“ভিন্ডি” – “সায়েরি” – “জোড়ি”

আজ আমি অসম্ভব উত্তেজিত। এত এত কথা বলার আছে যে গুছিয়ে সাজিয়ে উঠতে পারছি না। কাকে আগে কাকে পরে রাখবো ভাবতে ভাবতে দিশেহারা অবস্থা।

আর বিলম্ব নয়। ‘জয় জয় নির্মলার জয়’ বলে শুরুই করে দি। নির্মলা আর আমার দুজনেরই অজান্তে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে নির্মলা-কাব্য। আমাকে যে ও খেরোর খাতা হিসেবে দেখে তাতে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু, ও এখনো পর্যন্ত জানে না, যে কেউ আড়ালে আড়ালে ওর দৈনিক সংবাদ লিপিবদ্ধ করার ভার নিয়েছে, বিনা পারিশ্রমিকে। নির্মলার রোজ কাজে আসায় আমি অভ্যস্ত। কিন্তু ও কোন দিন কী প্রসঙ্গে কথা বলবে বা আদৌ বলবে কি না তার বোতাম আমাদের দুজনের কারুর হাতেই নেই। কোন বড় মাপের যন্ত্রীর তত্ত্বাবধানেই এই খেলা সম্ভব। তাই অকারণ জোর খাটানোর প্রশ্নই ওঠে না।

প্রথম অধ্যায় : ভিন্ডি

আমার এক বন্ধুর বাড়িতে তিন চার দিন হল এক বেলার রান্নার কাজে লেগেছে। গত পরশু ভিন্ডির সব্জি বানিয়ে ওদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বন্ধুটির নাকি ভিন্ডি রান্নার গন্ধেই খিদে পেয়ে যায়। বুঝলাম, ভালো রান্না করার প্রশংসা এত অল্প সময়ের মধ্যে হাসিল করায় ও বেশ খুশী। তাও আবার অন্য প্রদেশের লোকের মুখ থেকে। কথাটা গতকালও শুনেছিলাম। আজ আবার শুনে আমারও ‘ভুক্’ লেগে গেল। গতকাল খুব কষ্টে রেসিপি জানার লোভ সামলেছিলাম। হাজার হোক প্রফেশনাল সিক্রেসি থাকতেই পারে। আজ আর পারলাম না। জোয়ান আর পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়ে টমেটো আর ভিন্ডি বানিয়েছিল। কিন্তু আরো একটা কিছু দিয়েছিল যেটা ওর মনে পড়ছে না। আমি জোর করিনি। কিছুটা হলেও ওর সিক্রেসি ওর অজান্তে রাখতে পারায়, আমি আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি পেলাম। সাধে বলি, বোতামের অস্তিত্বের কথা।

দ্বিতীয় অধ্যায় : সায়েরি

ওর গল্প বলার একটা স্বচ্ছ স্নিগ্ধ ধরণ আছে। তারিফ করায় জানা গেল যে কারোর ‘নলেজে’ যদি কোন কিছু  বসে যায় তাহলে তা বলতে কোন অসুবিধে হয় না। কিন্তু, যদি তা না হয় তাহলে মানুষকে দৌড়দৌড়ি করতে নানান রকম খাপছাড়া ঘটনার মধ্যে। ফলে, ‘কিস্সা’ বলতে অসুবিধে হয়। যেন, নলেজ ওর চোখে বিশাল বড় মাপের বাগান বিশেষ। আর কথারা হল সেই বাগানে খেলতে আসা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। কোন বিশেষ কারণে তারা বাগানের এক জায়গায় জড়ো হলেই গল্প তৈরী হতে থাকে।

বললাম , “তোমার বাচ্চাদের গল্প শোনাও?” জানালো, ঘুমোতে যাওয়ার সময় কিস্সা শুনতে ছানারা বেশ ভালবাসে। “কী ধরনের কিস্সা শোনাও – রাজা রাণীর গল্প?” মূলতঃ, যা ওর বাবা- মা-চাচা-চাচী-দাদা-দাদীর কাছ থেকে শুনে এসেছে, তাই বলে থাকে। এছাড়া নাকি সায়েরিও বলে। বললাম, দু একটা শোনাও। দু একটা লাইনেই শেষ এমন সায়েরি শোনার পর বুঝলাম যে ও ধাঁধাঁর কথা বলছে। ঠিক করলাম লিখে নি বরং। লেখার কথা বলতেই সাথে সাথে ঘর মোছার ন্যাতাকে তাচ্ছিল্যের সাথে ফেলে দেয়। ৪ ফুট ৭ ইঞ্চির ৪০ কেজি ওজনের শরীরটা জানালার পাশে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারে নিজেকে  ধপ করে ছেড়ে দেয়। দুই হাতলে দুই হাত রেখে বললো, “ঠিক হ্যায়, তো ফির লিখো”।

বগায়ের চ-খাটকে দরওয়াজা বন্ধ্  রহতা হ্যায়। বোলো কেয়া হ্যায়? .. হোঁট্। কথা বলার সময়ই তো ঠোঁট খোলে। আর চৌকাঠেরও কোন বালাই নেই। মনে পরে গেল দেশের বাড়ি আর কালিঘাটের একান্নবর্তী পরিবারে কাটানো বাড়িগুলোর কথা। ফ্ল্যাট বাড়িতে চৌকাঠ কোথায়, সবই ফ্ল্যাট।

