আগের পর্ব


কারিগরি কচকচানি অনেক হ’ল। আর ওসব আলাদা করে লিখব না। যখন যেমনভাবে সামনে আসবে, আলোচনা করা যাবে তখন। বরং কাজের কথা বলতে বলতে কাজের বাইরের কথা কথা কিছু বলি। কাজের বাইরের বলে উল্লেখ করলাম বটে কিন্তু এই অকাজ-গুলো আমাদের কাজের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। সত্যি কথা বলতে, এসব মুহূর্তই আমাদের কষ্ট ভুলিয়ে আনন্দময় করে রেখেছে আমাদের কর্মজীবন এবং তা কোনো কোনো সময় যথেষ্ঠ রঙীন।

আগেই বলেছি ‘অপূর্ণ’ আমার কাজ করা প্রথম চলচ্ছবি। শুধু তাই নয়, আমার কাজ শেখার শুরুও তো সেখান থেকেই। অপূর্ণ’র ডাবিং এর সময়ের একটা মজার ঘটনা বলি। ছবিতে এমন অনেক ছোটখাট চরিত্র থাকে, যাদের উপস্থিতি অনেক থাকলেও, কথা বার্তা হয়ত বিশেষ নেই বা থাকলেও অনেক নয়। যেমন ধরা যাক, বাড়ির কাজের লোক এসে বলল, দিদি আপনাকে বড়মা ডাকছেন। বলেই সে চলে গেল। এখন এই কথাটুকু ডাব করতে হবে তো? অতএব সেই অভিনেতাকে এই টুকু বলাবার জন্য কষ্ট দিয়ে না ডেকে আমরাই কেউ বলে দিতাম।

সেলুলয়েড জমানায় আমার মনে হয় প্রায় সব সহকারীকেই কোনো না কোনো ছবিতে এমন ডাবিং করতে হয়েছে। তবে সমস্ত ছবি জুড়ে থাকা চরিত্রের মুখেও যে আমাদের কেউ কেউ কথা বসিয়েছে, এমন ঘটনাও অনেক আছে।

এই ডাবিং নিয়ে নানান লোকের নানান অভিমত। হলিউডে অনেকদিন আগেই হত, এখন আমাদের ছবিতেও হচ্ছে, সিঙ্ক সাউন্ড। অর্থাৎ শুটিং চলাকালীন শব্দটাই মূল ছবিতে থাকছে। হয়ত কিছু আধুনিক কারিগরী দিয়ে তাকে আরো সুন্দর করা, এই টুকুই। কোনো কোনো পরিচালক, অভিনেতা বিশ্বাস করেন, অভিনয়ের সময় বলাটাই ঠিক বলা হয় বা ঠিক বলতে পারা যায়। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতে তা ভুল নয়। যদি কোনো দুই চরিত্র জগিং করতে করতে কথা বলছেন, কি দুজনের মধ্যে বচসা হচ্ছে, হাতাহাতি হচ্ছে এবং কথা বিনিময় চলছে, সেখানে এমন শব্দগ্রহন খুবই কার্যকরী। তবে ভালো অভিনেতারা এতটাই পটু যে তারা স্টুডিওতে বসে অভিনয়ের সময়ের ভাব রেখেই অভিনয় সহযোগে ডাবিং করতে পারেন।

আবার অন্য মতে , শুটিং এর সময় কোনো ত্রুটি থাকলে, তা শুধরে নেবার এক উৎকৃষ্ট পদ্ধতি এই ডাবিং। একটা বাক্যকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতরকমভাবে বলা যায়। স্টুডিওয় বসে সেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। তবে এ কথাও ঠিক যে, যে শব্দ ঠোঁটে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো বলতেই হবে। পাঠক লক্ষ্য করুন আমি ‘দেখা যাচ্ছে’ কথাটা ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ যেখানে চরিত্রের ঠোঁট দেখা যাচ্ছে না, সেখানে আমি অন্য কথাও বসাতে পারি। ঠোঁট দেখা যাচ্ছে এমন জায়গাতেও অন্য শব্দ বসানো যায়। যেমন ধরুন বলেছে, বাপ। আমি সেখানে বসাতে পারি, মাপ, খাপ, লাফ, টাফ এমন অজশ্র শব্দ, যা কিনা ওই ঠোঁট নাড়ার সঙ্গে মিলে যায়। তা অবশ্যই গল্প, চরিত্র, চিত্রনাট্যকে মাথায় রেখেই করতে হবে।

শুটিং এর পরে, সম্পাদনা করতে বসে যদি কোনো পরিচালকের মনে হয়, ইস্‌ এই চরিত্রের মুখে, এই দৃশ্যে ওই কথাটা যদি বলানো যেতো, ভালো হতো। ডাবিং এ সে সুযোগ আছে। তবে ওই যে বললাম, ঠোঁট না দেখিয়ে ব্যাপারটা করতে হবে এবং সেটার জন্যেও বেশ মুন্সিয়ানার প্রয়োজন। কথায় কথায় অন্য একটা কথা উঠে এলো, সেটা নিয়ে একটু বলি। এই যে সম্পাদনার সময় পরিচালকের মনে হল চরিত্রের মুখে অন্য কথা বসাবার কথা, এর পথ প্রদর্শক কিন্তু সম্পাদনা। সম্পাদনা অনেক নতুন পথের সন্ধান দেয়, অনেক নতুন ভাবনার উন্মেষ ঘটায়। এটা একটা অন্যতম কারণ, যে কারণে সম্পাদনাকে দ্বিতীয় পরিচালনা বলা হয়।

