রঙীন,

আজ তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম। বহু-বহুদিন পর। আমি তোমাকে ভুলিনি যদিও। মাঝে মাঝেই, অফিসের কাজের ফাঁকে ফেসবুকে বন্ধুদের কমেন্টের ভিড়ে তোমার মুখটা উঁকি দিয়ে যায়। তুমি বোধহয় জোর করেই আমাকে ভুলে গেছ, একদিন দেখলাম ফেসবুক থেকে আমাকে বাদ দিয়ে দিয়েছ। কেন গো, কী করেছিলাম আমি? তোমাকে ভাল লাগে, সেটা বোকার মত প্রকাশ করে ফেলেছিলাম শুধু। আর তো কিছু করিনি। তাতেই কি তুমি…?

আজ খুব পুরনো কথা মনে পড়ছে, জানো। অফিসে এসে কাজ করতে না পেরে নোটপ্যাড খুলে পাগলের মত লিখে যাচ্ছি – এই চিঠি – যা কোনোদিন তোমাকে পাঠাবো না। মনে আছে, একটা গোটা শীত দুজনে একসঙ্গে কাটিয়েছিলাম, বরফের শহরে। একে অপরের সান্নিধ্যে উষ্ণতা আদান প্রদান করেছিলাম। বড় ভাল কেটেছিল সেই দিনগুলো, তোমার সাথে দেখা হওয়ার পরের দিনগুলো। কী করে প্রথম দেখা হয়েছিল জানো? সেটাই তোমাকে বলিনি কোনোদিন, লজ্জায়। দুর্গাপুজোর আগে একদিন অফিস যাওয়ার জন্যে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ তোমাকে চোখে পড়েছিল। একই বাসে উঠেছিলাম দুজনে। তুমি উঠেই কানে ইয়ারফোন গুঁজে বই খুলে বসেছিলে। আমি একটু দূরে বসে তোমায় দেখছিলাম। মানে, বেশ নির্লজ্জের মতই দেখছিলাম। ভাগ্যিস ওটা দেশ ছিল না, নইলে নির্ঘাত কেউ বুঝে ফেলত। বিদেশে ওসব কেউ লক্ষ্য করে না। তোমার ঝোঁকানো মাথাটা পাশ থেকে দেখছিলাম। আসন্ন শীতের মেঘলা আলোছায়াতে তোমার টিকোলো নাকটা আরো প্রখর, আরো দৃপ্ত দেখাচ্ছিল। একটু বড়, টানা চোখে কীরকম একটা উদাসীনতা মাখিয়ে ঠোঁটদুটো চেপে তুমি একমনে বই পড়ে যাচ্ছিলে। নিজের স্টপে নামার জন্যে যখন উঠে দাঁড়ালে, লম্বা দোহারা শরীরটা প্রায় বাসের মাথায় ঠেকে যাচ্ছিল। আমাকে প্রায় মাথা তুলে তোমায় দেখতে হল। তুমি কিন্তু একবারও আশেপাশে তাকাওনি, অর্জুনের লক্ষ্যভেদের মত বাসের দরজাটা দেখছিলে। আর তোমার চোখদুটো আমায় টানছিল। ভীষণভাবে টানছিল। কী মায়াবী অথচ উদাসীন দুটো চোখ। যেন অযুত ভালবাসা জমিয়ে রেখেছ নিজের ভেতর কিন্তু বিলিয়ে দেওয়ার মত কাউকে পাচ্ছ না। আমি সম্মোহিতের মত তোমার দিকে চেয়ে ছিলাম লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়ে। তোমার চেহারাটা, চোখদুটো প্রায় আমার মনে গেঁথে যাচ্ছিল, কেউ যেন কেটেকুঁদে বসিয়ে দিচ্ছিল আমার মনের দেওয়ালে।

