২৭শে অগাস্ট, বৃহস্পতিবার

যতদিন না রিপোর্টটা পাওয়া যাচ্ছে, চলো দুজনে কাছেপিঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। নিজেদের একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন আমাদের। যাবে?

ভাবতে একটু সময় নিয়েছিলো মৌলি। পরেরদিন শুক্রবার। সকালে উঠে বিজিতের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে বলেছিলো, “যাবো , কিন্তু দুজন না, তিনজনে। বিতানও যাবে।”
বিজিত একটু হকচকিয়ে গেলেও বুঝতে দেয়নি। শুধু বলেছিলো,”তোমার ছেলে, তুমি যা ভালো বুঝবে করবে। আমার কিছু বলার নেই। যদিও আমার মনে হয়েছিলো ও না থাকলে আমরা অনেক খোলা মনে আলোচনাগুলো সারতে পারব। ওতো এমনিতেও মার কাছে ভালই থাকে। তিনদিনে অসুবিধা হওয়ার কথা না।”
“হ্যাঁ, ছেলে আমার, সেই জন্যেই ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই। ওরও এই পরিবেশ থেকে কদিনের জন্যে একটু দুরে যাওয়াটা কাজে দেবে। ও যাবে আমাদের সঙ্গে।”
“বেশ, তাই চলুক। কিন্তু মনে রেখো, সোমবারে রিপোর্ট আসবে। ফল যদি যা সন্দেহ করছি তা হয়, তাহলে ওকে জলপাইগুড়ি রেখে আসা হবে আশ্রমে।”
“ঠিক আছে বলে দিয়েছি তো একবার”।
দালানের দিকে পা বাড়ায় মৌলি।
“এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছ আবার?”
কেন বাথরুমে যাওয়াও বারণ নাকি আমার?”।
সতেরোপল্লির বটতলা থেকে ডানদিকে ঘুরে তিনটে বাড়ি পরেই ওদের বাড়ি। তিনতলা, মোটামুটি বড় ছড়ানো বাড়ি। বিজিত ও তার বাবার মিলিত পুঁজির লগ্নী। পারিবারিক ব্যবসায় যায়নি বিজিত। বাবার কঠিন অমত অগ্রাহ্য করে শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বহুজাগতিক প্রতিষ্ঠানে সু-উপায়ী এখন। চারবার বিদেশ ঘোরা হয়ে গেছে তার। মৌলি নিজেও বিতান হবার আগে একটা সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত ছিল।
পুরনো ধাঁচে তৈরী বাড়ির দোতলার বারান্দার শেষ প্রান্তে বাথরুম। ঢুকে জোরে কল খুলে দেয়।

porichoy_v1

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

বিয়ের আগে মা বলে দিয়েছিলো,”মৌলি, সংসারে নিজের একান্ত জায়গা বলতে কিছু থাকেনা। সবটুকুতেই অনেকের ভাগের অধিকার। নিজের চোখের জল কাউকে দেখাতে নেই রে। যখন খুব কান্না পাবে, বাথরুমে ঢুকে দরজা দিবি। ঐটুকুই তোর নিজস্ব আড়াল, মনে রাখিস।” গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত উদ্বেগ, উত্তেজনা গলে বেরিয়ে যেতে থাকে মৌলির লাল টকটকে দুই চোখের ভেতর থেকে, গরম-নোনতা ধারায়। আর, বড় লাল প্লাস্টিকের বালতি উপচে জল ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সাদা ঠান্ডা মেঝের ওপরের পরে থাকা ঝরা চুল, একটা লাল টিপ ও বিতানের খেলনা হাঁস।
ঘুম আসছে না কিছুতেই। বিতান মাকে জড়িয়ে তার গায়ে একটা পা তুলে দিয়েছে। ফুলো-ফুলো গালে তখনও একটু লাল দাগ। তুচ্ছ কারণে মেজাজ হারিয়ে বিজিত ঐটুকু ছেলেকে চড় মেরে বসেছে খাবার টেবিলে। অপরাধবোধে তলিয়ে যেতে থাকে মৌলি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে দুচোখের পাতা কখন লেগে এসেছে বুঝতে পারেনি।

