প্রথমেই বলে রাখি পেশোয়া প্রথম বাজিরাও এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মাস্তানির গল্প নিয়ে বলিউডে সিনেমা এটাই প্রথম নয়, ১৯৫৫ সালে প্রথম – ধীরুভাই দেশাই পরিচালিত ‘মাস্তানি’ নামক একটা বিস্মৃতপ্রায় সিনেমা, তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি তখন। এবারেও তেমন সাড়া ফেলতে পারত কিনা সন্দেহ আছে কারণ তদানীন্তন মারাঠা অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ইতিহাস নিয়ে আজকের বেশিরভাগ ভারতবাসীই উদাসীন, মাধ্যমিক স্তরের ইতিহাস পাঠ্যক্রম শেষ হওয়ার সাথে সাথে যার প্রয়োজন ফুরোয় কিন্তু ধন্যবাদ সঞ্জয় লীলা বনশালীকে, অল্পশ্রুত কাহিনীকে বিরল দৃশ্যরূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জটা সুন্দর করে পরিবেশন করার জন্যে। ইতিহাস নিয়ে আমার বরাবরই আগ্রহ, কোথাও ঘুরতে গেলে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমার প্রথম পছন্দ। তাই সিনেমার অপ্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য নিয়ে অনেক ফিল্ম সমালোচনায় পড়লেও আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছিল ‘ইস্, আরেকটু সময় চললে পারত।’

bajirao

পক্ষপাত দোষে দুষ্ট তাই আমার ফিল্ম সমালোচনাও, সেটা গোড়াতেই বলে রাখা ভালো। যেমন সিনেমার শুরুতে বনশালীর ঘোষণা – cinematic effect বা appeal আনার জন্য কিছু কিছু ঘটনা পরিবর্তিত করা হয়েছে। ভালো কথা, একটু আধটু বিকৃতি  মানাই যায় কিন্তু ঘটনা বা স্থান কাল পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিলে কাঁহাতক্ সহ্য করা যায় ? বেশ কিছু ঐতিহাসিক অসঙ্গতি চোখে পড়ল। যেমন,

১) প্রথম বাজিরাওয়ের প্রথমা স্ত্রী কাশিবাঈ। কাশিবাঈ জন্ম থেকেই বাতের সমগোত্রীয় একটা জটিল অসুখে আক্রান্ত হন, যেজন্য আজীবন প্রায় শয্যাসীন অবস্থায় কাটাতে হয় তাঁকে। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল কাশিবাঈয়ের বিয়েটাও নিছক রাজনৈতিক অভিসন্ধিপ্রসূ্‌ যেটা তখনকার সময় খুব সাধারণ ঘটনা (বালিকা অবস্থাতেই তাঁর বিয়ে হয় বালক বাজিরাওয়ের সাথে)। কাজেই এহেন শয্যাসীন রুগ্ন মহিলার পক্ষে ধেই ধেই করে ‘পিঙ্গা’ নৃত্য/ জোরে হাঁটা অসম্ভব।

২) মাস্তানি (যিনি বাজিরাওয়ের থেকে বয়সে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন) বাজিরাওয়ের অন্তিমকালে তাঁর সাথে দেখা করতে খারগঁ গেছিলেন। এটা সত্যি যে বাজিরাওয়ের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁকে বন্দী করেছিলেন নানাসাহেব কিন্তু দূতমারফৎ বাজিরাওয়ের জটিল অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে রাধাবাঈ, কাশিবাঈয়ের পর নানাসাহেব, মাস্তানিও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন। সিনেমাতে দেখানো হয়েছে উল্টো। এখানেই শেষ না। অত্যন্ত হাস্যকর লাগল যেভাবে ক্লাইম্যাক্স দেখানো হল। টেনে টেনে একটা দৃশ্যকে কতটা লম্বা করা যায় তার সার্থক নমুনা। কোথায় শেষ দৃশ্যে চোখে জল আসবে, না – সে বালাই নেই। আমার পাশে বসা মেয়েটি ততক্ষণে WhatsApp চেক করতে শুরু করে দিয়েছে দেখলাম। প্রসঙ্গত জানাই, মাস্তানি বাজিরাওয়ের মৃত্যুর পর কিছুুদিন বেঁচে ছিলেন, এমন না যে সাথেসাথেই মরেছেন। তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা মত আছে। সর্বাধিক প্রচলিত মতে, তাঁকে হত্যা করা হয়। যেটা সবচেয়ে কম শোনা যায় কিন্তু গবেষণালব্ধ মত – নানাসাহেব (যিনি পরবর্তীকালে বালাজী বাজিরাও নামে সমধিক প্রসিদ্ধ) তাঁকে যৌন হেনস্থা করেন বাজিরাওয়ের মৃত্যুর পর, পরিণামে স্বামীর মৃত্যুজনিত দুঃখ আর অপমানের যুগপৎ কারণে মাস্তানির নিজের আংটিতে লুকিয়ে রাখা বিষপান করে আত্মহত্যা।

