প্রতি বছর পুজো আমাদের কাছে একগুচ্ছ সাহিত্য নিয়ে হাজির হয় শারদীয়া পত্রিকা গুলোতে। আমাদের মত সাহিত্য পিপাসুরা অধীর আগ্রহে তাই অপেক্ষা করে থাকে পুজোর আগমনের। কিছু লেখা নিজ গুণে মনে থেকে যায়, আর কিছু লেখা বিস্মৃত হয় গুণহীনতায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত, বেশ কিছু গল্প উপন্যাস পড়লাম। তার মধ্যে শারদীয়া সানন্দাতে প্রকাশিত ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘কলাবতী কথা’ র মধ্যে ভিন্নধর্মী এক লেখার আস্বাদ পেলাম।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে সাঁওতাল কন্যা কলাবতী। অদৃষ্টের পরিহাসে মাধ্যমিকেই পড়াশোনার ইতি, সে তার গ্রামের সাঁওতালি মাদল দলের এক নাচিয়ে, কুরুম্ভেরার মেলায় লাঞ্ছিত , পায়নি নিজের দলের কারুর সহানুভূতি বা সাহায্য। মেলার ওই ঘটনায় সে বাঁধা পড়ে কনকের সাথে এবং কালক্রমে কনকের সংসারে।

কনকের জীবনে সুখের থেকে দুঃখ টাই বেশি। পায়নি স্বামীর ভালবাসাটুকুও। তবুও নিজের সংসারের অস্বচ্ছলতাকে অতিক্রম করে এক আধুনিক রমণীর মোড়কে তাকে আমরা দেখতে পাই যার কাছে অপরিচিত কোন মেয়ের সম্ভ্রম অনেক বড় হয় নিজের অর্থোপার্জন থেকে। তাইতো কলাবতী যখন কুরুম্ভেরা মেলায় লাঞ্ছিত হয়েছে তখন একা সে পাশে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে গেছে প্রতিবাদ করতে বিপদ আছে জেনেও এবং সবশেষে জাতিভেদ দূরে রেখে সাঁওতাল মেয়ে কলাবতীকে নিজের পুত্রবধূর সম্মান দিয়েছে। এখানেই মহৎ হয়ে উঠেছে চরিত্রটি। আধুনিক চিন্তাভাবনার যে প্রতিফলন দেখি আমরা কনকের চরিত্র তা আধুনিক অগ্রসর সমাজেও বিরল।

রামু, কলাবতীর স্বামী, কনকের পুত্র। কলাবতীর প্রতি ভালবাসার অন্ত নেই। কনক, কলাবতীর ‘পইঠার পট-চিত্র’ গড়ে ওঠা ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য রামুর প্রতিদান অনেকটাই। কিন্তু রামুর সহজ সরল মন কলাবতীর মনের গভীরে পৌঁছতে পারে না। পারে না একজন নারীর গভীরতম ইচ্ছা অনিচ্ছার নাগাল পেতে, তাই তাকে হারাতে হয় কলাবতীকে। শুধু সাংসারিক দায়িত্ব ছাড়াও যে একজন নারী তার মনের পুরুষের কাছে আরও কিছু প্রত্যাশা করে নীরবে, তা বোঝার সাধ্য বোধহয় সহজ সরল গ্রাম্য রামুর ছিল না।

এছাড়া আমরা দেখি আকিও ও মিকি চরিত্র, জাপানী ছেলে মেয়ে। মিকির সাথে কলাবতীর পরিচয় হয় মেলায়। এবং তার হাত ধরেই কলাবতীর পটশিল্প পৌঁছে যায় সুদূর জাপানে। এবং উপন্যাস শেষে আকিওর হাত ধরে কলাবতীর নতুন সংসার শুরু হয় জাপানে।

