12544216_1168034413224209_774650714_o

সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়তাম। মা আগের দিন একটা লাল গামছা কিনে এনেছিলো। গোড়া থেকেই তক্কে তক্কে ছিলাম। পরের দিন ইস্কুল কোনো কারনে ছুটি। বেশ জুত করে সেখানা কেটে কুটে পাগড়ি বানালাম একপিস। কাগজ কেটে গোঁফ। সারাদিন চাচা চৌধুরী হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। এমন আবেগে ভেসে গেলাম যে ভুলেই গেলাম মায়ের অফিস থেকে আসাবার সময় হয়ে গ্যাছে। মা, ফিরলো, দেখলো ছেলে সদ্য কেনা গামছা ফর্দাফাই করে, তারই লাল হাতকাটা কার্ডিগান খানা গায়ে জড়িয়ে কাল্পনিক রাকাকে কাল্পনিক সাবু দিয়ে পেটাচ্ছে। যে কটা কারনের জন্য আমার মা পৃথিবীর সবচাইতে মিষ্টি প্রানী তার একটা হলো মা সেইদিন শুধু হেসেছিলো। একফোঁটাও বকেনি মারেনি। কমিক্স নামের সেই আশ্চর্য ডানা জুড়ে স্পীচ বাবল আর থট বাবলে উড়ে বেড়াতে শেখাও মার হাত ধরেই। সেই টালমাটাল সময়েই এক জন্মদিনের দিন হাতে এলো একটা কমিক্সকা বাপ (তখন গ্রাফিক বলে কোনো শব্দ আছে কিনা তাই জানিনা, তায় আবার নভেল)। নর্থ শহরতলিতে বসেই মনে প্রাণে আন্তর্জাতিক হওয়ার হাস্যকর আপ্রান চেষ্টার ওই শুরু।
তখন ডায়ামন্ড কমিসকের দাম ছিলো দশটাকায় একটা, আর নণ্টে ফন্টে হাঁদা-ভোঁদাদের সাত টাকা। আরও একট ছিলো চার-টাকা দামের হাতের তালু সাইজের হি-ম্যান। সবচাইতে দামি ছিলো অরন্যদেব, পঁচিশ টাকা। এক একটা কমিক্স ছিলো কিডনিসম। সত্যি বলছি, এখন প্রাক্তন বিষয়টা নিয়ে যতটা সেনসিটিভ তখন কমিক্স নিয়ে তার চাইতেও বেশি ছিলাম। ফলে লোহিত সাগরের হাঙ্গর-এর পিছনে নব্বুই লেখা দেখে মনে ক্যামন একটা ভক্তিভাব চলে এসেছিলো আপনা থেকেই। তারপর কিনা আবার ওত্ত বড়! ওতোগুলো পাতা! একটাই গল্প! সব মিলিয়ে একটা আশ্চর্য ব্যাপার! চমকে এক্কাকার। গল্পটা পড়েছিলাম প্রায় একদমে। তারপর প্রায় বিলিয়ান টাইমস পড়েছি। একদমে। এর আগে চাচা চৌধুরী হরেদরে এগ্রহ সেগ্রহ করেছে, ফ্ল্যাশগর্ডন তো ছেড়েই দিলাম, তাছাড়া অরন্যদেব, হি-ম্যান সব্বাই হেলায় হারিয়েছে শত্রুদের। কিন্তু এই গল্পের হীরো দেখলাম ঘুঁষি খায়, মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়, পড়ে যায়, ফেঁসে যায়। কোনো স্পেশাল পাওয়ার নেই। অসম্বব বুদ্ধি আছে এমনটাও না। কেউ যে খুব বিশেষ পাত্তা দেয় তাও না। তার মধ্যে রোগা পাতলা চেহারা। কিন্তু শেষমেশ জিত তারই হয়। এই বিষয়গুলো একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেললো। আমায় ছোট থেকেই বাড়িতে শেখানো হয়েছে তুই কিন্তু ব্যাটা গরীব এবং ইন্টালিজেন্ট আর আমি তদ্দিনে বুঝে গেছি আমি বেশ সবার মত। ফলে টিনটিন হয়ে উঠলো আরাধ্য দেবতা। ছাপোষা ইন্টালিজেন্সির জয়। দরকার শুধু সাহস আর মনের জোর।

