২০১৫ অক্টোবর। শ্রী আবার দার্জিলিং এসেছে। এই নিয়ে কতবার হল? আগে বছরে একবার আসা প্রায় বাঁধাই ছিল। কখনও কখনও বা দু’বার? কোন ঠিক ঠিকানা নেই, হিসেব নেই।

শ্রী’র কাছে দার্জিলিং মানেই প্রেম, প্রেম মানেই দার্জিলিং। সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আইসক্রিম খাওয়া থেকে শুরু করে নতুন প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে পথ চলা অবধি দার্জিলিং মিশে আছে অগুনতি ভালো লাগায়। কখনও হট চকোলেটের চুমুকে, কখনও প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে বোর্বনের উষ্ণতায়। কখনও মেঘলা অভিমানে, কখনও ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘায়। শ্রী’র দার্জিলিং কখনও শেষ হয় না। এবারে যদিও সে এসেছে এক্কেবারে একা – তাও একটা কাজে। তবু জমিয়ে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে। কবি সাহিত্যিকরা কত লিখেছেন, শীত হল একাকীত্ব আর প্রেম উষ্ণতা। শ্রীর কাছে দার্জিলিং হল দুয়ের জমজমাট ককটেল। নিজেকে হারান, আবার নতুন খুঁজে পাওয়া। বয়সের সাথে সাথে প্রেমটা খুব দরকার।

এবারেও চাইলে যে সঙ্গে কোন না কোনও একজন প্রেমিককে সঙ্গে করে আনা যেত না তা কিন্তু নয়। একবার ঈশারা করলে অনেকেই রাজী হয়ে যেত। শ্রীর আশেপাশে প্রেমিকের একটা প্রচ্ছন্ন ভিড় লেগেই থাকে – অফিসে কলিগ হোক বা বস, পাড়ায় পথচলতি আলাপ হোক বা জিমে। কখনও লাইব্রেরীতে। এটা শ্রী সব সময়েই উপভোগ করে। ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে হেসেও ফেলে – একরকম মাতাল আর বে-হিসেবী বরটাকে সে আজকাল আর প্রেমিকের দলে ধরে না। যদিও পুষ্কর এমনিতে খুব গুনি ছেলে, কিন্তু ওরা রাগের কাছে দুনিয়া ঠাণ্ডা। আজকাল অবশ্য দুজনেই দুজনকে প্রচুর স্পেস দিয়ে চলে। দুনিয়ার অনেক রকম নিয়ম বদলাচ্ছে। বিয়ের রীতিনীতি এক থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর ইকুয়েশনটা অনেকটাই অন্যরকম। এই যে শ্রী একা একা যাচ্ছে, মা কি কখনও চাইলেও তা করতে পারত?

এবারে সে হোটেল বা গেস্ট হাউসে থাকবে না। অনেকেই এখন পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে হোম স্টে করছে। তাই যাওয়ার সময়টা ঠিক হতেই শ্রী সেদিন কাউচ সার্ফিং করা শুরু করেছে। তখন নতুন একটা ছেলে এসে মিষ্টি করে বলল – ‘একা যাচ্ছেন নাকি?’ শ্রী এক ঝলক তাকিয়ে দেখল ছেলেটা বেশ হ্যান্ড-সাম। চেহারায় একটা ঝকঝকে ভাব আছে।

‘একা কোথায়?’, শ্রীও হেসে শেরিল স্ট্যায়েডের ‘ওয়াইল্ড’ বইটা এগিয়ে দিয়েছিল।

ছেলেটা বইটা তুলে এক ঝলক দেখে বলল, ‘হাউ ওয়াইল্ড ইট ওয়াজ টু লেট ইট বি। শেরিল তো চুরানব্বই দিনের জন্য গেছিল, আপনি কদ্দিন?’

‘ট্রাস্ট মি – ভেরি ভেরি ওয়াইল্ড। তোমার নাম কি?’

‘অচিন্ত্য।’

‘নতুন এসেছ?’

‘হ্যাঁ’

‘এসেই সিনিয়রের সঙ্গে ফ্লার্ট করছ?’

‘জুনিয়ার ভাবলে ফ্লার্ট করছি না – এমনিই কথা বলছি। আর শেরিল নিজেও তো একা ছিল না – ছিল কি? ধরে নাও আমি গ্রেগ’

ইয়া দেভি

ইয়া দেভি

ভ্যানেসার বাড়িতে উঠে বিছানায় এলিয়ে পড়তে অচিন্ত্যর মুখটা মনে পড়ল শ্রী’র। ওর নামের মানে টা কি? শিব মনে হয়। জিজ্ঞেস করা হয় নি। চাইলে অচিন্ত্যই কি চলে আসত না?

