আগের পর্ব


 

সাত দুকুনে চোদ্দর চার – হাতে রইল পেনসিল


 

প্রজেক্ট ম্যানেজ সিরিজ অনেকদিন বন্ধ ছিল। কেন বন্ধ ছিল জিজ্ঞেস করায় এক এক জনকে এক এক রকম উত্তর দিয়েছি। যেমন – “তর্ক নেই বলে লেখা হচ্ছে না!”

“কেন – সে গেল কোথায়?”

“জলদাপাড়া”

“জলদাপাড়া – বলো কি?”

“থুড়ি – কাজিরাঙ্গা”

“ধুত্তেরি তাতে কি?”

“না মানে জঙ্গলে গিয়ে গণ্ডারের প্রেমে পড়েছে – তার বগল, কনুই, গলার এমন ছবি তুলেছে – যেন দীপিকা-ক্যাটরিনা-আলিয়ার ককটেল। সেই ছবি দেখতে দেখতেই তার সময় কেটে যাচ্ছে, বড় একটা হাসিঠাট্টা করছে না – ফলে গপ্পের আসরও বসছে না।”

আবার হয়তো কখনও পুজোর সময় পাড়ায় ঘুরছি – এমন সময় একজন ইস্কুলের মাস্টারমশাই বললেন, “তোমার লেখা খুব পড়ছি – অফিসের গল্পগুলো তো বেশ মজার।”

লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলুম। একে তো ঘটনাগুলো কহতব্য নয় – তার ওপরে আমার এক কালের মাস্টারমশাই সেইসব আনসেন্সরড লেখা পড়েছেন – আর আমি সেই কলঙ্কিত ছাত্র কিনা তাতে লজ্জা লজ্জা পেয়ে ব্লাশ করছি। বললাম, “আপনি যেরকম ভাবছেন, তেমনটা ঠিক নয়”

“মানে?”

“মানে গল্প – কিন্তু বানান নয় – এমনটা হামেশাই ঘটে থাকে।”

“বল কি?”

পাশ থেকে আমার কাকা চাপা গলায় বললেন, “বেশি বলিস-নি -অন্য পাড়ার মেয়ে বিয়ে করতে হবে বলে একটা লোক চিরকুমার থেকে গেল!”

অমনি নারদ নারদ লেগে গেল।এখন কাকা আর মাস্টারমশাই বাল্যবন্ধু – তাঁরা ফাজলামি করতেই পারেন, তাই বলে আমার সামনে? তাই সসম্মানে কিছুদিন চুপ করে রইলাম।

এখানে শেষ হলে তাও কথা ছিল– কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না – বাঘের ঘরে ঘোঘের বাসা না কি যেন? সেরকম একদিন আমার বসেরও বস – একদিন আমাকে তেনার অ্যাকোরিয়ামে – থুড়ি ক্যাবিনে ডেকে পাঠালেন। “শুনলাম তুই নাকি ব্লগ করিস?”

“ইয়ে ঐ একটু আধটু?”

“কি লিখিস?”

“ফিরিঙ্গি কবিতে আর বাংলায় এলেবেলে গল্প দু একটা”

“বলিস কি – কিরকম পড়াস তো আমাকে-”

খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম – একে তো অফিসের গল্প। নাম-ধাম-চরিত্র যদিও অবফাসকেট করা আছে, তাও পরিচিত লোকজনের চেনা মুখগুলোকে খুঁজে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “তোমার খুব একটা ভালো লাগবে না – একটু খিল্লি লেখা-”

“বলিস কি – তবে তো পড়বই। এটা তো খিল্লিরই যুগ- অবশ্যই পাঠাস আমাকে – হোয়াটস- অ্যাপ ও করে দিতে পারিস।”

অফিসের আর দশটা হুকুম তামিল করার সময় যেমনি ঘাড় নাড়ি – তেমনি নেড়ে বিদায় নিলাম। মনে মনে বললাম, “যে এই লেখা পড়লে আমাকে আর যে যে দুঃখ কপালে বাকি আছে, আর বেশিদিন বাকি থাকবে না। ” সত্যি কথা বলতে কি হঠাৎ করে এই লেখাটাও কারও সুনজরে পড়ে যাবে কি না তো জানি না, অনেকেই ঠারেঠোরে বলেছেন যা বোঝ না তাই নিয়ে লেখা তোমার উচিত হচ্ছে না। সব মিলিয়ে চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু বেশিদিন চুপচাপ থাকা যায় না – পেটের ভেতরটা ভবম হাজামের মত গুড়গুড় করে – রাজার মাথায় দুটো শিং। একদিন সেই শিং বেরিয়েই পড়ে।

যাই হোক–আজকে যার কথা বলব তাকেনিয়ে আগে লিখিনি। আমাদের অফিসের একটি ছেলে আছে –জ্যোতিষ্ক। এমনিতে সাদাসিধে, নোটবুকে ছবিটবি আঁকে। একদিন ফেসবুকে ছবি দেখলুম – শখ করে বাঘের গায়ে হাত বোলাচ্ছে। মনে মনে বললাম, বাপরে এক কালে স্যার আশুতোষ – আর তারপরেই জ্যোতিষ্ক । যখনই দেখা হয়েছে, বলেছি – “কিরে বাঘটাকে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আয় একদিন।”সেও পালটা হাসে। একটু লাজুক দেঁতো হাসি। পরে যখন কাজেকর্মে আলাপ বাড়ল তখন বুঝলাম ওরকম থাইল্যান্ড (নাকি ব্যাঙ্কক) গেলে সব্বাই অমন একটু বাঘের গায়ে হাত বুলিয়ে আসে – কিন্তু আদপে সে ঘোর ভীতু। তার কাজই হিসেব রক্ষণ – কিন্তু হিসেবনিয়ে কথা শুরু হলেই – সে চোখমুখ লাল করে ফেলে, জ্যোতিষ্ক থেকে নিভষ্ক হয়ে যায়।

একদিন তাকে অফ-গার্ড ধরলুম। “কেস টা কি বল তো?”