ফ্ল্যাশব্যাক –
চোখ বুজতেই সেই দৃশ্য। আবার ফিরে আসে, বারবার। এর থেকে মুক্তি নেই মৌলির।
উত্তরাখন্ডের ভয়ংকর বন্যা কভার করতে গেছে মৌলি। সঙ্গে বহুদিনের সহকর্মী ও একদা সহপাঠি ক্যামেরাম্যান রাতুল। ফেরার সব রাস্তা বন্ধ। রুকস্যাক বেঁধে রাত জেগে টেমির আলোয় বসে আছে মৌলি আর রাতুল। রুদ্রপ্রয়াগের এক অখ্যাত হোটেলের চারতলায়। যেকোনো মুহুর্তে ঘরছাড়া হতে হবে। রাস্তা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই নীচে। সব ভাসিয়ে দুর্দম বেগে বয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনী। ফোন নেই, নেট নেই। মুষলধারায় বৃষ্টি ধুয়ে দিছে চরাচর। সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপে আটকা পড়েছে ওরা। অসহ্য উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় কথা বন্ধ হয়ে গেছে বহুক্ষণ। শক্ত করে রাতুলের হাত ধরে বসেছিলো মৌলি। ঐভাবে প্রায় সারারাত বসে থাকার পর ভোরের দিকে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়েছিলো সে রাতুলের গা ঘেঁষে। কে, কোন মুহুর্তে প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েছিলো এখন গুলিয়ে যায় ওর। কিন্তু খানিক পরে ভোরের আলো যখন ফুটে উঠছে, দুজনেরই উদ্বেগ ও উত্তেজনা খানিক হলেও চাপা পড়ে গেছে অন্য একটা হঠাৎ ঘুর্নিঝড়ের প্রলয় নাচনের তালে।। অনেকটা বেশি চিনে ফেলেছে দুজনে একে অন্যকে সেই মৃত্যু-গন্ধ মাখা পরিবেশে। ভয়টাও একটু কম করছে কি? নাকি একটু বেশি? যদি কিছু হয়ে যায়, কিভাবে সামাল দেবে সদ্যবিবাহিতা মৌলি? বিজিত যে কাজের সুত্রে গত মাস থেকে আমেরিকাতে।
এর দুদিন পর হোটেলের ছাদ থেকে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারে চেপে ওরা পৌঁছয় দেহরাদূন এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে কলকাতা। ক্লান্ত, বিপর্যস্ত মৌলিকে আরো বিহ্বল করে রাতুল বলে,”রাতটা ভুলে যাস মৌ। সেটা তোর পক্ষেও ভালো হবে, আর আমার পক্ষেও।”
কলকাতার বাড়ীতে ফিরে তিন দিন তিন রাত মৌলি শুধু ঘুমিয়েছিল স্নায়ু-প্রশমনকারী অসুধ খেয়ে। পারিবারিক ডাক্তার গুহ বলে দিয়েছিলেন, যা মানসিক আঘাত গেছে, তাতে কদিন ওর সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। খবর পেয়ে চারদিনের দিন ফিরে এসেছিল বিজিত। আমেরিকার কাজ অসম্পূর্ণ ফেলে রেখে। তদ্দিনে মৌলি একটু থিতু।
বাড়িতে তখনও শুভাকাঙ্খী আত্মীয়স্বজনের ভীড়। সব ফাঁকা হতে হতে রাত এগারোটা। নিজেদের শোবার ঘরের চারদেওয়ালের আড়াল হতেই তাকে অভ্যস্ত নিপুণতায় কাছে টেনেছিলো বিজিত। শেষে পরিতৃপ্ত ঘুমে তলিয়ে গেছিল সে একাই। লক্ষ্যই করতে পারেনি যে মৌলি পাঁচ ডানার সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে ঠায় জাগা। চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে মুক্তোদানা। ভিজে উঠছে বিয়েতে উপহার পাওয়া ঘিয়ের ওপর কমলা ভেলভেটের ফুলতোলা বালিশের ঢাকা। আরেকটা না-ফুরোনো রাতের সঙ্গী হয়ে জাগছিলো মৌলি।
পরদিন রাতুলের বিয়ের কার্ড পৌঁছে গেছিলো অফিসের সকলের ডেস্কে। ডিসেম্বরে বিয়ে।
এর পরের মাসেই অন্ত:সত্তা হবার কারণে চাকরি ছেড়ে দিল মৌলি। জার্নালিসমের মতন ধকলের চাকরি ওই অবস্থায় করতে দিতে চাননি শশুরবাড়ির কেউ। রোজ রাতুলের মুখোমুখি আর হতে হবে না ভেবে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল মৌলি।
বিতান হলো পরের বছর জুন মাসে। সাড়ে আট মাসের খুব কষ্টের গর্ভকালের পর। গলায় নাড়ি জড়িয়ে গেছিল বিতানের। তড়িঘড়ি সার্জারি করে বার না করলে বাঁচানো যেতো না।
মৌলি এখন মাঝে মাঝে ভাবে, সেই হয়ত ভালো হতো। এত ভোগান্তি লেখা থাকত না তাহলে ওদের দুজনের কপালে।