আমাদের সব কাজটাই আপাত দৃষ্টিতে খুব সহজ, সোজা মনে হয়। আসলে তা নয়। প্রত্যেকটি কাজের জন্যে বিভিন্ন রকমের কাজ জানা মানুষ এতে নিযুক্ত আছেন। তাদের কাজটা শিখে প্রস্তুত হতে হয়েছে। প্রথমে তিনটে ছবিতে আমাদের অবজার্ভার থাকতে হয়। এই সময় কাজের মধ্যে থেকে কাজটা বোঝা, শেখা। তারপর আমি কার্ড পাবার যোগ্য বলে গণ্য করা হয়। এরপরের ধাপ, পরীক্ষা, ইন্টারভিউ।

মজার কথা আমার প্রথম অবজার্ভার কার্ড পাই চিত্রগ্রাহক হিসেবে। সৌমেন্দু রায় এর হস্তাক্ষর সম্বলিত সেই কার্ড এখনও আমার কাছে আছে। টালিগঞ্জ চলচ্চিত্র জগতে আমার প্রথম পদার্পন হয়েছিল, ক্যামেরা ডিপার্টমেন্টেই, চিত্রগ্রাহক শঙ্কর ব্যানার্জীর হাত ধরে। শঙ্কর দা তখন অনেক কাজ করতেন। শঙ্কর দা আমাকে তাঁর নিজের ঝুলি থেকে অনেক বই দিয়েছিলেন পড়তে। সবগুলিই ক্যামেরা ও ফোটোগ্রাফি সংক্রান্ত। সেসব বই আমাকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করেছে, কোনো সন্দেহ নেই। শঙ্কর দা’র স্নেহ ভুলব না।

আমাকেও লিখিত পরীক্ষা দিয়ে, ইন্টারভিউ এর সম্মুখীন হয়ে সে কার্ড অর্জন করতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আমি পরিচালনা বিভাগে চলে আসি যেহেতু ছবি পরিচালনা আমায় বেশি টানত বলে। এখন খুব অনুশোচনা হয়, তখন যদি কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে বলত, চিত্রগ্রাহক হয়েও ছবি পরিচালনা করা যায়, তাহলে হয়ত আমি বিভাগ পরিবর্তন করতাম না। বর্তমানে গোবিন্দ নিহালিনী, সন্তোষ শিবন সহ আরো অনেক সফল চিত্রগ্রাহক-পরিচালক আছেন। আমাদের এখানেই দু’জন চিত্রগ্রাহকের নাম মনে পড়ছে, যাঁরা ছবি পরিচালনা করেছেন। এক, অভীক মুখোপাধ্যায়, দুই, সৌমিক হালদার। অভীক এর ছবি ‘একটি তারার খোঁজে’ তে আমার সহকারী হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।

কোন কথা বলতে গিয়ে কোন কথায় চলে গেলাম দেখুন। তো সেই অপূর্ণ’র ডাবিং এর সময়, দেবকুমার দা আমায় বললেন, রানা, তুমি ড্রাইভারের ভয়েসটা ডাব করে দাও। দৃশ্যটা ছিল সে এসে একটা প্যাকেট মত কিছু মনিবকে দিয়ে, একটা কথা বলে চলে যায়। প্রথমে ভয় পেলেও, আমার তো তখন চলচ্চিত্রের সব শেখার দারুন আগ্রহ। সব কিছু করার সুযোগ পেয়েছিলাম বলেও হয়তো সব কিছু শিখতে পেরেছি, এটাও সত্যি।

দাঁড়িয়ে পড়লাম মাইকের সামনে। কানে হেড ফোন, সামনে ঝুলে আছে মাইক। আধো আলো আধো অন্ধকার ঘর। ঘেরাটপের মধ্যে আমি। সামনে বড় স্ক্রিনে চলছে ছবি। প্রথম দু’তিন বার তো বোঝবার আগেই পেড়িয়ে গেল জায়গাটা। সেদিন টিটো দা মানে দীপঙ্কর দে উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তিনি কয়েকটা টিপস দিলেন, কিভাবে দৃশ্যের অন্য চরিত্রদের অঙ্গভঙ্গী খেয়াল করেও ঠিক জায়গাটার হদিস রাখা যায়, বলে দিলেন। অবশেষে আমার ডাবিং সম্পন্ন হল। আজকাল ডাবিং আরো সহজ হয়ে গেছে। যা বলা হয়েছে শুনে, আগে, পড়ে বলে দিলেই হল। শব্দগ্রাহক ঠিক জায়গায় বসিয়ে দেবেন।

ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার পর, টিটো দা আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, কি, রানা, কোনটা সহজ মনে হচ্ছে, পরিচালনাটা না অভিনয়টা? উপস্থিত সকলেই হেসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আজ বুঝি উনি বলতে চেয়েছিলেন, কোনো কাজটাই সহজ নয়। যে কথাটা আমি একটু আগে উল্লেখ করেছি, কাজের মুন্সিয়ানা আনতে অধ্যাবসায়ের কোন বিকল্প নেই।