ইধার সে গেয়া, উধার সে আয়া। বোলো কেয়া হ্যায়? … নজর। ভাবলাম, অনেক কিছুই তো হতে পারে। আমি কোন তর্কাতর্কির মধ্যে যাইনি।

মুঠঠি মে আতা হ্যায়, পর কুঠিয়া মে নেহি আতা। বোলো কেয়া হ্যায়?  ভাবলাম, মুঠঠি সমেত তো আমি নিজেই কুঠিয়ায় ঢুকে যাবো। কী রে বাবা! … ছাতা। জানলাম, কুঠিয়া মানে আনাজপত্র রাখার জন্য পাতলা লাহার পাত দিয়ে তৈরি ছোট দরজা ওয়ালা ঘর। অনেকটা ধানের গোলার ধরনের।

সব লোক বাজার গ্যায়ে পর মটুয়া নেহি গেয়ে। বোলো কেয়া? মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই মটুয়া রোগা হওয়ার ধান্দায় ছিল। … কুঠিয়া। কুঠিয়া প্রচুর আনাজ খেয়ে এত মোটা হয়ে গেছে, যে বেচারার নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই।

আমারই ঘরে বসে আমাকে হারতে দেখে নির্মলার মনে হয় ভালো লাগছিল না। অকপটে স্বীকার করে নিল যে প্রশ্নগুলো আমার জন্য একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। “ঠিক হ্যায় দিদি থোড়া সিম্পল্ সা সওয়াল করতি হুঁ।”

১০০ বিঘা জমিন। উসকে উপর গাউঠা জায়সা কুছ হ্যায়। বোলো কেয়া? অনেক পরিশ্রমের পর জানা গেল গউঠা মানে ঘুঁটে। যথারীতি আকাশ কুসুম ভেবেও এই ‘সিম্পল্ সা’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। … সূর্য্য। কীরকম জিজ্ঞেস করায়, বললো একশো বিঘা জমি অনেক অনেক বড় হয়। তার মধ্যে সূর্য্যই তো দেখা যায়! বললাম, সূর্য্য তো আকাশে। ওর পাল্টা উত্তর, “কিন্তু আকাশে বললে তো সবাই একবারেই বুঝে যাবে।” একমাত্র  হযবরল শাস্ত্রেই এর ব্যাখ্যা মিলতে পারে।

পরে ভাবলাম, ঠিকই আছে। আকাশ কোথায় শুরু আর ‘জমিন’ কোথায় শেষ এর উত্তর তো কারুর কাছেই নেই। তাই, গোটাটাই একটা বড় ‘জমিন’ ধরে নিলেই সব সমস্যার সমাধান। কিছুটা সবুজ, কিছুটা নীল। কিছুটা নিচে কিছুটা ওপরে। হযবরল ভাবে আছে।

তৃতীয় অধ্যায় : জোড়ি

এবার তৃতীয় এবং শেষ অধ্যায়। … “ওয়ো পতা নেহি দিদি। মুঝে তো সিরফ্ ইয়ে মালুম হ্যায় কে হামারে ইধার যব্ দিন হো তা হ্যায়, আমরিকা ম্যায় তব রাত হোতি হ্যায়।” কী মনে হল ওকে বললাম নিজের চারদিকে ঘুরতে। আর আমি নিজের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে ওর চারদিকে ঘুরতে থাকলাম। ন্যাতা নির্বাক দর্শক। নির্মলা চোখ বড় বড় করে মুখ হাঁ করে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতেই ওকে ভাঙ্গাচোরা হিন্দিতে দিন রাতের ‘কিসসা’ শোনাই। চাঁদের চরিত্রে অবশ্য কাউকে পাওয়া যায়নি। ওর চোখ মুখে বিস্ময়ের শেষ নেই। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অবাক হয়ে বললো, এত সব কথা ওর জানাই ছিল না। ওর বাবা মাও ওকে জানায়নি। এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে ন্যাতাকে নিতে গিয়ে হঠাৎ করে বলে বসলো “উপরওয়ালা কা হিসাব্ সহি হ্যায়, দিদি।” জানতে চাইলাম কীরকম হিসেব?

যদি ‘হরওয়াক্ত’ দিনই থাকতো তাহলে ‘আদমি’ কাজ করতে করতে পাগল হয়ে যেত। পৃথিবীর অন্যদিকে, রাতের লোকেরা ঘুমোতে ঘুমোতে ‘ভুকে পেয়াসে’ই মরে যেত। তাই ওর মতে ভগবানের হিসেবে কোন গরমিল নেই। ভগবান তাই পিঁপড়ে থেকে শুরু করে সব কিছুরই ‘জোড়ি’ বানিয়েছে দিন রাতের মতো।

আমি বাকরূদ্ধ।

পূর্ণা
১৯/০৮/২০১৫
গ্রেটার নয়ডা।

Latest posts by পূর্ণা মুখার্জী (see all)