ভিক্টোরিয়ায় সন্ধ্যাবেলা। পথের দিকে চেয়ে নম্রস্তনা, স্নিগ্ধতনু, হরিণনয়ন মেয়ে। থমথমে মেঘ ভেঙে এবার অঝোর বৃষ্টি নামল। ছাতায় মাথায় ক্যাওড়া কিচাইন, পথের ট্র্যাফিক থামল।

আকাশ চোখের ছেলেটিও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। লাজুক হেসে এবার এল কৃষ্ণকলির কাছে, “অনেকক্ষণ তো দাঁড়িয়ে আছেন কারও অপেক্ষায় – ফোনটা লাগান, বৃষ্টিতে যে শহর ভেসে যায়।”

“নেটওয়ার্ক ফেল।” কাঁদোকাঁদো কৃষ্ণকলি বলে, “ট্র্যাফিকও জ্যাম, পড়লাম কী ভীষণ গ্যাঁড়াকলে! বলেছিল ড্রপ করবে পিয়ারলেসের মোড়ে – একা এখন এ দুর্যোগে ফিরব কেমন করে!”

আকাশ ভাবে – নেকু, কেন ঘরের বাইরে এলে! এলেই যদি, কোন দুঃখে প্রেম করতে গেলে? মুখে বলে, “আমারটিও ডিচ করেছে, তাই চলুন তবে দু’জন এবার একসঙ্গেই যাই।”

“আপনি কোথায় যাবেন?”

“ধরুন, কোথাও কাছাকাছি। ভয় কিছু নেই, তেমন হলে সঙ্গে আমি আছি। রোডের ট্র্যাফিক লাজুক এখন। চলুন, মেট্রো নিয়ে এখান থেকে উঠব সোজা টালিগঞ্জে গিয়ে। সেখান থেকে রিক্সা চেপে যাদবপুরের মোড়ে। বাকি পথটা যেতে পারেন অটো বা বাস ধরে।”

ghonta duyer pala

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

হঠাৎ জাগে বিজলি ছটা অন্তরীক্ষলোকে। ‘ডেট’-ভাঙা দুই যুবা-যূনী তাকায় চোখে চোখে। দুষ্টু মনের জানলা ফুঁড়ে এক পলকের আশা – হয় যদি হোক ঘণ্টা দুয়ের খুচরো ভালোবাসা!

মেট্রোরেলে ভিড় থৈ থৈ। যখন দরজা খোলে আকাশ সবল বাহুর টানে সঙ্গিনীকে তোলে। ছিটকে পড়ে দেহে দেহে স্পর্শ কিছুক্ষণ। কোমল বুকের মদির ছোঁয়ায় হৃদয় উচাটন।

টালিগঞ্জে মহানায়ক বুক ছমছম হেসে বলেন – পথিক, মানবজীবন ধন্য ভালোবেসে। রিক্সা স্ট্যান্ডে গিয়ে কিন্তু ‘তেনার দেখা নাই’। কৃষ্ণকলি স্মার্টলি বলে, “চলুন, হেঁটেই যাই।”

আকাশ তবু সংশয়ে, “পথ তেমন বেশি নয়। মধ্যে কিছু আঁধার গলি, সেইখানেতেই ভয়।”

“তুমি তো আছ।” হরিণ মেয়ে নিবিড় হয়ে আসে। অবাক পুরুষ মুখ তুলে চায়, ঘনায় নারীর পাশে।

চোখে চোখে ফুলকি ছোটে, শরীর কাছে কাছে। রাস্তায় জল, দৃষ্টি জুড়ে ইলশে গুঁড়ি নাচে। নির্জন পথ, পেরোয় কত আঁধার-আলোর গলি। জল নুপুরে ছন্দ খোঁজে হারানো কোন কলি। মেদুর হাওয়ায় বুক টনটন কীসের যন্ত্রণায়! দুজনেই মন উজার করে হারিয়ে যেতে চায়। হঠাৎ দুটি ছন্নছাড়া বিক্ষত হৃদয় পরস্পরের মাঝে খোঁজে শান্ত পোতাশ্রয়।