২৮শে অগাস্ট, শুক্রবার
আজ বিকেলেই রওনা হবে ওরা। মন্দারমণি। সমুদ্র সৈকতের একদম কাছেই একটা নতুন হওয়া তিনতারা রিসর্টে ঘর বুক করা হয়েছে। বিজিতের বন্ধুর রিসর্ট তাই এত কম সময়ের মধ্যেও জায়গা পেতে অসুবিধা হয়নি বিশেষ।
বিতান স্নান করবে বলে ঘুরঘুর করছে। গত কয়েক বছর ওকে ওর ঠাকুমা স্নান করিয়ে খাইয়ে দিতেন। কিছুদিন হলো বন্ধ করেছেন। সেই যেদিন দুপুরবেলায় হঠাৎ রাতুল এসে হাজির ! তাকে দরজা খুলে দিয়েছিলেন শাশুড়িমা নিজেই।
“বৌমার সহকর্মী? কিন্তু ও তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছে অনেক বছর হলো।” রাতুলের আদ্যপান্ত জরিপ করতে করতে কাবেরী বলেছিলেন,”কই তোমাকে আগে তো দেখিনি এ বাড়িতে”
দোতলায় নিজেদের ঘরে পুরনো রিডার্স ডাইজেস্ট পড়ছিলো মৌলি। পাশে বিতান দিবানিদ্রায় কাদা। নিচের তলার কথাবার্তা কানে যেতে উঠে দালানে বেরিয়ে উঁকি দিয়েই স্থানু হয়ে গেল। রাতুল !! এতদিন বাদে। সেইরকমই আছে। উস্কো-খুস্কো চুল, খোঁচা দাড়ি, রংচটা নীল রীবকের টিশার্ট আর বাদামী জিন্স। সেই ধুসর অ্যাঙ্কল বুট, বাইরে রিপোর্টিঙে গেলে যেটা পরে যেত। দোতলার ঘরের পর্দার নীচে লাগানো ঝুমঝুমির আওয়াজে কাবেরী উপরে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে রাতুলও। চোখাচোখি হতেই স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে ডান গালে টোল ফেলে রাতুল বললো,”কেমন আছিস? এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোর সাথে দেখা করে যাই”। যেন রোজই আসে এবাড়ীতে। কতকালের আনাগোনা।
কাবেরীকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে মৌলি তাড়াতাড়ি নীচে নেমে আসে,”তুই !! এতদিন কোথায় ছিলি? আমার অবশ্য কারুর সাথেই তেমন যোগাযোগ নেই। বাড়িতে খুব ব্যস্ত থাকি।”
কাবেরীর দিকে চেয়ে রাতুল বলে,”মাসীমা, আমি একটু জল খাবো। অনেকক্ষণ বেরিয়েছি”
“হ্যাঁ, বোসো তুমি, বন্ধুর সাথে গল্প-টল্প করো। অনেকক্ষণ বেরিয়েছো, খিদেও পেয়েছে নিশ্চই। আমি আসছি।”
নীচেরতলার রান্নাঘরটা একটু দুরে, দালান পেরিয়ে।
কাবেরী চোখের আড়াল হতেই বিরক্তিতে ফেটে পড়ল মৌলি,”এতদিন বাদে কেন এলি এখানে তুই? কি দরকার তোর?”
“মৌ, তোর কোনো অসুবিধা করব না আমি, কথা দিচ্ছি। আমি সত্যিই এখানে আর থাকিনা। রাজস্থানে ছিলাম এতদিন। ওখানে থেকে তোর-তোদের সব খবরই পেয়েছি। ছেলে হয়েছে তোর। গাড়ি কিনেছিস আরেকটা। হয়তো আমেরিকা যাবি, সব।”
এবার মৌলি ধৈর্য হারায়,”কি চাস তুই খুলে বলতো।”
“মৌলি, তোর ছেলে, কি নাম রেখেছিস? জুন মাসে হয়েছে তাই না? তার মানে তো….হয়তো। হয়তো কেন, নিশ্চই তাই, বিজিত তো তখন আমেরিকাতে। আমি নিজেকে কিছুতেই আটকাতে পারলাম না রে। ওকে একবার দেখতে দিবি?”
“না আ আ” টা একটু জোরেই বলে ফেলেছিল মৌলি। ঠিক তখনই কাবেরী ঢুকছিলেন জলখাবারের ট্রে হাতে নিয়ে।
কতটা কি শুনেছেন বোঝা গেল না। কিন্তু এরপর খুব গম্ভীর হয়ে থাকলেন, রাতুলের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বললেন না। রাতুল চলে যাবার পর মৌলির সাথেও না। এদিকে রাতুল আবার যাওয়ার সময়ে জোর করে একটা দামী ক্যামেরা মৌলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। “ছেলের জন্যে এনেছি। বড় হলে দিস। আমার কথা বলিস।”
রাতে বিজিত ফেরার পর কাবেরী তার সাথে আলাদা ঘরে অনেকক্ষণ কথা বললেন।
মৌলি রাতে বিতানকে খাইয়ে নিজে উপোশ করে ঘরে বসে রইলো সারা সন্ধে। কেউ সাধলোও না। বিজিত ঘরে ঢুকেই প্রথমে বললো,”রাতুলের কথা আগে শুনিনি কেন। আমি তো জানতাম তুমি একাই গেছ উত্তরাখন্ড। কাজের অজুহাতে এসব চলছে টের পেতে দাওনি তো। ভালো।”
“তুমি যা ভাবছো তা নয়।” মৌলি একটু ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলো।
“চুপ করো। আমি কি ভাবব সেটা আমাকেই ভাবতে দাও। সান্যাল বাড়ীতে আজ পর্যন্ত কোনো অনাচারের ফসল জল-হওয়া পায়নি। এও পাবে ভেব না। আমি ওই ছেলের ডি এন এ টেস্ট করাবো। তারপর ঠিক হবে ও এবাড়ীতে মানুষ হবে না আস্তাকুঁড়ে। কোনও অনাথাশ্রমে দিয়ে আসবে ওকে।”
বজ্রাহত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মৌলি। প্রতিবাদ করার জন্যে যেটুকু আত্মপ্রত্যয় দরকার হয় সেটা যেন কোথায় উবে গেছে মনে হলো তার। যদি সত্যিই তাই হয়। তবে?