উপরোক্ত অসঙ্গতিগুলো অগ্রাহ্য করলে বাজিরাও মাস্তানি নিঃসন্দেহে দারুণ আকর্ষণীয় সিনেমা। দুর্ধর্ষ সেট (শুনেছি সবমিলিয়ে ২১টা সেট বানানো হয়েছিল), ঝলমলে পোশাক আশাক, দৃষ্টিনন্দন পেশোয়া নৃত্যশৈলী, পন্ডিত বিরজু মহারাজ নির্দেশিত একটি দুর্দান্ত কত্থক নৃত্য, কিছু শ্রুতিমধুর গান, রণবীর-প্রিয়াঙ্কা-তনভি আজমির নিঁখুত অভিনয় (তনভি প্রকৃত অর্থেই মাথা ন্যাড়া করেছিলেন রোলটার জন্য) এবং ভারতীয় যুদ্ধবিদ্যার অভিনব কলারিপয়াট্টু রণকৌশল এই ছবির অনন্য সম্পদ। দীপিকাকে সামান্য নিষ্প্রভ লাগল তবে সেটা চিত্রনাট্যগত ত্রুটি। যাবতীয় নজর বা ভাবাবেগ শুধু কাশিবাঈ চরিত্রটির দিকেই ধাবিত হচ্ছিল, প্রিয়াঙ্কাকে সেজন্য সাধুবাদ দেওয়া প্রয়োজন। অনন্য শিল্পগুণ সমৃদ্ধ এই সিনেমা যেন কোন রূপকথা বা চিত্রকরের তুলিতে আঁকা এক মায়াবী কল্পনা যা একবার কেন, আমার মনে হয় দুবার দেখার মতো  তবে অবশ্যই বড় পর্দায়। নতুবা visual effect তেমন ধরা পড়বেনা। তবে হৃদয়স্পর্শী লাগল না সবমিলিয়ে, বেশী ঝাঁ চকচকে হলে যা হারিয়ে যায়। প্রায় পনেরো বছর ধরে একটু একটু করে তৈরী হওয়া এই সৃষ্টি হয়তো তেমন সুন্দর লাগত না যদি সলমন খান মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতেন, শোনা যায় বনশালী বার দুয়েক সলমনকে মনোনীত করেছিলেন বাজিরাও চরিত্রের জন্য। রণবীর সিং যেরকম একাত্ম হয়ে মিশে গেছিলেন বাজিরাওয়ের  চরিত্রের সাথে সলমন তা পারতেন কিনা সন্দেহ আছে।

পুনশ্চ: আমাদের বাংলার মাটিতেও রোমান্টিসিজম বা বীরগাথা কম নেই কিন্তু। ভালো লাগে যখন যোধা আকবর, তাজমহল(২০০৫), মুঘল-ই-আজম্, বাজিরাও মাস্তানি প্রভৃতি সিনেমা দেখি। আরও ভালো লাগবে যদি কোনদিন এরকম বড় স্কেলে সিরাজ-উদ্-দৌল্লা + লুৎফন্নিসা কাহিনীও দেখতে পাই (ছোট স্কেলে বহুদিন আগে একবার হয়েছে – বিশ্বজিৎ, সন্ধ্যা রায় অভিনীত ‘আমি সিরাজের বেগম’)।

আমার রেটিং: ৪/৫

Latest posts by দীপশ্রী বর্ধন (see all)