‘কিরকম হবে যদি আমি নিজেকে ক্ষমা করে দিই? যদি আমি এমন কিছু করে থাকি যা আমার করা উচিত ছিল না? আমি যদি কাউকে ঠকিয়েও থাকি? যার জন্য হয়তো কোন অজুহাতই যথেষ্ট নয়, কিন্তু তাও শুধু নিজের ইচ্ছেয় এরকম করে থাকি, তখন?’ শেরিলের এক একটা কথা বড্ড মাথার মধ্যে বাজছে। বইটা বন্ধ করে এক কাপ চা চাইল ভ্যানেসার কাছে – একটা শিক্ষিত ঝকঝকে মেয়ে – ইস্কুল শেষ করে এখন দিব্যি হলিডে হোম চালাচ্ছে। ইন্টারনেট কত কি সহজ করে দিয়েছে। কত টুরিস্ট আনছে।

‘ম্যাল কত দূরে বল তো?’
‘এ বাবা – ম্যাল আর দূরে কোথায়? ঐ – তো দেখা যাচ্ছে’ বাড়ির পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ডানদিক দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে। ‘দেখতে পাচ্ছ না? ঐ যে ক্যাভেন্টার্সের ছাতাগুলো দেখা যাচ্ছে যে’

চায়ের পর অনেকটা ক্লান্তি দূর হয়েছে। পিঙ্ক টপ আর সবুজ ট্রাউজারের সঙ্গে মাথায় একটা সাদা উলেন টুপি আর ডেনিম জ্যাকেট চড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্রী। প্রাইমারি কালার ওর খুব ভালো লাগে – পুষ্করের লাগে না। এই নিয়ে আগে কত কথা কাটাকাটি হয়েছে। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগে শেরিল, একটা জলের বোতল আর একটা স্কেচ-বুক। শ্রী যদিও খুব একটা ভালো ছবি আঁকতে পারে না – তবু তার আঁকতে ভীষণ ইচ্ছে করে। কখনও পেন্সিল, কখনও চারকোল। আঁকতে গিয়ে হাতে ভুসোকালি। এবারের ছুটিতে সে যা খুশি করবে। সারাটা দিন একা একা ঘুরে কেটে গেল। মাঝখানে একটা অল্পবয়সী মারাঠি ছেলের এসে আলাপ করল, ‘হাই, আমি অর্জুন।’
‘শ্রী’
‘একা একা ঘুরছ দেখে মনে হল – আমরা কি আর এক কাপ কফি খেতে পারি?’
‘শিওর – তুমিও একা বুঝি?’
‘হ্যাঁ – এক্কেবারে হ্যাপি গো লাকি – পাহাড় আমাকে খুব টানে। এদিক ওদিক মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি।’
‘আর মুম্বাই?’
অনেকদিন শ্রী মুম্বাই যায় নি। নতুন সিনেমা, নতুন ফ্যাশন এইসব নিয়ে অর্জুন কার্লেকারের সাথে কথা বলতে বলতে অনেকটা সময় কেটে গেল। এর মধ্যে বাড়ি থেকে ফোন। একবার তো বসের মেসেজ – ‘ডেড-লাইন মনে আছে তো?’ শ্রী রিপ্লাই করল, ‘উঁহু’। ছুটির মজাটা মাটি করতে কিছু লোক এক্কেবারে ওস্তাদ।

পুরনো ইস্কুলের পাড়া, তিব্বতি মুখোশের দোকান, লতানে গোলাপ দেখতে দেখতে শ্রী ভাবছিল – এখানে আর কটা দিন থেকে গেল হত না? আবার সোমবার সকালেই এই পাহাড় থেকে নামতে হবে? আবার সেই ধুলো, ধোঁয়া, ট্রাফিক, কলকাতা। হাঁপিয়ে ওঠা। দুটো ঘোড়াকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হল একটা স্কেচ করে ফেলে। কিন্তু করা গেল না। পাহাড়ে, জঙ্গলে একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেছে শ্রী – সন্ধ্যেটা নামে যেন ঝুপ করে। একটা বাচ্চা ছেলে এসে ঘোড়া-দুটোকে টানতে টানতে নিয়ে গেল।