বিজিত বেমালুম ভুলে গেল যে পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে তারা নিজেরাও দিনরাত বিতানের চেহারা নিয়ে আদিখ্যেতা করে থাকে দুবেলা।
“ছেলের নাকটা আমার মতন”
“নাতি একদম ছোটবেলার বিজিতের মতন দেখতে হয়েছে”
“গালে টোলটা পেয়েছে মনে হয় মামাবাড়ির থেকে”
সব ভুলে গেলো।
দ্রুত হাতে সুটকেসে জামা কাপড় ভরে নিতে থাকে মৌলি। রিপোর্টের রিসিপ্টটা হাত ব্যাগে রাখে। বিজিত আর বিতানের হাতের বুড়ো আঙ্গুলে ছুঁচ ফুটিয়ে রক্তর নমুনা নিয়ে গেছে পরীক্ষাগার থেকে। তিনদিন লাগবে। সোমবার জানা যাবে বিজিতের রক্তের কৌলিক নিয়ম নির্ধারক কণাসমূহের মানচিত্র বিতানের সঙ্গে মেলে কিনা।
বিতানকে স্নান করিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়ালো এরপর। ঘুমন্ত বিতানের নরম কপালের ওপর থেকে রেশম-রেশম একটু তামাটে চুল সরিয়ে দিচ্ছিলো সে। “এলি যদি, আমার কোলে এলি কেন তুই। আমি যে তোর উপযুক্ত নই।”

২৯শে অগাস্ট, শনিবার
মন্দারমণি এসে গেছে ওরা। এখানেও আবহাওয়া ভালো নেই। প্রায়ই বৃষ্টি হচ্ছে।
মৌলির সাথে একটু-আধটু কথা হয়েছে বিজিতের। কিন্তু বিতান যেন অন্য কেউ। তার সাথে নিজের থেকে একবারও কথা বলেনি বিজিত। বিতান খুব বায়না করলে হুঁ, হ্যাঁ দিয়ে কাজ সেরেছে। বরফ গলেনি। মৌলি শুধু তাকিয়ে দেখেছে আর অপরাধের বিরাট বোঝাটা আরো আঁট হয়ে চেপে বসেছে তার বুকের মাঝে।