কারন ব্যাটা ঠিক সেই সেই কাজগুলোই করত যেগুলো কর সম্ভব। কঠিন কিন্তু সম্ভব। তিব্বত মোটেই ইটারনিয়া নয়, তা সত্যিই আছে, আর ইয়েতি তো আছেই। টিনটিন যেভাবে পৃথিবী চিনিয়েছে তার তুলনা কেবলমাত্র একজনই, নিউটন নামক বিড়ালের মালিক এক প্রোফেসর। টিনটিন সবচাইতে অবাক করেছিলো ওই কারনেই। টিনটিন অবাস্তব কাজ করেনা, কঠিন কাজ করে। আর গল্প? এ বলে আমায় পড় ও বলে আমায়। জীবনের মুল লক্ষ্যই হয়ে উঠলো পয়সা জমাও টিনটিন কেনো। যথারীতি ওত টাকা ওই সময়ে কোনোদিন জমেনি। ফলে চেয়েচিন্তে ধার করে পড়া ছাড়া উপায় রইলো না। বইগুলোর গুলোর ব্যাক কভারটায় লিস্টি করে দেওয়া থাকতো সবকটা বইয়েরর নাম। সেই দেখে দেখে মেলানো শুরু। কোনটা বাকি রয়ে গ্যালো। টিনটিন রিয়্যাল। সম্মানটা আশ্চর্য বাড়লো যখন বুঝতে পারলাম টিনটিন নীল আর্মস্ট্রং এর আগে চাঁদে গ্যাছে। উরেব্বাস!! ফ্রান্সিস বেকনের কল্পবিজ্ঞান থেকেই রয়্যাল সোসাইটি হয়েছে না? হার্জ গুপ্ত বিজ্ঞানী না হয়ে যায়না। এই নিয়ে ইস্কুলে তর্ক মারামারি ওবদি পৌঁছোলো। যথারীতি অসম্ভব মার খেলাম। প্রথমে বন্ধুর কাছে, তারপর আমি আর সেই বন্ধু টিচারের কাছে। কারন টিচার জিজ্ঞেস করেছিলো মারামারি করেছিস ক্যানো? আমি উত্তরে বলেছিলাম শুধু মারা হয়েছে মারিনি। কারন টিনটিনও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেয়। তারপরেও মারাই হলো।

কালের নিয়মে পেছনে কার্বাইড পড়লো। টিনটিনকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। বিপ্লবিদের দঙ্গলের ওই ছবি দুটো মনে আছে? সেই যে টিনটিনদের প্লেন যখন প্রথম বার নামছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বসতির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে আর যখন টিনটিন আর ক্যাপ্টেন তাদের বন্ধু আলকাজারকে প্রেসিডেন্ট করে ফিরে যাচ্ছে তখনও না খেতে পাওয়াদের রাস্তার ধারের বাড়ির সামনে সেনা টহল দিচ্ছে। তাছাড়া ওটোকারের রাজদন্ডের টুইস্ট, বা ফ্লাইট ৭১৪ এ সত্যি বলার ইঞ্জেকশনে ক্যারিদাস আর রাস্টাপপুলাসের কান্না? প্রতিবার, সে কাঁকড়া রহস্য হোক বা লাল বোম্বেটের জাহাজ বা চাঁদে টিনটিন, অত্যাধিক নেশার ফল যে কি হতে পারে সেটা অত মজারু ভাবে একবারে আর কেউ বোঝাতে পারেনি। এছাড়াও আরও কত কত কত। বিতর্কও যে হয়নি এমনটা নয়। বেশিরভাগ সময়ই এশিয়ানদের খল হাস্যকর চরিত্র করা হয়েছে বলে কথা উঠছে। প্রোফেসর ক্যালকুলাসের বধিরত্ব নিয়ে মজা করা হচ্ছে বলে কথা উঠেছে। এমনকি আমার সঙ্গে এক বন্ধুর এই মর্মে তর্ক হয় যে লোহিত সাগরের হাঙ্গর গল্পে আফ্রিকার গরীব মুসলমানদের এত অবোধ দ্যাখানো হলো ক্যানো? আমি যদিও ক্রীতদাস প্রথাকে অসম্ভব গালাগাল করে লড়ে গেছি। আর লড়ব না ক্যানো? টিনটিন তো অসম্ভব রকম বাঙ্গালী, তার চার পাশের সমস্ত মানুষগুলোই তাই। তার জন্যে অবশ্যই দায়ি আরেকজন মানুষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