তারপর থেকে প্রত্যেকদিন বাস স্টপে তোমাকে দেখার আশায় থাকতাম, যেন স্কুল-কলেজের দিনগুলো ফিরে এসেছিল। কিন্তু আর একদিনও দেখা পাইনি। দুর্গাপুজোর দিন বাঙালি সহকর্মীদের সাথে একটা ঢাউস ইশকুলে গিয়ে অঞ্জলির লাইনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ স্থানুবৎ হয়ে গেলাম…তোমাকে দেখে। বিশ্বাস করো, দু-এক মুহুর্তের জন্যে হৃৎপিন্ড থমকে গেছিল। তুমি একদিকে বসে একদৃষ্টিতে মা দুর্গার দিকে তাকিয়ে ছিলে কীরকম সমাধিস্থভাবে, অঞ্জলি দাওনি বাকি পাঁচজনের মত। আমার খুব ইচ্ছে করছিল তোমার সাথে একবার কথা বলার, তোমার গলার আওয়াজ শোনার, তোমার নামটা জানার; সুযোগের অপেক্ষায় উশখুশ করছিলাম। ভাগ্যক্রমে আমার এক সিনিয়ার সহকর্মী তোমাকে চিনতেন, তিনি নিয়ে গিয়ে আমাদের সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। দুজনের কম্প্যানি আলাদা হলেও একই টেকপার্কে অফিস জেনে মনে মনে আনন্দে লাফাচ্ছিলাম। সেদিনই প্রথমবার তোমার নামটা শুনলাম – রঙীন। লাল-নীল-সবুজ নয়, পুরোটা রঙীন। চেনাজানা লোকেরা অবশ্য বলছিল রঙীনের চেয়ে সাদা-কালো নামটা তোমায় বেশি মানায়। তুমি নাকি গম্ভীর, রাগী, চুপচাপ, অমিশুক, চাপা, ইত্যাদি। আমি ওসবে কান দিইনি, বরঞ্চ তোমাকে একটু কাল্টিভেট করতে চেয়েছিলাম। মনে আছে, কদিন পর বিজয়া সম্মিলনীর দিন তোমার ফোন নম্বর চাইলাম? উফ, সে যে মনে মনে আমাকে কতটা সাহস জোগাতে হয়েছিল তুমি যদি জানতে! সটান গিয়ে বললাম, ‘হাই! পুজোর দিন সেই যে আলাপ হল, চিনতে পারছ? তোমার নম্বরটা পেতে পারি? আমরা তো একই কমপ্লেক্সে কাজ করি, কখনো দেখা হতে পারে।’ তুমি নিশ্চয়ই আশা করোনি আমি সোজা গিয়ে এরকম বলব, তাই বোধহয় ঘাবড়ে গিয়ে নম্বরটা দিয়েই দিয়েছিলে।

ফেসবুকে বিজয়া সম্মিলনীর একই ছবিতে কে যেন আমাদের দুজনকেই ট্যাগ করেছিল। ব্যাস, আমিও মওকা দেখে তোমাকে বন্ধুত্বের আহ্বান পাঠিয়ে দিলাম। মাঝে মাঝে টুকটাক হাই-হ্যালো চলছিল। কাজের চাপে তুমি কিনা জানিনা, তবে আমি বেশ কয়েকদিন জর্জরিত ছিলাম। তোমার খোঁজ নেওয়ার সময় পাইনি। তারপর একদিন তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হল, তোমার গলার আওয়াজটা – একটু ভারী, চাপা – শুনতে খুব ইচ্ছে হল। ফোন করে লাঞ্চের অ্যাপো করলাম। তুমি একবারেই রাজি হয়ে যাবে ভাবিনি জানো, আমিই একটু অবাক হয়ে গেছিলাম। লাঞ্চে গিয়ে বুকটা একটু দুরুদুরু করছিল, তুমি কী ভাববে, কী বলবে, সেসব ভেবে। তবে দেখলাম, লোকে বেশ ভুল বলে। তোমার সঙ্গে কী সহজেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। গল্প করতে করতে লাঞ্চের ঘড়ি পেরিয়ে বিকেল অব্দি চলে যাচ্ছিল প্রায়। আমি বোধহয় তোমার মুষ্টিমেয় বাঙালী বন্ধুদের একজন ছিলাম, না? তোমার তো অবশ্য বন্ধুসংখ্যাই গুটিকয় ছিল। চাপা স্বভাবের মানুষ, বেশি কথা বলতে পছন্দ করো না, বাজে কথা একটাও বলো না, নিজের সম্পর্কে খুউব কম কথা বলো – এরকম লোকের ‘বাঙালী’ বন্ধু থাকা বেশ চাপের। কন্সট্যান্ট বকবক না করে গেলে আর আড্ডা কীসের? আমরা দুজন অবশ্য এই নিয়মের খানিকটা বিপরীত স্বভাবের। মনে আছে, প্রায় রোজই এক বাসে বাড়ি ফিরতাম? মানে, যেদিন দুজনের ফেরার সময় কাছাকাছি হত, একে অপরের কাজ শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতাম, তারপর বাস ধরে যে যার বাড়ি।

