ছোটবেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে স্মৃতিটা মনে ভেসে আসে  সেটা হলো, মাদুরের উপরে বাবু হয়ে বসে দুলে দুলে রবিঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ থেকে পড়ে চলা সেই কবিতাটা: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে‘ – তবে বৈশাখ মাসের থেকে শরৎ আর শীতকালের জন্যেই আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম। শীতকাল মানেই স্কুলের Annual পরীক্ষা, সেটা কোনোমতে শেষ করে দিতে পারলেই স্বর্গলাভ – যথেচ্ছ খেলা-ধুলা, ঘুড়ি ওড়ানো, গল্পের বই পড়া, মামার বাড়ি যাওয়া, পিকনিক, আরো কত্তো কী! অন্যদিকে শরৎকাল মানেই দুর্গাপুজো। তা, পুজো তো প্রায় এসেই গেলো – দেখতে দেখতে আবার ঠিক চলেও যাবে। যাওয়া-আসার এই দোলনায় চেপে আমার ছেলেবেলাকার পুজোর দিনগুলো থেকে একটু ঘুরে আসতে ভারি ইচ্ছা করছে।

Kunal 1

দুর্গাপুজোর সূত্রপাত হয়ে যেতো ‘রান্না পুজো’ থেকে। তবে ‘রান্না পুজো’র কথা শুনে অনেকে ভ্রু কোঁচকাতেই পারেন, কারণ ‘রান্না পুজো’ হলো পুরোপুরি এদেশীয় অর্থাৎ ‘ঘটি’দের বাপকেলে অনুষ্ঠান। রান্না পুজো মানে ‘রান্না’-র পুজো আবার সেই সঙ্গে ‘অরন্ধন’, অর্থাৎ না-রান্নাও বটে! ভাদ্র সংক্রান্তিতে, বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন পরিবারের যাবতীয় মেয়েরা, অর্থাৎ মা-মাসিপিসি, নিজের এবং জ্যাঠতুতো-মাসতুতো দিদি-বোনেরা, সবাই মিলে একজোট হয়ে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে সারারাত ধরে চালাত কুটনো-বাটনা আর রান্না – সে ছিলো এক অদ্ভুত আনন্দযজ্ঞ। ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়ার এই রীতির মূলে লুকিয়ে ছিলো এক চিরায়ত বিশ্বাস: ভাদ্রের জল হাঁড়িতে পড়লে তবেই নাকি আশ্বিনের ঢাকে বোল ফুটবে, আর ধানের ক্ষেত সব শস্যভারে ফুলেফেঁপে উঠবে। বাড়ির পুরুষদের কাজ ছিলো রান্নাঘরটাকে ঝাড়াই-পোঁছাই করে রাখা, ব্যাগ বোঝাই করে বাজার করে আনা, উনুনের জ্বালানির জোগাড় দেওয়া, টেম্পোরারী কানেকশন দিয়ে ইলেকট্রিক লাইট এবং হ্যাজাকের বন্দোবস্ত করা,  সেই সঙ্গে ক্যাসেট প্লেয়ারে ঝকমারি গানের ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি, মানে যত্তোসব অকাজ আর কী! তো সেই রান্নার বিশাল পর্ব শেষ হতে হতে পরের দিন ভোর না-হলেও, রাত দুটো তো হয়েই যেতো! পরের সকালে সেই সব রান্নাবান্নার প্রত্যেকটি পদ থেকে একটু করে নিয়ে, শাঁপলাপাতায় সাজিয়ে ভক্তিভরে মা মনসাকে সর্বপ্রথমে নিবেদন করা হতো, তারপরে শুরু হয়ে যেতো আমাদের খাওয়া-দাওয়া। হাঁড়িভর্তি পান্তাভাতের সাথে গতরাতের রান্না করা পদগুলি খেতে যে কী অপূর্ব লাগতো, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই রান্নাপূজা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন বাড়িতে বিভিন্ন রান্নার চল থাকলেও মোটামুটি সব বাড়িতেই ‘ডাল শুকনো’, ওল, কচুশাক, চিংড়ি-ইলিশ ভাজা, উচ্ছের একটা রান্না, আর গোলগোল করে কাটা মোটা আলুভাজা হতো। আমাদের বাড়ির স্পেশাল আইটেম ছিলো বাগানের নারকেল গাছের নারকেল দিয়ে বানানো পিসিমার নিজের হাতের করা নারকেল-ছাঁই আর নারকেল নাড়ু। গোটা পনেরো বড়ো বড়ো নারকোল ভেঙে কুরনি-বঁটি  দিয়ে কোরা হতো।  পিসিমা খুব মিহি করে নারকোল কোরাতে পারতেন। বেশ কঠিন ছিলো সে’কাজ – ক্রমাগত হাত ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় হাতে  ব্যথা হয়ে যেতো – তাই অন্যরাও এসে পালা করে হাত লাগাতেন। সেই কোরা নারকেল কড়াইতে ফেলে ভেজে, তার মধ্যে নলেনগুড় ঢেলে, ময়ান করে বানানো হতো নারকেল নাড়ু – অসাধারণ ছিলো তার স্বাদ। গরম অবস্থাতেই নামিয়ে গোল্লা করে নাড়ু বানাতে হতো, কারণ ঠান্ডা হয়ে গেলে সেগুলো আর গোল করা যেতো না। মা-পিসিমা-দিদিদের সবারই হাত ওই তাপে লাল হয়ে যেতো, কিন্তু খেয়ে ‘দারুণ হয়েছে’ বললেই তাঁদের মুখে ফুটে উঠতো পরিতৃপ্তির অনাবিল হাসি। বাড়ির পুকুর থেকে তুলে আনা শাঁপলাডাঁটার ডাল আর আলপনা দিয়ে সাজানো রান্নাঘরের হাঁড়ি-কড়াইগুলিকে দেখে কেমন যেন গা-ছমছম করে উঠতো। একান্নবর্তী পরিবারের নানান আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে, দাদা-দিদিদের বন্ধু-বান্ধবী, পাড়ার নানান লোকেদের যাওয়া-আসায় আমাদের বাড়িটা সারাটা দিন ধরে গমগম করতো। ফলস্বরূপ রাতের বেলা খেতে বসে পান্তাভাতের সাথে ভালো কিছু আর জুটতো না, অন্তত: চিংড়ি বা ইলিশমাছ ভাজা তো নয়ই!

ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়াটাই এ জগতের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু সেই সময়ে আমরা বড্ড বেশি করে চাইতাম ‘চট’ করে বড়ো হয়ে যেতে।  তা’হলে দাদার মতো একলা একলা সাইকেল চেপে যেখানে খুশি যেতে পারবো, বা কাউকে না-বলেই ট্রেনে চেপে কলকাতা ঘুরে আসতে পারবো, এ’সবই আর কি ! কিন্তু আজ পিছু ফিরে বুঝতে পারি যে কি সাংঘাতিক ভুল চাওয়াই না সেদিন চেয়েছিলাম। বড় হওয়া আর মেকি হওয়ার মধ্যে আদপেই যে কোনো পার্থক্য নেই, তা বোঝার ক্ষমতা সেদিনের ‘সেই আমি’-র ছিলো না।

পাড়ার মোড়ে যখন বিশ্বকর্মা পুজো হতো তখন থেকেই বুঝে যেতাম যে নতুন জামাকাপড়ের পাট ভাঙার সময় এখন না-এলেও, দুর্গাপুজো কিন্তু আর মাত্র কয়েক হাত দূরেই। পরিবেশে যেন একটা পুজো-পুজো গন্ধ সে দিন থেকেই পেতে শুরু করতাম। তার কিছুদিন পরেই হঠাৎ করেই এসে যেতো ‘মহালয়া’। ভোর সকালে আধো ঘুম আধো জাগরণে,  বীরেনবাবুর মন্দ্রমধুর কন্ঠে চন্ডীপাঠ:  ‘যা দেবী সর্বভূতেষু …’  শুনে চমকে উঠতাম – অকারণেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো – যাক, পুজো তাহলে সত্যি সত্যিই এসে গেছে!! চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসে খেয়াল করতাম কাছে-দূরের সবকটা বাড়ির রেডিও থেকেই মহালয়া শোনা যাচ্ছে। কাছের রেডিওটা যেন দূরের রেডিওটারই প্রতিধ্বনি – তারপর এক সময়ে সবকটা মিলেমিশে যেতো – দূরের বীরেন ভদ্র আর কাছের বীরেন ভদ্র মিলেমিশে এক হয়ে যেতেন। মনে পড়ে ‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ গানটা শুরু হবার সাথে সাথেই মা দরজা খুলে দাওয়ায় বেরিয়ে আসতেন, শিউলি-গন্ধ মাখা আবছা আলো আঁধারির সেই ভোরে। আকাশটা লাগতো কেমন অদ্ভুত রকমের শান্ত আর নীলাভ। অচেনা একটা শিরশিরে ভাবে ভরে থাকা, শারদীয়ার সুবাস মাখা সেই ভোরে পাখিদের ঘুম তখনও ভাঙতো না। আশ্বিনের শারদ প্রাতে জেগে উঠছে আলোর মঞ্জরী ’, কথাগুলো শুনলেই সারা শরীরে অদ্ভুত এক আবেগ উথলে উঠতো! সে আবেগের পুরোটাই ছিলো নির্ভেজাল আনন্দের। পুজো শুরু হওয়ার আনন্দের সঙ্গে যেমন মিশে থাকতো দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে নিয়ম ভাঙার আনন্দ, তেমনই থাকতো পড়াশোনা ভুলে আপন খুশিতে মেতে ওঠার আনন্দ। স্তোত্রে জেগে ওঠা ভোর কেমন করে যেন ‘আধুনিক’ হয়ে যেতো বেলা বাড়ার সাথে সাথেই। মহালয়ার গানের সঙ্গে মিশে যেতো লতা-সলিল-হেমন্ত কিশোর-আশার পুজোর গান। আকাশের ধূসর, গোমড়া মুখটা পাল্টে গিয়ে কী আশ্চর্য্য রকমের ঝকঝকে নীল হয়ে উঠত। সেই নীল-জুড়ে ভাগ বসাতে চলে আসতো পেঁজা তুলোর মতো সাদা-সাদা মেঘেদের দল। রোদ্দুরটাও হয়ে উঠতো মায়ামাখা, সোনা-রঙা। আর তারই মধ্যে এক সপ্তাহান্তে বাবা বলে উঠেতেন, ‘আজ পুরানো গল্পের বইগুলোকে সব রোদ্দুরে দিতে হবে’। ঘরের দেয়ালজোড়া আলমারিগুলোতে থাকা অগুন্তি বইগুলোকে একে একে নিয়ে আমি চলতাম তিনতলার ছাদে মাদুর বিছিয়ে রোদ খাওয়াতে। সবকটা রোদে দেওয়া হয়ে গেলে, বাবা আকাশের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে উঠতেন: মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি – নাহ্, আর বৃষ্টি হবে না – শরৎ এসে গেছে… – আর অমনিই সেইসব বইয়ের পাঁজা ছুঁয়ে ঝলমলে সোনা-রঙা রোদ আর একরাশ খুশি নিয়ে আমার মনেও হুটোপুটি করে এসে পড়তো শরৎ।

Latest posts by কুন্তল মন্ডল (see all)