বাড়ির দিকে না ফিরে একটু উলটো রাস্তা নিলো শ্রী। ম্যাল থেকে অন্য দিকের যে রাস্তাটা ওপরে উঠেছে আস্তাবলের পাশ দিয়ে। দুটো মেয়ে পিঠে ঝুড়ি নিয়ে উঠছে, একজনের কোলে আবার একটা বাচ্চা। পাহাড়ি মেয়েরা কত পরিশ্রমী হয় – ভাবতে ভাবতে বাচ্চাটার দিকে একটু এগিয়ে গিয়েছিল শ্রী – যদি একবার কোলে নেওয়া যায়। কি ভীষণ কিউট বাচ্চাটা।

হঠাৎ প্রায় অন্ধকার ভেদ করে এসে দাঁড়াল তিনজন। দুজনকে না চিনলেও একজনের মুখটা চেনা বেরিয়ে গেল। ইন্টারপোলের ফাইলে একটাই ছবিই আছে লোকটার – হিরণ্য। একদিকে সুয়েভ, অন্যদিকে স্যাটান – কখনও হাতে না আসার মত ধুরন্ধর ক্রিমিনাল। খুব ধারাল একটা হাসি হাসল সে, ‘একা একা ঘুরতে এলেন ম্যাম – তাও আবার এরকম ফাঁকা রাস্তাটাই বেছে নিলেন? খাদটা দেখেছেন তো? এখন কি হবে বলুন তো?’

শ্রী একবার ঘাড় কাত করে খাদটা দেখল। ঢালু রাস্তা থেকে খাদটা বেশ গভীরই লাগে। অচেনা প্রেমিকের চোখ যেন, অতল। শ্রী অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে দেখে দৈত্যের মত একটা লোক ছুটে এলো। শ্রী হালকা করে বসে গিয়ে পা’টা চালাল ডানদিকে – লোকটা মালাইচাকিতে। অত প্রকাণ্ড চেহারার মানুষটা এরকম আর্তনাদ করবে শ্রী ভাবেনি। বাচ্চাটা সেই শুনে ভয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে।

ধুপ ধুপ করে দুটো শব্দ হল। মারাঠি ছেলেটার বয়স কম হলে কি হবে, শার্প শুটার হিসেবে দারুণ তো? খুব অবাক হয়ে হিরণ্য হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়েছে ততক্ষণে, আস্তে আস্তে হাত দুটো তুলছে মাথার ওপরে। একটু শ্রাগ করল শ্রী, ‘সরি ডার্লিং, প্ল্যানড মিশন ছিল – আই হ্যাড টু লোয়ার মাই গার্ড। ক্রাউচ সার্ফিং, নো গান – স্কেচ-বুক, কফি – এভরিথিং ওয়াজ প্ল্যান্ড। অ্যারেস্ট করার অর্ডার নেই’। চুলের মধ্যে একটা তিনকোনা কাঁটা ছিল, ততক্ষণে নির্ভুল লক্ষ্যে বিঁধে গেছে হিরণ্যর কাঁধে। সবচেয়ে কম রক্তক্ষরণে মৃত্যু।

আস্তে আস্তে ভিড় হতে শুরু করেছে। বসকে মেসেজ করা হয়ে গেছে শ্রী’র। লোকাল এসআই এসে পড়ার আগে তার মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাটাকে একটু কোলে নিলো শ্রী, ‘ওমা ভয় করেছে বুঝি? ভয় যদি কখনও তোমাকে পেয়ে বসে, তাহলে জানবে তোমার আর কোনও যাওয়ার জায়গা নেই। তুমি ছোট – এখন থেকেই তোমাকে ঠিক করতে হবে তোমার গল্পে ভয় বলে কিছু থাকবে, কি থাকবে না।’

কথা বলতে বলতে কখন সে শ্রী থেকে শেরিল হয়ে গেছে, খেয়াল ছিল না। দু-তিন জন লোকাল পুলিশ এসে স্যালুট করে কাজ করা শুরু করেছে। অর্জুন হাঁটতে হাঁটতে আসছে ওর রাইফেলটা নিয়ে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পাহাড়ের ঢালটাকে আবার লক্ষ্য করছিল শ্রী। এখন আর অতটা গভীর লাগছিল না। সেই অন্ধকারেই দূরে কোথাও দেবীপক্ষ শুরু হচ্ছিল।

Fear, to a great extent, is born of a story we tell ourselves, and so I chose to tell myself a different story from the one women are told. I decided I was safe. I was strong. I was brave. Nothing could vanquish me.

Latest posts by অভ্র পাল (see all)