রাস্তা কখন ফুরিয়ে আসে, ফুরোয় না আজ কথা – ঘরভাঙা আর বুকভাঙা দুই প্রাণের আকুলতা। ঘর ভেঙেছে খিদেয়, বানে। ভাসতে ভাসতে এসে কংক্রিটের এই জঙ্গলে পায় শুকনো মাটি শেষে। মহানগর, মহানগর, বলো না তুমি কার? তিলোত্তমার ওপর শুধু বীরের অধিকার। যে লুটে নেয় আজ সে মরদ, হৃদয়-বিবেক বোঝা। মায়ার খেলায় নকল খাঁটি, মিছেই আসল খোঁজা। প্রেমের খেলাও আজব খেলা, নিক্তি মাপা কল – যেইদিকে ঘাস বেশি সবুজ, ছুটবে ভেড়ার দল। সাবধানি ‘লাভ’ গড়ে, ভাঙে, লাভের গুড়ে বালি! প্রেমিকা চায় বিত্ত, প্রেমিক নগ্ন দেহই খালি। এই খেলাতে দুই গোহারা যখনই নিশ্বাসে অক্সিজেনের অভাব বোঝে, ভিক্টোরিয়ায় আসে। অপেক্ষা সার, কেউ আসে না। মিথ্য ‘ডেট’-এর ছলে আত্মপ্রবঞ্চনায় দু’জন স্বপ্ন খুঁজে চলে।

মায়াবী এক বর্ষারাতে আজ কি অবশেষে দুই হৃদয়ের স্বপ্ন একই চলার পথে মেশে? পুরুষ দেখে হরিণ মেয়ের স্নিগ্ধ বেতস তনু। আকাশ চোখে নারী দেখে ভরসার রামধনু। একটু দূরে পথের শেষে বাসগুমটির আলো – গলির ভেতর এধার-ওধার ছায়া কালো কালো। হঠাৎ স্তব্ধ পদধ্বনি, নিরালা এক ক্ষণে দু’টি শরীর এক হতে চায় তীব্র আলিঙ্গনে। ধকধক দুই হৃদযন্ত্র একই কথা বলে। ভালোবাসা উপছে পড়ে উষ্ণ চোখের জলে।

এবার ছাড়াছাড়ির পালা। কবে, বলো কবে হরিণ মেয়ে, আকাশ ছেলের আবার দেখা হবে? সেলফোন বের করে দেখে, জলের ধোঁয়ায় সাদা। ব্যাগ, পকেটের কাগজগুলোও নেতিয়ে যেন কাদা। দুষ্টু চোখে তাকিয়ে থেকে পরস্পরের দিকে এ-ওর হাতের পাতায় দিল সেল নাম্বার লিখে।

বাসে যে যার স্টপে নেমে গলির পথে হাঁটা। বুক হালকা, তবুও কিছু অস্বস্তির কাঁটা। ভালোবেসে কখনও কেউ আঘাত দিতে চায়? ভালোবাসলে কখনও সব সত্যি বলা যায়! চলে, চলে বাড়ির পথে, পথেরও নাই শেষ – খোয়াব ভাঙে, চারপাশে সেই আঁধার গলির দেশ!

আঁধার গলি, আঁধার গলি, বলো না তুমি কার? মুখে যাদের মিছরি হাসি, বুকে ছুরির ধার। হরিণ মেয়ে, আকাশ ছেলে দু’জনই আজ ঠিক বীরভোগ্যা তিলোত্তমার যোগ্য নাগরিক। অনেক হাবুডুবু খেয়ে সার বুঝেছে তারা – ফাঁসাও, নইলে ফাঁসো, এটাই এ জঙ্গলের ধারা! ছিপ ফেলে তাই বসে থাকে প্রেমের বালুচরে – সরল মুখের ইউ-এস-পি’তে সহজ শিকার ধরে।

