আগের পর্ব


তৃতীয় পর্ব – খাকি ও মোলায়েম ক্যাম্বেল

এই গল্পের শুরু অনেকদিন আগে। ক্লাস নাইনে জীবনবিজ্ঞানের টিউশন পড়তে যেতাম পাড়াতেই এক মাস্টারমশাইয়ের কাছে। তিনি পড়াতেনও খুব ভালো এবং স্বীকার না করলে খুবই অন্যায় হবে কারন উনি না থাকলে ব্যাঙ, মাছি, টিকিটিকির খপ্পরে প্রায় অপাংক্তেয় ঐরকম সাবজেক্টটা  পুরোপুরিই অস্পৃশ্য হয়ে যেত (যা কিনা পরবর্তীকালে এক সময় হয়েও ছিল)। যাইহোক, হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না – মাস্টারমশাই যতটাই ভালো পড়াতেন, তাঁর জাঁদরেল গিন্নী ততোধিক নির্দয়-ভাবে আমাদের কিষ্কিন্ধ্যা-বাহিনীকে কাঁচকলা প্রদান করতেন – ‘এত জোরে কথা কিসের?’ ‘চটিতে কাদা কিসের?’ ‘এত সাইকেল কেন – আমার বাড়ি কি সাইকেল দোকান নাকি?’ ফলে ঐ বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যা হয় আর কি, অচিরেই ওনার একটা ডাকনাম খুব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল আমাদের মধ্যে – খাকি ক্যাম্বেল, অর্থাৎ কিনা যে ক্যাম্বেল খ্যাঁক খ্যাঁক করে। বোধহয় তৎপুরুষ সমাস (হবেও বা)।

যাই হোক, অনেক দিন কেটে গেছে ঐ ঘটনার পরে। দিল্লীতে কর্মজীবনের শুরুতে বুঝলাম সব ম্যানেজার এক একটি মূর্তিমান খাকি ক্যাম্বেল। সোজা কথা, ভালো কথা, মিষ্টি কথা – এসব ঐ জাতটার ডিকশনারিতেই নেই। আগের পর্বে সেই ঘটনা কিছুটা বলেছি, আর পরেও ঘুরে ফিরে আসবে, কিন্তু আমার মনে হয় আদপে তা নিষ্প্রয়োজন। পেশাদার জীবনে সকলেই খাকি ক্যাম্বেল স্বরূপ ম্যানেজারের মুখোমুখি হয়েইছেন কোন না কোন ভাবে। যাই হোক, গল্পটা শোলের কয়েনের মত না – এর অন্য পিঠও একটা আছে, ঘুরেফিরে সেখানেই আসব।

আজকাল অবশ্য দিনকাল বদলেছে – পরিশ্রমের মূল্য কিছুটা হলেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে প্রজেক্ট ম্যানেজারদের সেই দেমাক আর নেই। আজকাল তাদের উলটো এই ভয়ে থাকতে হয় যে তাদের দলের ছেলেমেয়েরা যেন কিছুটা অন্তত কথা শুনে চলে বা তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে, ‘বাবা বাছা’ করে যেন কাজটা উদ্ধার করে নেওয়া যায়। আজকাল যেসব প্রজেক্ট ম্যানেজারদের বকাবকি করতে দেখি, মনে হয় তারাও সেই কাজটা খুব কনভিনসিংলি করে উঠতে পারেন না।

খাকি ক্যাম্বেল কি করে? খ্যাক খ্যাক করে সবসময়।

আমি যে প্রজেক্ট চালাই সেখানেও কয়েকজনের কথা বলা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে, তবে যাতে বাড়িতে ঢিল টিল না পড়ে সেইজন্য ধরে নেওয়া যাক ওদের নাম তর্ক, রুদ্ধ আর হুমকি। ভাবছেন এ আবার কিরকম নাম? ওটা স্ব-ভাবজনিত। তর্কর সব ভালো – কেবল ঐ এক দোষ, কথায় কথায় তর্ক করা। রুদ্ধ এমনিতে খুব চাপা কিন্তু কোনরকমে বোতলের ছিপি খুললেই ভেতর থেকে আবেগ ভসভসিয়ে ওঠে আর রুদ্ধ ব্যাটম্যান হয়ে যায়। আর হুমকি? হুমকি কোন ছেলের নাম নয় বললে কি ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের মত এই গল্পেও দারতাঁয়ার মত আছে আরেকজন, কিন্তু যেহেতু সে কিনা সরাসরি আমার মাস্কেটিয়ার বাহিনীর সদস্য নয়, তাই তাকে এযাত্রা বাদ দিচ্ছি।

যাইহোক, এই মাস্কেটিয়ারদের প্রতাপ একচেটিয়া। তর্ককে একটা কাজ দিয়ে জিজ্ঞেস করা হল – ‘কদ্দিন লাগবে রে?’
তর্ক মুখ গম্ভীর করে বললে, ‘উইথ মোটিভেশন এক সপ্তা, উইদাউট মোটিভেশন তিন’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’
‘মানেটা সিম্পল – একটা সুন্দর দেখতে মেয়েকে প্রজেক্টে নিয়ে এস। কাজটা পাঁচদিনে নইলে কুড়ি দিন লাগবে।’
‘কি আশ্চর্য – এই তো তিন সপ্তা বললি – সেটা কুড়ি দিন হল কি করে?’
‘কেন? আমাকে এত বকালে, তার একটা এফর্ট নেই?’

