মেলামেলি

নরম নীল আকাশ। তাতে কিছু মেঘ একে অপরের পিছু ধাওয়া করেছে। কেউবা ধীরে ধীরে নিজেকে বড় করে চলেছে। আবার কেউ তাদের আধো আধো হাত দিয়ে নরম নীল রংকে এক মনে আবিষ্কার করে চলেছে। এরই মধ্যে, রোদ কখনো চড়া গলায়, কখনো ফিসফিস করে সময় জানিয়ে চলেছে।

অন্যদিকে, নিমর্লা গাছের ছাওয়ায় বসে গরম গরম রুটি আর তরকারি বানাচ্ছে। আর, ওর ছেলেরা ওকে ঘিরে কেউ খেলছে, কেউবা পড়ছে, কেউ বা ওকে সাহায্য করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর ওর ঘরওয়ালে, কখনো শক্ত গলায়, কখনো নরম সুরে তদারকি করে যাচ্ছে। মাটির ভেতরেও একই ভাব। তার প্রকাশ ছোট বড় নানান মাপের ধানের ক্ষেতের হালকা, গাড় রকমারি সবুজে। সেখানেও গুটিকয়েক চাষীর কড়া – হালকা নজরদারী চলছে।

আকাশ, নিমর্লা, ক্ষেত – এক ছন্দে আবদ্ধ। হাওয়ার মিষ্টি গলার গানই আসলে স্বর্গ মর্ত্য পাতালকে এক ছন্দে বেঁধে কোন স্বপ্ন রাজ্যে নিয়ে হাজির করেছে।

এমন অনেক সকাল দুপুরের অপেক্ষায় ছিলাম। চারপাশের সবাই যখন ট্রেন বাসের ভীড় ঠেলে অফিস কাছাড়ির ব্যাস্ততায় গলা পযর্ন্ত ডুবে, তখন আমার এই মেলামেলির খেলায় গা ভাসিয়ে দেওয়া সকলের যে যথেষ্ট হিংসের কারণ, তা আমি নিশ্চিত। আমি নিরুপায়। আমার ক্ষিদে তেষ্টা পাওয়ার মতই ভাবনা পায়।

স্বর্গ মর্ত্য পাতালের মধ্যে মিল পেয়ে যখন আনন্দে মশগুল তখন কে যেন দুটি ঘটনা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল। সুতো ছিঁড়ে সব মিলগুলো আবার এলোমেলো হয়ে গেল। নিমর্লা ফোনে জানাল, ও আজ আসতে পারবে না। কারণ জানতে আমায় বারান্দায় যেতে বলে। দেখলাম, ওর টিনের ঝুপড়ি ভাঙা হচ্ছে। জলের পাইপ যাবে ওখান দিয়ে। তোমরা থাকবে, খাবে কোথায়? বলল, এত জিনিস নিয়ে আর কোথায় যাবো? দুদিন লাগবে, তারপর ওরাই নাকি ঝুপড়ি বানিয়ে দেবে, কোথায় ও জানে না। আগের জায়গাতেও হতে পারে। ওরা যখন তড়িঘড়ি রান্না করে খেয়ে নিচ্ছিল বাড়ি ছাড়তে হবে বলে, আমি তখন ন’তলার বারান্দা থেকে স্বর্গ মর্ত্য পাতালের মিল খুঁজছিলাম।

১৭ নং টেগোর টেম্পল রোড, শ্যামনগর – বিয়ের পর আমার প্রথম বাড়ি। প্রথম ভাড়া বাড়ি। চারটে ঘর। খাওয়ার জায়গা থেকে গঙ্গা দেখা যেত। সেখানে সব থেকে ছোট ঘরটা আমার। নতুন জীবনের অপরিণত দশার সাথে বেশ মানানসই ছিল। ঘরের রংও ছিল সবুজ।

বাড়ীওয়ালা প্রোমোটারকে বিক্রি করে দেওয়ায় আমাদের বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে তা ছেড়ে দিতে হয়। প্রাপ্য টাকার সামান্য অংশই পাওয়া গিয়েছিল। ছেড়ে দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই বাড়িটা মিলিয়ে যায়। এখন সেখানে নতুন ফ্ল্যাট। কেমন যেন জেল খানার আদলে বানানো।

এখনও মনে আছে খাওয়ার টেবিলে কে কোন দিকে বসত। রবিবার বাবা আর ও দুজনে মিলে বাজারে যেত, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম। বাবা বাজার থেকে ফিরে কী কী কিনেছে না জানালে পারকিনসন’স রোগে শয্যাশায়ী মা’র অভিমান সামলানো মুশকিল হত। বাবাকে একবার সরি বলতে বলায়, দুই ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে ফোকলা দাঁতে মিষ্টি হেসে সুর করে বলেছিল, “সরি, আমার লম্বা দাঁড়ি!” মা অনেক কষ্টে অভিমান সরিয়ে রেখে ওষুধ খেতে বাধ্য হত। জল ঘড়ি ধরে আসত, কিন্তু কাজে ফাঁকি দিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যেত। ফলে, সকালে উঠেই জল ধরার জন্য দৌড়দৌড়ি। জল ধরার ট্রেনিং কিছুটা অবশ্য বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলাম।

আমার ঐ বাড়ির স্মৃতির বয়স ছয় মাস। কিন্তু বাড়ির বাকি সদস্যদের প্রায় বত্রিশ তেত্রিশ বছরের স্মৃতি। মান অভিমান মাখা দেয়ালগুলো আজ অদৃশ্য। বাবাও নেই। মা’র অভিমান ধীরে ধীরে ভ্রমের পর্যায়ে ঠেকেছে। আমরাও আজকাল একে অপরের খুঁতের প্রতি আগের থেকে বেশী সহনশীল। সেই ছোট সবুজ ঘরটা মনের মধ্যে জানলা দরজা খুলে স্মৃতির হাওয়া খেয়ে কখন কাঁদে কখন হাসে।

নিমর্লাকে জিজ্ঞেস করলাম যদি কোন সাহায্য লাগে বলো। বললো, ব্যাস তোমার “দুয়া” আমার সাথে আছে। বাকিটা তো “নসিব”। যার যার কপালে যা ভোগান্তি আছে, তাকে তা ভুগতেই হবে। তুমি কী করবে বল? কথাটা শোনার পর মনে হল আবার আমি যেন মিল খুঁজে পেলাম। পরিবারকে ওর জাপটে থাকার আনন্দ, মেঘেদেরকে জড়িয়ে থাকা নরম নীল আকাশের আরাম, মাটির ওপর ভরসা করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় ধান গাছ আর ভাল খারাপ স্মৃতি আঁকড়ানো সেই সবুজ ঘর আবারও মিলেমিশে একাকার।

পূর্ণা
২৭/০৭/২০১৫
গ্রেটার নয়ডা।।

Latest posts by পূর্ণা মুখার্জী (see all)