচ্ছে কারন বন্দুক পিস্তলের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ চিঠিতে ক্যাপ্টেনের বন্ধুত্বের হাতছানি – এখনও এক মুহূর্তে আমাকে কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। থ্যাঙ্ক ইউ ক্যাপ্টেন।

Latest posts by অভ্র পাল (see all)