পিচে মোড়া রাস্তাটা সোজা উঠে গেছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে – একপাশে খাদ, অন্যপাশে জঙ্গল। অক্টোবরের মাঝামাঝি এই চমৎকার সকালের রোদ গায়ে মেখে আমরা চার বন্ধু যখন হাঁটা শুরু করি তখন ঘড়ি বলছে সাড়ে আট্টা, সঙ্গী ব্যাগে চকোলেট, কেক, জলের বোতল ও পায়ে রাশভারী ট্রেকিং জুতো। গন্তব্য বাক্সা ফোর্ট হয়ে পাহাড়চূড়ায় লেপচাখা। যাওয়া আসা মিলিয়ে প্রায় তের কিলোমিটার।

পরশু রাত্রে আমরা চার বন্ধু এসে পৌঁছেছি আলিপুরদুয়ার জেলার বাক্সা টাইগার রিজার্ভের অন্তর্গত জয়ন্তীতে। উদ্দেশ্য পুজোর কোলকাতার যাবতীয় ক্যাকোফোনি থেকে দূরে শান্তিতে কয়েকটা দিন কাটানো। প্রথম দিনটা কেটেছে জঙ্গল সাফারিতে (সে গল্প আরেকদিন হবে)। আজ দ্বিতীয় দিন, আমাদের বহু প্রতীক্ষিত ট্রেক। জয়ন্তী থেকে সান্তালবাড়ি গাড়িতে আসা, এখান থেকেই ট্রেকিং রুটের শুরু। গাইডের হিসেব মত পৌছতে বারটা বেজে যাবে, পরের দিকে রাস্তাও বেশ খাড়াই। অতঃপর “অলস দেহ, ক্লিষ্ট গতি” নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

OnTheWay


যাত্রাপথে

এই ট্রেকিং রুটের বৈশিষ্ট্য হল, অসাধারণ সব দৃশ্যপট। যারা ছবি তুলতে ভালবাসেন, তাদের ক্যামেরার লেন্সের জন্য দারুণ সব সম্ভার নিয়ে প্রকৃতি যেন বসে আছে। শুরুর দিকে রাস্তাটিও বেশ ভাল। বেশ খানিকটা অব্ধি গাড়িও যেতে পারে, তবে এত সুন্দর রাস্তায় হাঁটার মজাই আলাদা। মাঝে মধ্যে দুপাশে জঙ্গল। কান পাতলেই শুনতে পাবেন একটানা ঘণ্টা বাজার মত একটা শব্দ – ওটা আসলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কাল জঙ্গলেও শুনেছি।
রাস্তা ক্রমশ দুর্গম হতে আরম্ভ করল। গাড়ির শেষ গন্তব্য পেরিয়ে আমরা তখন পাথুরে রাস্তায়। মাঝেমধ্যেই ভাঙ্গাচোরা পাথুরে সিঁড়ি, সাবধানে দেখে শুনে পা ফেলতে হচ্ছে। আলগা পাথরে পা পরলেই বিপদ। তবে সুবিধা এই যে একটানা খাড়াই রাস্তা নয়, মাঝে মধ্যেই সমতল আছে। এমনকি মাঝে মধ্যেই জিরিয়ে নেবার জন্য চমৎকার বাধানো জায়গাও আছে।রাস্তায় আমাদের স্বাগত জানাল ছোট্ট এক ঝর্ণা, ও কয়েকটি পাহাড়ি গ্রাম। পৃথিবীর এই দুর্গম কোণেও যে মানুষ থাকতে পারে, ভাবলে বেশ অবাক লাগে। প্রায় দেড় ঘণ্টা হেঁটে আমরা পৌঁছলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য, বাক্সা ফোর্ট এ।

