কুড়ি মিনিটের মধ্যে এই নিয়ে চার বার ঘড়ি দেখল বর্ষা । রাণাকে দুবার ফোনও করেছে –

সুইচড অফ। প্রতাপাদিত্য রোডে রাজীবদের এই বাড়িটার দোতলার বারান্দা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এখন। মেঘ করেছে বেশ – গুমোট হয়ে আসছে, গত দুদিন বৃষ্টি হয়নি এই মাঝ আষাঢ়েও । আজ ভাসাবে । তাহলে কি আসবে না ? মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেল তার । কথাটা যে আজই বলতে হবে রাণাকে।

বেডরুমে গিয়ে এ.সি টা চালিয়ে দিল বর্ষা, গুলজারের কালেকশন থেকে একটা সিডি বেছে নিয়ে চালাল লো ভলিউমে।

pourush

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

তার বিয়ের আগে থেকেই রাণা অ্যাসিস্ট করে রাজীবকে – আলাপ ছিলই । ভালো করে চিনল ডুয়ার্সের আউটডোরে। মাস তিনেক আগে। রাজীবই নিয়ে গেছিল জোর করে। টানা সাত দিনের শুটিং জয়ন্তিতে – বিকেল বিকেল প্যাক আপ হয়ে যেত। আলিপুরদুয়ারের সার্কিট হাউসে থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সেবার। পুরো ইউনিটকে মাতিয়ে রাখত রাণা। গিটার নিয়ে একের পর এক পিট সিগার – জন লেনন – আর.ডি – সলিল চৌধুরী গেয়ে শোনাত সার্কিট হাউসে ফেরার পর। মিষ্টি গলা । সারাদিন এর ওর পেছনে লাগছে, মজা করছে । আবার কাজের সময় সংলাপ পড়াচ্ছে – কণ্টিনিউইটির দিকে কড়া নজর রাখছে, ক্যামেরার অ্যাঙ্গল নিয়ে তদারকি করছে। ছিপছিপে – শ্যামলা – অসম্ভব ছটফটে আর বুদ্ধিদীপ্ত। ভালো না লেগে উপায় ছিল না ছেলেটাকে। একদিন রাজীব তাকে রানার সাথে ইউনিটের গাড়ি দিয়ে কোচবিহার ঘুরে আসতে পাঠাল। হাসিতে – কথায় কেটে গেল দিনটা । বর্ষার ভালো লাগছিল, স্বাবাবিকভাবে কথা বলছিল সে, হাসছিল আবার। একটু একটু করে ফিরে পাচ্ছিল নিজেকে।

রাজীবের সাথে আলাপ হয় যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির চাকরিটার দৌলতে, সেটা সে ছেড়ে দিয়েছিল বিয়ের পরে। কিছুদিনের কোর্টশিপের পর তাদের বিয়েটা ততদিনে প্রায় দেড় বছরের পুরনো। মাস খানেক আগেই ডক্টর মিত্র জানিয়ে দিয়েছেন সমস্যাটা তার নয়, রাজীবের। তার পক্ষে বাবা হওয়া সম্ভব নয়।

বিষণ্ণতায় ডুবে গেছিল বর্ষা – একটা শূন্যতাবোধ গ্রাস করে নিচ্ছিল তাকে ধীরে ধীরে । রাজীব মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথা বলেছিল। বলেছিল, “আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারো, আটকাব না। টাকার জন্য ভেবো না। নিজের মত করে বেঁচো। শুধু কারণটা বোলো না কাউকে। অনেক কষ্টে নিজের জায়গা তৈরি করেছি।  আমার পৌরুষ প্রশ্ন উঠবে, গসিপ হবে, মিডিয়া কভার স্টোরি করবে, আমার কেরিয়ারের – নামের খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমার জীবনটা তো জানো বর্ষা…”

জানে, বর্ষা জানে, রাজীবের বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায় তার চোদ্দ বছর বয়সে । রাজীবের কাস্টডি পায় তার বাবা । মা যার প্রেমে পড়েছিল – তাকে বিয়ে করে চলে যায় ক্যালিফর্নিয়া – কোনো যোগাযোগ রাখেনি। তাদের বিয়ের বছর দুয়েক আগে রাজীবের বাবাও মারা যায়। ততদিনে অবশ্য রাজীবের চারটে ছবিই দেশে বিদেশে পুরস্কার পুরস্কার পেয়েছে – ভালো ব্যবসাও করেছে। তার জীবনের সেই অপ্রিয় ঘটনাটাই রাজীবের প্রতিভায় একটা অস্থিরতা – একটা পাগলামো যোগ করে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, সেটাও বোঝে বর্ষা।