৩০শে অগাস্ট রবিবার
কাল সকালে ফিরে যাবার কথা ওদের।
যাবার আগে একবার অন্তত সমুদ্রে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালো মৌলি। বিতান তো লাফাচ্ছে। বিজিত কিছুতেই যেতে রাজি হলো না।
ছেলেকে নিয়ে একাই রওনা হলো মৌলি। বিকেল হয়ে আসছে। বালিতে নেমেই হুটোপাটি করতে শুরু করেছে বিতান। লাফাচ্ছে, মুঠো করে বালি তুলে ছুঁড়ছে, মাকে ডাকছে, হাসছে, নাচছে। ঈশান কোনে একটু মেঘ ছিলো। কখন যেন আকাশটা ঢেকে ফেলেছে। অস্ত যাবার আগেই অন্ধকার করে এলো। বৃষ্টি নামলো ঝুপঝুপ করে।
বিতান মজা পেয়ে খিলখিল করে হাসছে। ভিজছে পাখির ছানার মতন। মৌলি পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়, হাত ধরে ফেলে ওর।
“চল জল খেলবি সোনা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ মামনি, চলো চলো”
ছোট্ট রবারের মতন তুলতুলে হাতের মুঠিটা নিজের হাতে নেয় মৌলি। এগোতে থাকে জলের দিকে। ঢেউ বাড়ছে খুব। বৃষ্টিও জোরদার হচ্ছে প্রতি মুহুর্তে। পায়ের পাতা ডোবা জলে যেতেই বিতান আনন্দে দিশেহারা। ঢেউগুলো লকলকিয়ে একের পর এক এসে ছোবল মারতে থাকে ওদের পায়ে। হাতছানি দেয়, আরো আরো।
আরো খানিকটা এগোয় মৌলি, বিতানের মুঠি দৃঢ় মুষ্টিতে ধরা।
হাঁটুজলে যেতেই জল পৌঁছে যায় বিতানের বুক অব্দি। এবার একটু ভয় পায় সে। মুখ তুলে তাকায় মায়ের দিকে। কই, মা তো ভয় পায়নি একটুও। আদিগন্ত বিস্তৃত জলের দিকে তাকায় বিতান। এবার ও বুঝতে পারে মায়ের মুঠিটা আলগা হচ্ছে। “মামনি” বলতে গিয়ে মুখে অনেক খানি জল ঢুকে যায় ওর। মৌলি আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। ফুঁসতে থাকা বঙ্গোপসাগর মুহুর্তে টেনে নেই ছোট্ট বিতানকে। কালো হাতির পালের মতন মেঘের তলা দিয়ে ততক্ষণে উঁকি দেয় সূর্য। মাত্র কয়েক মুহূর্ত, তারপরেই ডুবে যায়। বৃষ্টির জল ধুয়ে দিতে থাকে মৌলির গালের অঝোর নোনা জলকে।
“ভালো থাকিস সোনা। আমাকে ক্ষমা করিস”
ফিরে রওনা দেয় সে হোটেলে।

৩১শে অগাস্ট, সোমবার
গতরাতে মৌলি-বিজিত কেউ ঘুমোতে পারেনি। সারা রাত সার্চ পার্টি খুঁজেছে বিতানকে। কিছু পাওয়া যায়নি। ঝড়-বৃষ্টি থেমে যাবার পরও না।
হা-ক্লান্ত দুজনে হোটেলের বিলাসবহুল কামরায় বসে তাকিয়ে শুন্যের দিকে।
হঠাৎ ভীষণ চমকে দিয়ে বেজে উঠলো বিজিতের সেল ফোন।
“হ্যালো বিজিত, আমি মা বলছি রে। রিপোর্ট এসে গেছে। ভগবানের অশেষ দয়া, তিনি মুখ রেখেছেন। বিতান আমাদেরই রক্ত রে। তোর ই ছেলে। টেস্টে কনফার্ম করেছে। তোরা আজকেই ফিরবি তো? কখন রওনা হচ্ছিস? হ্যালো, হ্যালো….”
ফোনটা বিজিতের অবশ হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে যায়।
মৌলির লাল হয়ে ফুলে যাওয়া চোখ আবার ঝরাতে থাকে নোনা জলের বৃষ্টিধারা।

ধরণী দ্বিধা হতে পারেন না এযুগে, তাই বৃদ্ধ আকাশ তার বারি সঞ্চয় নিয়ে ঘরে-ঘরে সীতাদের আগলে নিতে আবারও নামে।

Latest posts by মৌমিতা বিশ্বাস (see all)