মার্চ ২০১৪, শহর কলকাতায় তখন ‘বসন্ত এসে গেছে’ (যেটুকু টের পাওয়া যায় আর কী)! ঠিক করলাম পাহাড়ে খুঁজতে যাব বসন্তকে..দেখব কেমন হয় তার রূপ-রং।

অতএব ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়া বসন্তের খোঁজে। গন্তব্য হিলি-ভার্সে-ওখেরে..সিকিমের পশ্চিম ঢালে সাজানো ছোটো ছোটো গ্রাম।

দার্জিলিং মেল ধরে এন. জি. পি স্টেশনে নামতেই মন ভালো করে দিল একরাশ ঝলমলে রোদ্দুর। জীপে চেপে রওনা দিলাম সিকিমের দিকে। একদিকে হিমালয়া তরাই, অন্য দিকে তিস্তা – আমাদের সঙ্গী রইল সর্বক্ষণ।

IMG_0463

সিকিমে গাড়ি ঢুকতেই পাহাড়ের রূপ বদল..কোথাও সে সবুজে মোড়া-আবার কোথাও সে রূক্ষ–ধূসর। ঢালে ঢালে সাজানো ছবির মতো সুন্দর গ্রাম!

IMG_0511

বেশ কিছু পথ চলার পর গাড়ী থামালো আমাদের নেপালী চালক..জানালা দিয়ে হাত দেখালো বাইরে – আর সেই প্রথম দেখতে পেলাম তাকে। একরাশ গাম্ভীর্য আর অনেকখানি দর্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। প্রথম দেখাতেই বাকরূদ্ধ হলাম। বরফে মোড়া এই শৃঙ্গের সৌন্দর্য বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রকৃতি এত সুন্দরও হয়?

IMG_0510

মুগ্ধতা কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম। সাত ঘন্টা্র যাত্রাপথের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল ওখেরে পৌছে আমাদের গেস্টহাউসের লেপচা মালিকের আতিথেয়তায়। পূর্ণিমার রাতে কনকনে ঠান্ডায় ওই মালিকের বসার ঘরে আগুন পোহাতে পোহাতে চলল গল্পকথা।

IMG_0512

পরের দিন নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু হল ভার্সে ভ্যালির দিকে। ভার্সের আরেক নাম ‘Valley of Rhododendron’। বসন্তের রঙিন দিনে এই ভ্যালিতে রঙের রায়ট লাগে। রডোডেনড্রনে ভরে ওঠে ভার্সে।

DSCN0308

ওখেরে থেকে ভার্সে যাওয়ার পথ ট্রেক করে যেতে হয় ভার্সে রডোডেনড্রন স্যাংচুয়ারির মধ্যে দিয়ে। সদলবলে শুরু হল আমাদের ট্রেকিং। জঙ্গলের ভিতর পায়ে পায়ে তৈরী পথ আর অন্যদিকে গভীর খাদ – সেই পথ কোনোদিন ভোলার নয়। চারপাশে এত নিস্তব্ধতা যে খসে পড়া পাতার শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। সেই নিশ্চুপ পথে হাঁটতে হাঁটতে ৪কিমি পথ কিভাবে যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেও পারলাম না। সেই প্রথম ট্রেক – ক্লান্তি তো ছিলই – কিন্তু তার সাথে ছিল একগুচ্ছ আ্নন্দ। প্রকৃতিকে বন্ধু করে ভার্সেতে পৌছানোর আ্নন্দ।

DSCN0332

রডোডেনড্রন তখনো সব ফোটেনি – ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। আমাদের কটেজের পিছনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকায় তার দেখা মিললোনা।

DSCN0339

সারাদিন আড্ডা হইচই করে কেটে গেল।বিকেলে আকাশ কালো করে নেমে এল বৃষ্টি – পাহড়িয়া বৃষ্টি। পাহাড়ের এই প্রান্তে কারেন্ট এখনো আসেনি। তাই মোমের আলোই ভরসা। জমে যাওয়া ঠান্ডা আর মোমবাতি রাত – মনে থেকে যাবে আজীবন।

IMG_0522

রাত যত বাড়তে থাকল নিস্তব্ধতা তত গাঢ় হলো। নিঝুম জঙ্গল, ঝুপঝুপ বৃষ্টি আর হিম হাওয়া সঙ্গ দিল সারারাত।

IMG_0516

পরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখলাম মেঘ উধাও। ফুরফুরে রোদের জন্মদিন। ছুট্টে বাইরে গেলাম – যদি একঝলক দেখা যায় কাঞ্চনকন্যাকে সেই আশায়। এবার সে আশা ভাঙতে দিলোনা।

DSCN0240

দেখলাম রোদের মুকুট মাথায় আর বরফের গয়নায় সেজে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের রানী। আরো একবার কথা হারালাম, আরো একবার প্রেমে পড়লাম পাহাড়ের।

DSCN0231

ধীরে ধীরে মেঘ এসে ঢেকে দিল সেই সুন্দরী রানীকে।এদিকে ততক্ষণে আমাদেরও ফিরে আসার সময় হয়ে এল।

DSCN0001

গুটিগুটি পায়ে আবার রওনা হলাম ওখেরের দিকে। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ফিরে যাওয়া। শুনতে পেলাম মেঘের আড়াল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন বলছে- “আবার আসিস – থাকব তোদের অপেক্ষায়”।

Latest posts by সুদেষ্ণা সোম (see all)