কোনও উত্তর দেয়নি সেদিন,  কিন্তু রাজীবকে ছেড়ে যাওয়াও হয়নি বর্ষার । কোথায় যেত – কাকেই বা বলত ! এসব কথা কাউকে বলা যায় না। দমদম পার্কের বাপের বাড়িতে দাদা বৌদি আর মার সংসার। বৌদির সাথে বনাবনি নেই তেমন। ভেবেছিল মাকে বলবে একবার। তাও বলেনি, মায়ের শরীরটা ভালো নেই। প্রেশারটা বেশি, যদি চিন্তায় চিন্তায় কিছু হয়ে যায় ! রাজীব ছাড়া তেমন করে তো জীবনে কেউ আসেওনি তার।

কিছুটা অপরাধবোধ হয়ত,ঠিক জানে না বর্ষা, কোলকাতায় ফেরার পরে রাজীবও চুপচাপ হয়ে গেল অনেক। টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা হয় তাদের । আপাতভাবে সবই স্বাভাবিক কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও দূরত্ব বাড়ছিল, একটু সরে থাকছিল রাজীব। আর কোলকাতায় ফেরার পর থেকেই রাণার যাতায়াত বেড়ে গেল তাদের বাড়িতে। কখনো রাজীবের ফেলে যাওয়া স্ক্রিপ্টের খাতা – কখনো কোনও প্রপ নিতে আসত। চা খেয়ে, গল্প করে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে যেত। কোনও একটা রসায়ন কাজ করছিল, কিছু হরমোন ক্ষরিত হচ্ছিল যা আগে কখনো হয়নি বর্ষার,   সেই দেখা হওয়ার সময়টা বাড়ছিল। শেষ তিন মাসে বৌদি থেকে বর্ষাদি থেকে বর্ষায় সহজাত ক্ষিপ্ততায় পৌঁছেছে রাণা তার সব অবরোধ ভেঙে। তারপর প্রথম স্পর্শ, প্রথম চুমু, প্রথম আদর – রাণাকে বাধা দিতে পারেনি বর্ষা । রাণাকে সে সব বলেছে। একটা পাপবোধ কাজ করত তার –  রাণা বলেছে এতে কোনও অন্যায় নেই …

বন্ধ ঘরে বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে, বাড়ছে কি? ‘ইস মোড় সে যাতে হ্যায়’ গানটার মাঝখানে কলিং বেলের শব্দ হঠাৎ , রাণা এসেছে ।

(২)

রাণার ঠোঁট তার সারাটা শরীর আবার নতুন করে আবিষ্কারের খেলায় মেতেছে। এক অদম্য অভিযাত্রীর মত নতুন ভূখণ্ড আবিস্কারের নেশায় সে পেরিয়ে যাচ্ছে পর্বত – অববাহিকা – উপত্যকা – বনানী – অতলান্ত খাদ । রাণার সবটুকু আদর শুষে নিচ্ছে বর্ষা তার অন্তর দিয়ে। এভাবেও ভালোবাসা যায় ! কথাটা শুনে রাণা এত খুশি হবে ভাবেনি সে। এ মাসে তার নিয়মিত রক্তক্ষরণের সময় পেরিয়ে গেছিল প্রায় সপ্তাহ খানেক। আজ সকালেই ঘরোয়া পরীক্ষায় জানতে পেরেছে, সে সন্তানসম্ভবা। খবরটা শুনেই তাকে জড়িয়ে ধরেছিল রাণা । একটা অদ্ভুত আলো খেলা করছিল তার চোখে। এভাবে রাণাকে খুশিতে ভেসে যেতে দেখেনি বর্ষা আগে কখনো।

রাণা বলেছে, “আজ আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ বর্ষা। আমাদের সন্তানকে নিয়ে আমরা দুজন একটা নতুন পৃথিবী তৈরি করব, তুমি বেরিয়ে এসো এই বাঁধন থেকে …”

হোক না রাণা তার চেয়ে প্রায় তিন বছরের ছোট, হোক না অভিধানগতভাবে তাদের ভালোবাসা অবৈধ – কী যায় আসে । আজই বলবে সব রাজীবকে । বলবে সে মুক্তি চায় । না, নিছকই একটা শারীরিক ত্রুটির জন্য মানুষটাকে ছেড়ে যাচ্ছে না সে। তার তো কোনও অভাব রাখেনি রাজীব। ইচ্ছাকৃত ভাবে বঞ্চনাও করেনি । কিন্তু সে যে ভালোবেসে ফেলেছে আর কাউকে – তার এটুকু অসহায়তা নিশ্চয়ই বুঝবে রাজীব। সেই তো বলেছিল নতুন করে জীবন শুরু করতে …