দু-তিন দিনের ফ্যালফেলে প্রেম, নিরালা সব স্পট। মওকা বুঝে কাজটা হাসিল, তারপর চম্পট! আকাশ ছেলের অস্ত্র মোবাইল, অন্তরঙ্গ ফোটো। কিচাইন হলে দেখিয়ে চাকু পার্সটা খিঁচে ছোটো। হরিণ মেয়ের কাছে মজুত ড্রাগ মেশানো কোলা – নইলে স্প্রে-তে বেহুঁশ করে ভরিয়ে নেওয়া ঝোলা। কবির প্রিয় বর্ষাঋতু ওদের অফ-সিজন। আউটডোর প্রেম নেতিয়ে ছাড়ে বৃষ্টিভেজা দিন। সীট-ফিট সব ভিজে গোবর, মাঠঘাট থৈ থৈ। রেস্তরাঁতে রেস্ত খসে, প্রাইভেসিটাও কই! তবুও যদি হঠাৎ কোনও ছুটকো পাখি পায়, ভিক্টোরিয়ায় দাঁড়িয়ে ছিল তেমন দুরাশায়। মেঘের ছায়ায় সজল হাওয়ায় পিয়াসী প্রাণ কাঁদে। দুই শিকারিই পড়ল ধরা অথৈ চোখের ফাঁদে!

সত্যিকারের ভালোবাসা, এ কী বিষম দায়! নিয়ে নয়, মন কিছু দিয়ে ধন্য হতে চায়। ভালোবাসার সঙ্গীকে কি কষ্ট দেওয়া যায়? বুক ফাটলেও যায় না টানা আঁধার গলিটায়! কাজেই জানা, ঘণ্টা দুয়েই এই খেলাটার শেষ। অমৃতলোক থেকে আবার অন্ধকারের দেশ। স্প্রে আর ছুরি যেমন, তেমন রইল ব্যাগের নিচে। হাতের পাতায় লেখা দুটো নম্বর, সেও মিছে। ভোলো, ভোলো, তাকিয়ে বলো নিজের ছায়ার দিকে – অন্তত একবার তো তুমি ঠকাওনি সঙ্গীকে!

বর্ষা রাতের প্রেম কি তবু বললেই যায় ভোলা? ভালোবাসার কাঁঠাল আঠা, সহজে যায় তোলা! কী পেয়ে মন কী হারাল, হিসেব কষে চলে। নিশুত রাতে সময় পোড়ে, বুকে আগুন জ্বলে।

হরিণ মেয়ে, গভীর রাতে আমার বাড়ি এসো। আর কিছু নয়, অন্তত আজ আমায় ভালোবেসো। আজকে রাতে তোমার সাথে নিরুদ্দেশে যাবো। হরিণ মেয়ে, অন্তত আজ আমার কথা ভাবো!

আকাশ ছেলে, উষার আগে আমার বাড়ি এসো। কিছু না হয়, একটি বার আমায় ভালোবেসো। তোমার বুকে পরম সুখে সুদূর পাড়ি দেবো। আকাশ ছেলে, আজকে শুধু আমার কথা ভেবো।

ঘুমোয় ছেলে, ঘুমোয় মেয়ে – জাগুক না কল্পনা! রকেট যুগে একটি রাত, সময়টা অল্প না। কাল সকালে শুকনো আলোয় প্রেম-খোঁয়াড়ি কেটে বুকের জ্বালা নিভলে আগুন উঠবে জ্বলে পেটে। জঠরজ্বালা বড় জ্বালা, দেহে ছড়ায় তাপ। হাতের শিকার ছেড়ে দেওয়া ভুখার মহাপাপ। বুকের চিতা নিভলে পোড়ায় নিম্নাঙ্গের জ্বালা। অথ ইতি বর্ষা রাতের ঘণ্টা দুয়ের পালা।

Latest posts by অনিরুদ্ধ সেন (see all)