BuxaFort


বাক্সা ফোর্ট

বাক্সা ফোর্ট এর ভগ্নপ্রায় দশা দেখে খানিকটা হতাশই হতে হয়। ইতিহাস বলছে ভুটান রাজারা একসময় এই কেল্লাটি ব্যবহার করতেন তাঁদের সিল্ক রুট রক্ষা করার কাজে(সূত্র উইকিপিডিয়া)। ব্রিটিশ রাজত্বে এটি পরিণত হয় কারাগারে। আন্দামানের সেলুলার জেলের পরে বাক্সা ফোর্টই ছিল ব্রিটিশ আমলের সবচেয়ে দুর্গম জেলখানা, যেখানে সাংঘাতিক সব রাজদ্রোহীদের(পড়ুন স্বাধীনতা সংগ্রামী) বন্দী করে রাখা হত। শোনা যায় নেতাজীও কিছুদিন এখানে বন্দী ছিলেন। কেল্লার বাইরে বাধানো ফলকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা চোখে পড়বে।কেল্লার ভেতরে দর্শনীয় বিশেষ কিছু নেই, শুধু বন্দীদের গারদখানা ছাড়া। ভেতরে ঢুকলে বেশ একটা গা ছমছমে ভাব টের পাওয়া যায়(যদিও গরাদ-বিহীন)। কেল্লার পেছন দিকে ঘন জঙ্গল। সামনে খোলা মাঠ, তার পরেই সদরবাজার নামের একটা ছোট্ট গ্রাম। একটু দূরে পাহাড়ের ওপরে লেপচাখা গ্রামটাও(আমাদের পরবর্তী গন্তব্য) দেখতে পাওয়া যায়। কেল্লায় কিছুটা সময় কাটিয়ে, চকোলেট ও কেক এর সদ্ব্যবহার করে আমরা রওনা হলাম, লেপচাখার উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে সাড়ে চার কিলোমিটার হেঁটে, প্রচুর ঘাম ঝড়িয়ে আমরা বেশ খানিকটা ক্লান্ত। গাইডের চোখে সন্দেহ, আমরা আদৌ পারব কিনা। কিন্তু এত দূর এসে লেপচাখা না দেখে ফিরে যাবার কোন মানেই হয় না।

এই শেষ দেড় কিলোমিটার রাস্তা কিছুটা বেশী দুর্গম। রাস্তায় মাঝেমধ্যেই আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে স্থানীয় গ্রামবাসীরা। অনেকেরই পীঠে কাঠের বোঝা। খালি পায়ে, বা সামান্য চটি পড়ে এদের পাহাড় ডিঙ্গানো বেশ অবাক করে।

লেপচাখা পৌছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় একটা ছোট্ট গ্রাম, অধিকাংশ বাড়িই কাঠের মাচার ওপর তৈরি। গ্রামে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে একটা সাদা প্যাগোডার চুড়ো। গাইড আমাদের নিয়ে এল গ্রামের শেষ প্রান্তে ভিউ পয়েন্টে। ভিউ পয়েন্টের ‘ভিউ’ এক কথায় অপূর্ব। একটা মাঝারি মাপের খোলা মাঠ, যার একপাশে খাদ। খাদের প্রান্তে এসে দাঁড়ালে, প্রায় গোটা বাক্সা জঙ্গলটাই দেখতে পাওয়া যায়। যার মধ্যে বালা, জয়ন্তী সমেত আরও কয়েকটি নদী ও চোখে পড়ে। উল্টো দিকে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ পাঁচটি পাহাড়ের চুড়ো – যার মধ্যে মহাকাল আর চুনাভাটি আমাদের চিনিয়ে দিল আমাদের গাইড।

Lepchakha1


লেপচাখা

জুতো টুতো খুলে আমরা ততক্ষণে ঘাসের ওপর বসে পড়েছি। পায়ের তলা রীতিমত লাল, গায়ের জামা ঘামে ভিজে একসা, পেটে রাক্ষুসে খিদে। শরীরময় ক্লান্তি। কিন্তু লেপচাখা এতটাই সুন্দর যে সব পরিশ্রম সার্থক মনে হল। একটা হালকা শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে, বেশ খানিকটা আরাম লাগল। চারিদিকে অদ্ভুত শান্তি। জায়গাটা দুর্গম বলেই বোধহয় ভিড়-ভাট্টা নেই। চোখে পড়ল পাহাড়ের চুড়ো ঘেঁষে এক খন্ড মেঘ ভেসে আসছে। ‘সাব্লাইম’ – লালমোহন বাবু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মন্তব্য করেছিলেন, হঠ্ করে মনে পড়ে গেল।

Lepchakha2


লেপচাখা

কাঠের মাচার ওপর বাড়িগুলোর কয়েকটা আবার হোটেল(হোম স্টে)। গাইড এসে ঘুরে টুরে এসে খবর দিল, এক জায়গায় নুডলস পাওয়া যেতে পারে, প্রস্তাব সানন্দে গৃহীত হল। দূরে সান্তালবাড়ি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যেখান থেকে হাঁটা শুরু হয়েছিল। এতটা রাস্তা আমরা হেঁটে মেরে দিলাম!ভাবতে বেশ অবাক লাগছে।
গাইড এসে তাড়া লাগাল, খাবার তৈরি। এমন সুন্দর একটা জায়গা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু পেটের দায়। তাছাড়া নামাটাও বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অতঃপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠতেই হল। জুতো মোজা পড়তে পড়তে নিচের দিকে চোখ চলে গেল। জয়ন্তী নদীর ‘রিভার বেড’টা অসাধারণ দেখাচ্ছে। ফিরেই একবার জলে নেমে পড়তে হবে।

Latest posts by অভিদীপ চৌধুরী (see all)