বাইরের মত বর্ষারও শরীরে, মনে অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে  – কানায় কানায় ভরে উঠছে সে।

(৩)

রাজীব বাড়ি ফিরে সাধারণত ড্রয়িংরুমে হুইস্কি খেতে খেতে কোনও দেশি বা বিদেশি ছবি দেখে, ফিল্ম সংক্রান্ত জার্নাল –   ম্যাগাজিন পড়ে, বা পরের দিন শুটিং থাকলে ঘন ঘন ফোনে কথা বলতে থাকে । আজ সাড়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরেই বর্ষার গালে একটা চুমু খেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল সে। মিউজিক সিস্টেমে কিশোর কুমারের অ্যালবাম শুনছিল বর্ষা ,“কোই হামদম না রাহা… ” , এটা আশা করেনি বর্ষা, একটু চমকাল । যাক গে, ভালো খবর আছে হয়ত – কোনও পুরস্কার বা বিশেষ কিছু সম্মান । এগিয়ে যাক মানুষটা। উন্নতি হোক আরও। তার থাকা বা না থাকায় কীই বা ক্ষতি হবে এমন।

আজ রাজীব নিজেই এল বেডরুমে সময়ের আগে, হুইস্কির গ্লাস হাতে। আয়েস করে একটা চুমুক  দিয়ে বেড সাইড টেবিলে গ্লাসটা রেখে, বেশ কিছুদিন পর এই প্রথম বর্ষার চোখে চোখ রেখে বলল, “ এবার খুশি তো ?”

একটু থমকে গেল বর্ষা, “মানে ?”

– “আমাদের সন্তান আসছে যে -”

বর্ষার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল, “কী বলছ তুমি ?”

বাইরের মেঘ ডাকার শব্দ ছাপিয়ে গেল রাজীবের হাসির আওয়াজ, “ আরে এত ভয় পাওয়ার কী আছে, এটা তো আমারই স্ক্রিপ্ট । রাণাকে আমিই প্ল্যান্ট করেছিলাম। ডিল ছিল তোমাকে প্রেগন্যান্ট করতে পারলে সুরানাদের পরের ছবিটায় ওকে রেকমেণ্ড করে দেব ডিরেক্টর হিসেবে – ছেলেটার মধ্যে স্পিরিট আছে জানো – অনেকদুর যাবে …”

গলা শুকিয়ে আসছে বর্ষার, মাথা কাজ করছে না – হাতের কাছেই মোবাইলটা ছিল – ডায়াল করল রিফ্লেক্স অ্যাকশনে রাণার নাম্বারটা – সুইচড অফ।

“ওকে ফোন করো না – পাবে না, অন্য নাম্বার নিয়েছে। সুরানাদের সাথে কথা বলে ওদের পরের বিগ বাজেট ছবিটা – যেটার জন্য ওরা আমাকে চাইছিল, সেটা রাণা ডিরেক্ট করবে । ওকে নিয়ে সব ফাইনাল করে এলাম – এটাই ডিল ছিল, এরপর আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না আমাদের সাথে… ” হুইস্কির গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিল রাজীব ।

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না বর্ষা, অসাড় হয়ে আসছে তার সারাটা শরীর, শুধু বলতে পারল, “ এ কী করলে তুমি !”

-“কেন, এটাই তো ভালো হল। সবাই জানবে যে আসছে সে আমাদেরই সন্তান। আমার দিকে আঙুল তুলতে পারবে না কেউ কোনোদিন । তোমাকে বলিনি আগে, জানি রাজি হতে না – রানাকেও তো বলেছ, তুমি পাপ করছ – এত পাপ পুণ্য বোধ তোমার – কি করে আগে বলতাম বল তো ? কিন্তু সত্যি বলছি, আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ … ” হেসে উঠল রাজীব, “হা হা হা হা …”

বড্ড অচেনা লাগছে ওকে বর্ষার। পর্দার ফাঁক দিয়ে জানলার কাঁচ দিয়ে আসা চমকানো বিদ্যুতের নীল আলো রাজীবের মুখে । রাণার কণ্ঠস্বর রাজীবের প্রতিটা কথায় শুনতে পাচ্ছিল বর্ষা।  নগ্ন সে রাজীব – রাণা দুজনের কাছেই হয়েছে – কিন্তু এভাবে নগ্ন সে হয়নি কখনো আগে ।  তারপর, তার প্রচণ্ড কান্নার শব্দ রাজীবের হাসির শব্দকে ছাপিয়ে যেতে পারল না… সারাটা শহর তখন বর্ষায় স্নান করছে ।

Latest posts by নীলাঞ্জন ব্যানার্জী (see all)