এই তো গেল তর্কর কথা। এর মধ্যে একদিন আমার কাছে রুদ্ধ এসে হাজির – ‘আমার বিয়ে হতে পারে’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তো?’
‘তোমার কাছে কল যাবে – জিজ্ঞেস করবে আমি কেমন ছেলে। সব ভালো ভালো বলবে, বোতলের কথা বলেছ তো প্রজেক্ট কিন্তু লাটে উঠবে।’
আমি ঢোক গিলে বললাম, ‘আচ্ছা’
যাওয়ার আগে রুদ্ধ বলল, ‘আর হ্যাঁ তর্ক বলছিল তুমি নাকি প্রজেক্টে নতুন রিসোর্স আনছো? ফটোওয়ালা সিভি চাই, আগেই বলে দিলাম কিন্তু – নইলে নেওয়া যাবে না!’ এই বলে সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে রওনা দিল।

আর হুমকি-দেবী একদিন আমার ডেস্কে এসে বললে, ‘এই অডিটের লিস্টে তর্কর নামটা ঢোকাও তো’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেন? ওর নাম তো নেই?’
‘তাতে কি – মালটা সবসময় বড় বড় কথা বলে কিন্তু এদিকে ফাট্টু। ওর নামটা ফলসলি ঢুকিয়ে দাও তো, একটু হুড়কো দিয়ে আসি। কদিন আগে অফিসে একটা ভিডিও দেখতে গিয়ে ধরা পড়েছিল মনে নেই? আজকে ব্যাটাকে কেস দেবই।’ এই বলে যেমন ঝড়ের মত সে এসেছিল, তেমনি বেরিয়েও গেল। আর সব শুনে, তালেগোলে যাকে বলে, ‘অ্যান্টেনার ওপর তিনটে কাক – আমি তো অবাক’ কেস। কিন্তু প্রজেক্ট ম্যানেজারকে এরকম মাথায় হাত দিয়ে বসলে তো চলবে না – সঞ্জীব-বাবু পথ প্রদর্শক। উনি বলে গিয়েছেন – ‘পিছনে উত্তপ্ত চাটু, মাথায় আইসব্যাগ’। আমিও সেই আপ্তবাক্যকে স্মরণ করে কাজে নেমে পড়লাম।

যখন খাকি ক্যাম্বেল প্রজাতির এক এক নমুনা দেখে আমি ক্লান্ত তখন আমার জীবন আলো করে আসেন এক নতুন টিম লিড। তিনি আদপে বাঙালি না হলেও বাঙালি বরের দৌলতে বেশ কিউট বাংলা শিখে গিয়েছিলেন। আমি যখন ভাবছি নতুন ম্যানেজার – না জানি কেমন হবে, তখনই হঠাৎ একদিন উনি সোজা এসে আমার ডেস্কে উঠে পড়ে, পায়ের ওপর পা তুলে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘এই তুমি টেস্ট স্ট্র্যাটেজিটা আমাকে প্রথম থেকে বোঝাও তো?’ বলতে নেই, ভদ্রমহিলা ডাকসাইটে সুন্দরীও ছিলেন। তখন ভয় পাব কি পাব না এই নিয়ে থতমত খাচ্ছি, এর মধ্যে টেস্ট স্ট্র্যাটেজি পুরো মাখনের মত নেমে গেল। সেদিন বুঝলাম, মোলায়েম ক্যাম্বেলও একটা নতুন প্রজাতি। দাবাং তো হল এই সেদিন, কিন্তু ‘থাপ্পড় সে ডর নেহি লাগতা, প্যার সে লাগতা হ্যায়’ – এই নিদেন উনি আমাকে দিয়ে গেছেন প্রায় এক দশক আগে। রুদ্ধর ফোনটা এলো শনিবার – ঠাকুর পেন্নাম করে প্রায় সৎপাত্র উগরে দিলাম। তর্কর নামটা অডিটের লিস্টে তখনই ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম – আর মুখ ফসকে বলেও ফেলেছিলাম যে এটা মক অডিট। যদিও ঐ ফসকানো টুকুই ছিল ক্যালকুলেটেড। আর নতুন রিসোর্স – এক বন্ধুকে ফোন করে বললাম, ‘হ্যাঁ রে ঐ প্রজাপতি প্রজাপতি দেখতে মেয়েটা এখনও আছে তোর টিমে? আমার প্রজেক্টে একদিনের জন্য পাঠা না – আমাদের ডেভেলপাররা একটু কনসাল্ট করবে’

যাই হোক, ম্যানেজমেন্টের কোন কাজই সোজাসাপ্টা নয় – মোদ্দা কথাটা হল সাপও মরবে লাঠিও ভাংবে না। মুখে যাই বলি না কেন, মনে মনে এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই তর্ক, রুদ্ধ আর হুমকির মত তুখোড় ছেলেমেয়েদের দলে না পেলে আমার কেন, দুনিয়ার কোন প্রজেক্টই চলবে না। দুনিয়ার সব তালা আলাদা, আর চাবিও। কাজেই আপনি ওল্ড স্কুল হয়ে নিজের চারপাশে দেওয়াল তুলবেন, না সবার মধ্যে নেমে মাখনের মত মিশে চাবিটা খুলে রাখবেন, সেটা পুরোপুরি আপনার ওপর। আর হ্যাঁ, ঢিল ছুঁড়তে চাইলে, নিচে কমেন্টবক্স রইল।


Latest posts by অভ্র পাল (see all)