“কোন কেসটা?”

“তোকে এমনিতে তো চালাক চতুর মনে হয় – কাজের বেলায় হঠাৎ হঠাৎ ফিউস হয়ে যাস কেন?”

“আমার মাইগ্রেন আছে”

“সিচুয়েশানাল মাইগ্রেন – আমার সঙ্গে চ্যাংড়ামো হচ্ছে?”

12511272_1169548606406123_1964383651_oঅনেক গাঁইগুঁই করে বললে, “আসলে ঐ অঙ্ক জিনিসটা আমার কিছুতেই মাথায় আসে না – আর তুমি এই ম্যানেজারদের তো জানো – আজ এই হিসেব এখুনি চাই, কাল ঐ হিসেব তক্ষুনিনিয়ে আসবি। আর আমি মাথার চুল ছিঁড়ি – একটা জুনিয়ার দিয়েছে – সে শালা কিচ্ছু করে না। পাঁচটার সময় টুক কেটে পড়ে। আর দিন নেই রাত নেই – আমার খালি হিসেব আর হিসেব – মালগুলো এত হিসেব নিয়ে যে কি করে তার নেই ঠিক।”

হেসে বললাম – “এই ব্যাপার – আগে বললেই হত?” এরপর তাকে একটা বুদ্ধি দিলাম। সে হাসতে হাসতে চলে গেল।

এর পর কদিন কেটে গেছে। দেখা গেল জ্যোতিষ্কর পারফরম্যান্স অনেকটা বেটার। তারপর একদিন তর্ক এসে বললে, “শুনলাম তুমি নাকি জ্যোতিষ্ক-কে কি একটা টোটকা দিয়েছ – আর অমনি সে হইহই করে কাজ করছে?”

“হুঁ”

“আমাদের জন্য যে কতবার বললাম, একটা ভালো দেখতে মেয়েকে নিয়ে এস টিমে – সে তো করলে না – আর যত হেল্প জ্যোতিষ্ককে – তা কি গুরুমন্তর দিলে একটু আমাদেরও বল?”

“সাত দুকুনে চোদ্দর চার হাতে রইল পেনসিল-”

“মানে?”

“মানেটা সিম্পল – আমাদের সঙ্গে কলেজে একটা ছেলে পড়ত। সে যে কোন পরীক্ষাতেই গিয়ে পাতা ভরে লিখে আসত হাতি ঘোড়া পালকি – জয় কানহাইয়া লাল – কি। আর পাশও করে যেত। জ্যোতিষ্ককেও সেরকম বললাম – যে কেউ নম্বর জিজ্ঞেস করলে কনফিডেন্টলি যে কোন একটা নম্বর বলে দিবি – থোড়াই সে তক্ষুনি খাতা খুলে বসে আছে যে তার অন্য কোন কাজ নেই যে নাম্বার মাথায় রেখে দিয়েছে। যা হোক একটা বুক চিতিয়ে বলে আসবি। তারপর দেখবি আর কেউ তোর মাথায় চেপে বসছে না। ”

“আবার ঢপ দিচ্ছ তো?”

“কোনটা ঢপ দিলাম?”

“তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে না হিস্টরি – যে পাতা ভরিয়ে নম্বর আসত – আর ভুল ভাল হিসেব কিছু একটা দিয়ে দিলেই চলবে?”

“আহা তা কেন?”

“তবে?”

“ব্যাপারটা হল গিয়ে কনফিডেন্স। আমি জ্যোতিষ্ককে শুধু কনফিডেন্সটাই দিয়েছি – বুঝলি?”

“বাহ – আর ধরা পড়লে?”

“কেন হাতে হাতে পেন্সিল তো রয়েছেই। বুক ফুলিয়ে বলবে -তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো চোদ্দো হয়নি। তখন ছিল, তেরো টাকা চোদ্দো আনা তিনপাই। আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধাঁ করে ১৪ লিখে না ফেলতাম, তাহলে এতক্ষণে হয়ে যেত চোদ্দো টাকা এক আনা নয় পাই।”

মাথা নাড়তে নাড়তে তর্ক চলে গেল। আমি বললাম, “কি রে চললি কোথায়?”

“মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এক কাপ চা খেয়ে আসি। নাহ – তোমার এই থিওরির পাল্লায় পড়ে মাথাটাই যাবে যে কোন একদিন। মনে হচ্ছে এর চেয়ে আমার গন্ডারই ভালো।”

ধুর ধুর – সব্বাই কেমন বেরসিক হয়ে যাচ্ছে।


 

Latest posts by অভ্র পাল (see all)