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

ছবি এঁকেছেনঃ পার্থ মুখার্জী

আলাপ পর্বের মাঝেই ঝুপ করে শীতটা এসে গেছিল। যেদিন প্রথম বরফ পড়ল, হাঁ করে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গায়ে মাথায় বরফ মাখছিলাম। ঠিক মনে হচ্ছিল কেউ ঠান্ডা পেঁজা তুলো দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে। আর তুমি বাস স্টপে শেডের নীচে বসে হাসছিলে। বিশ্বাস করো, সে একটা দারুণ হাসি ছিল – মৃদু, অথচ স্পষ্ট, স্নেহময় – শুধু ঠোঁটে নয়, পুরো চোখেমুখে হাসি খেলা করছিল, যেন আমার কান্ড দেখে তুমি খুব মজা পাচ্ছিলে। কদিন পরে অফিসের সামনে ব্ল্যাক আইসের ওপর পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম, ভাগ্যিস তুমি হাতটা ধরেছিলে। খুব ভাল লেগেছিল, জানো। ভরসা পেয়েছিলাম অনেকটা। শক্ত করে হাতে হাত ধরে বাকি পথটা পেরিয়েছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিল যে তুমি আমাকে বন্ধু বলে মেনে নিয়েছ। তোমার চারপাশে গড়ে তোলা দেওয়ালের একটা হলেও ইঁট খসাতে পেরেছি আমি। যদিও বহু চেষ্টা করেও তোমার জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে পারিনি। নিবাস কলকাতা, পরিবার বলতে বাবা-মা আর চাকরি – এই পর্যন্তই বলেছিলে। কীসের যে তোমার এত নির্লিপ্তি, কেনই বা তুমি সবার থেকে আলাদা থাকো, কার জন্যে তুমি এত উদাসীন, সেসব কিছুই আমি জানতে পারিনি, রঙীন। ভেবেছিলাম আরেকটু সময়ে একসঙ্গে কাটালে হয়ত জানতে পারব। শহরে বরফ থাকলেও তোমার ভেতরের বরফ যে একটু একটু করে গলছিল সেটা বুঝতে পারছিলাম। এক সন্ধ্যায় তোমার কোথায় একটা পার্টি ছিল বলেছিলে। আমি রাত্রে খেয়ে উঠে শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছিলাম, তখন রাত্রি বারোটা হবে। বাইরে হু হু ঠান্ডা, বরফ পড়ছিল একটু একটু। হঠাৎ তুমি ফোন করে বললে আমার ফ্ল্যাটের সামনে গাড়িতে বসে আছ। অত রাত্রে, সত্যি বলতে কী, একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। আরো অদ্ভুত, তুমি বললে কোনো কারণে একটু ডিস্টার্বড আছ, আমি কি তোমার সঙ্গে একটু হাঁটতে যাব। অত ঠান্ডায় হাঁটাহাঁটির ইচ্ছে না থাকলেও তোমার গলায় একটা হালকা আর্তি শুনে নেমে এসেছিলাম।

কারণটা আমি আজও জানতে পারিনি, তুমি সেদিন বলোনি। তবে যাই হোক না কেন, মাঝরাত্রের সেই অদ্ভুত শীতার্ত পথচারিতা আমার চিরদিন মনে থাকবে। থোকা থোকা তাজা বরফের ওপর নীরবে, আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম দুজনে। তুমি শুধু বলেছিলে, ‘কী হয়েছে আমাকে জিজ্ঞ্যেস করো না প্লিজ। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটতে চাই, মনে হল তোমার চেয়ে ভাল সঙ্গী আর কেউ হবে না।’ আমি যথারীতি দু একবার পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম, সেই দেখে তুমি আবার আমার হাত ধরেছিলে, শক্ত করে অথচ পরম মমতায়। সেই রাত্রে কেউ আমাদের দেখলে ভাবত আমরা হয়ত সারাজীবনের পথ একসঙ্গে পার করব। কিন্তু তা তো হল না। তুমি যে কী ভাবতে, কী করতে, আমি কখনো বুঝতে পারিনি। ওই হণ্টনপর্বের পর কয়েকদিন তুমি একেবারে গায়েব ছিলে।  অফিস যাওয়া-আসার সময় বদলে ফেলেছিলে, হয়ত আমাকে অ্যাভয়েড করতে। বেশ কবার ফোন করলেও ধরোনি। প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি অসুস্থ হয়ত, কিন্তু তারপর দেখলাম দিব্যি ফেসবুক করছ অন্যদের সাথে। আমিও আহত বোধ করে আর ফোন করিনি অনেকদিন। আশ্চর্য্যভাবে তুমিও চুপচাপ ছিলে। একদিন ফেসবুকে অনলাইন দেখে ‘হাই’ বললাম, তুমি উত্তর দিলে, কিন্তু ওই ‘হ্যালো’ অব্দিই। কী অদ্ভুত, না?