একবার ইংরিজিতে পড়বার চেষ্টা করেছিলাম টিনটিন। অসহ্য লেগেছে। একটুও বাড়িয়ে বলছিনা। কারন বাংলা এমন একটা ভাষা যেটা বলবার ধরন এমনকি পাড়া বিশেষেও বদলে যায়। এলাকার কথা তো ছেড়েই দিলাম। যেমন “দারুন ভালো” বিষয়টা গড়িয়ার দিকটায় “ফাটিয়ে”, লেকটাউনের দিকটায় “সেরা”, কফিহাউসের দিকে “লেভেল”, দমদমের দিকে “গোলা” ইত্যাদি। টিনটিনের বাংলাটাও একটা আলাদা ধরন। শব্দচয়ন একদম গোলা। একেবারে নিজস্ব। যেমন – “ক্ষির! নিশ্চয়ই ওপরে একটু চিনি ছড়িয়ে”, “ওটা খাসনা কুট্টুস, ওটা খেলে মানুষের মত নচ্ছ্বার হয়ে যাবি”, “বাহ, দিব্যি মানিয়েছে”, “চাঁদে যাচ্ছি বলেই কি হ্যা হ্যা করে হাসতে হবে নাকি?”, “এই তোমায় বেঁধে ফেললাম এবার একটা কুমির এসে তোমায় খেয়ে ফেলবে” ইত্যাদি। প্ল্যাটিপাস যে আসলে একটা প্রানীর নাম, এটা কোনো গালাগাল নয় সেতো জানলাম এই সেদিন। একটারও কোনো কম্পিটিটর পাওয়া যাবেনা। কেবল মিলানের কোকিলকন্ঠি বিয়াংকা কাস্তাফিওরের গানগুলোর যা লিরিক সেটারই একমাত্র কম্পিটিটর আছে। উনি যদি গান “আমি এক ছোট্ট মেয়ে, ভীষন ছোট্ট আমি/চোখের তারা নীলচে আমার চুলগুলো বাদামী” তবে তার উত্তর হলো “তুতু তু তুতু তারা/ খাবি খাতা দিল হামারা” গায়ক, কেল্টু দা।

টিনটিন চিনিয়েছে পৃথিবী। টিনটিন চিনিয়েছে যুদ্ধ। টিনটিন সেই কবে তেলের পাইপ উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল ধান্দাবাজদের মুন্ডুপাত করে গ্যাছে। নেশার চোরা কারবারিদের ধরছে। আমেরিকান গ্যাংস্টারদের জেলে ঢুকিয়ে ন্যাসকার ভূমিকে শান্ত করে তবে ফিরেছে। শুধু একটা স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে নিজের বন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে গ্যাছে নিজের প্রানের মায়া না করে। চাঁদ আর সমুদ্রের তলদেশের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। একটা ছেঁড়া খবরের কাগজের ওপর ভরসা করে বাঁচিয়েছে নিজের আর নিজের বন্ধুদের প্রান কিন্তু এত কিছু শুধুমাত্র উনিশ বছরের ভেতরেই। বয়সা বাড়েনি। কারন টিনটিনের বয়স বাড়েনা। টিন্টিনিয়ানদেরও বয়স বাড়েনা। আজও একটা মলাটের ওপর চোখ পড়লেই চারপাশ হয়ে যায়….ঠিক যেমটা হতে চাই তেমন…সাহসী, বুদ্ধিমান, চিরতরুন, যে ভালোবাসতে জানে।

বুড়ো খোকার জন্মদিন সপ্তাহে অনেক শুভেচ্ছা..