কিন্তু যে জিনিসটা এই লেখাটাকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করে তা হল এর বিষয়বস্তু। গ্রাম বাংলার পটশিল্প, পটশিল্পীদের জীবন, কথকতার কাহিনী যেগুলো বাংলার নিজস্ব, যার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা নেই। লেখককে সেই কারণে ধন্যবাদ। বাংলার হাট, মিলন মেলার মেলা ইত্যাদি জায়গায় এই পটশিল্পের কিছু নমুনা আমরা মাঝে মাঝে কলকাতায় বসে দেখার সুযোগ পাই। কিন্তু লেখিকার লেখনীর জোড়ে আমরা ঘুরে আসি এই সব পটশিল্পীদের জীবনে, তাদের সংঘর্ষময় জীবনযাত্রার মধ্যে। দেখতে পাই কিভাবে এই পটশিল্পীরা পটের শিল্পের মধ্যে পুরাণের কাহিনী ফুটিয়ে তোলে, তার উপযুক্ত গান রচনা করে মেলায় মেলায় পসার সাজিয়ে বসে, কিভাবে দিনের পর দিন নিজেদের দারিদ্র অতিক্রম করেও বাংলার এই ঐতিহ্য কে নিজেদের কাঁধে বয়ে নিয়ে চলে। সঙ্গে রয়েছে কথকতার কাহিনী। উপন্যাসে বেশ কিছু ব্রতকথার উল্লেখ রয়েছে – ভৈমি একাদশী ব্রত, গোটা ষষ্ঠী, নিত-সিঁদুর ব্রত, অশোকষষ্ঠীর ব্রত, নীলষষ্ঠী ব্রত, অক্ষয় তৃতীয়া, বিপত্তারিণীর ব্রত, চাপড়া-ষষ্ঠী। এই সব ব্রতের পৌরাণিক কাহিনী কখনো কথকঠাকুরের মুখে, কখনো কনকের মুখে, কখনো কলাবতীর মুখে অনবদ্য ভঙ্গিতে লেখিকা ফুটিয়ে তুলেছেন। লেখিকার পুরাণ বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা প্রশংসার উল্লেখ রাখে। উপন্যাস শেষে বিশেষ নোটের উল্লেখ থেকে জানতে পারি লেখিকা দীর্ঘদিন মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ছিলেন এবং সেই সূত্রে এই পটশিল্পীদের সংসর্গে এসেছিলেন। লেখিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই পটশিল্পীদের জীবনকে তাঁর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময়ের ফসল ‘কলাবতী কথা’, এটা যে কোন ‘Puja Assignment’ না তা পড়লেই বোঝা যায়। লেখিকা হৃদয় দিয়ে লিখেছেন। তাই লেখাটা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

তবে উপন্যাস পড়া শেষে কিছু প্রশ্ন মনে আসে।

এক জায়গায় আমরা দেখি আকিও জাপানী ভাষা ছাড়া জানে না। অথচ সেই রাতেই সে পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। এই কথোকপথন টা না থাকলেই বোধহয় ভাল হত। আমরা তো অনেক সময়েই নীরবে অনেক কথা বলে দিই। দুজন ভিন্নভাষী মানুষকে একে অপরের কাছে আনতে নাই বা আমরা মুখের ভাষা ব্যবহার করলাম, মনের ভাষাটা কি যথার্থ হত না?

উপন্যাসের শেষে যখন কলাবতী আকিওর সাথে জাপানে তার নতুন সংসার শুরু করে সেই সময় তার শাশুড়ি কনক বা তার স্বামী রামুর মনে কি হল তা জানা গেল না। কনক বা রামু ব্যাপারটা এত সহজে মেনে নেওয়াটাকেও ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। কলাবতীর মধ্যে আধুনিক মনস্কতার পরিচয় থাকলেও তা যেন কোথাও একটা সীমা লঙ্ঘন করে। তার দেশের সীমা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার থেকেও বড় হয়ে দেখা দেয় নারীত্বের পূর্ণ স্বাদ পাওয়ার নিদারুণ চাহিদা থেকে নারীমর্যাদার সীমানা পেড়িয়ে যাওয়া। তাই কলাবতী এই উপন্যাসের নায়িকা হয়েও কিছুটা যেন খলনায়িকা হয়ে যায় গল্প শেষে।

সব শেষে আবারও ধন্যবাদ লেখিকাকে এরকম একটা উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য। আশা করি লেখিকা পাঠকদের জন্য এরকম আরও কিছু উপন্যাসের ডালি নিয়ে হাজির হবেন অদূর ভবিষ্যতে।

Latest posts by অর্ণব রায়চৌধুরি (see all)