এই জন্যেই অবাক হয়েছিলাম যখন তুমি ফোন করে ডিনারে ডাকলে, তাও তোমার বাড়িতে! ওখানকার লোকেদের মধ্যে কাউকেই বোধহয় তার আগে তোমার বাড়িতে ডাকোনি। আমি অনেকটা খুশি আর একটু অবাক হয়েছিলাম। মনে মনে অনেক কিছু ভেবে নিয়েছিলাম, হয়ত সেটাই তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্কের সূত্রপাত হতে পারত। সেই সন্ধ্যায় আমি একটু সেজেগুজেই গেছিলাম তোমার বাড়ি। হয়ত একটু বেশিই সেজে ফেলেছিলাম। তুমি দরজা খুলে আমাকে দেখে একটু চমকে গেছিলে, কী জানি একটু খুশিই হয়েছিলে কিনা। না বোধহয়, তাই না? কত কী রান্না করেছিলে আমার জন্যে। তখনও বুঝিনি কেন অত ঘটা করে ডেকেছিলে। বোকার মত ভেবেছিলাম হয়ত আমার জন্যেই অত আয়োজন করেছিলে, নিজের হাতে এটা সেটা রান্না করে। অত খাওয়া আর আড্ডার পরে বসে কফি খেতে খেতে তুমি বোমাটা ফেলেছিলে, একেবারে আমার মাথা ওপর। বলেছিলে তোমার এনগেজমেন্টের কথা। হ্যাঁ, আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই মুহুর্তটা। কলকাতায় তোমার বাগদত্তা আছে জেনে আমি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে ছিলাম। আমার চোখেমুখে আঘাতটা বোধহয় একেবারেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। তুমি একটু ইতস্তত করে আমার হাতের ওপর হাতটা রেখেছিলে। আর আমি তোমার সামনে অশ্রু বিসর্জনের ভয়ে নিজেকে এক্সকিউজ করে বাথরুমে চলে গেছিলাম। কয়েক মিনিটে নিজেকে সামলে এসে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছিলাম। সেদিন আঘাতটা খুব কড়া দিয়েছিলে, রঙীন। অত ভণিতা করে ডেকে খাইয়ে না বলে সোজাসুজি জানিয়ে দিতে পারতে। কিম্বা হয়ত পারতে না, তাই একটা মেকি ডিনার সাজিয়েছিলে। তোমার উদ্দেশ্য কিন্তু সফল হয়েছিল। আমি তোমার থেকে অনেক দূরে সরে গেছিলাম। বোকা ছিলাম হয়ত। হ্যাঁ, বোকা ছিলাম নিশ্চিত।

এখন ভাবলে বুঝি, রঙীন, কেন তুমি আমাকে আঘাত দিয়েছিলে, কেন দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে। ছোট গল্পেই শেষ করে দিয়েছিলে যাতে তোমার-আমার ব্যাপারটা উপন্যাস অব্দি না গড়াতে পারে। বুঝি, সবই। তবে এখন, এই যা। তখন বুঝলে হয়ত তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিতে পারতে। তোমার মনের দেওয়ালের যে ইঁটটুকু আমি খসিয়েছিলাম, সেটা তুমি নিপুণভাবে আবার জোড়া লাগিয়ে দিলে। এখন ভাবলে কষ্ট হয়, জানো।

আচ্ছা, অন্য কেউ কি আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে মাঝরাত্রে বরফের ওপর নিস্তব্ধে হেঁটেছে? উত্তরটা আমি জানি।

~ ইতি

Latest posts by প্রিয়াঙ্কা রায় ব্যানার্জী (see all)