আগের পর্ব


দ্বিতীয় পর্ব  – বোঝেনা,  সে বোঝে না

সত্যি বলতে কি প্রথম লেখাটার পরে যে বাড়িতে ঢিল পড়েনি বা অফিসে দু একটা চড় থাপ্পড় পড়েনি – এতে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম। শীল যে কিনা নিত্য মুগুর ভাঁজে – অটো-ওয়ালাকে প্যাঁদায়, সে কি আর এত বড় মস্করা সহ্য করতে পারে? আশ্চর্যের বিষয় এসবের কোনটাই হয়নি – উলটে এই লেখা বেরনোর পরের দিন যখন অফিসে পৌঁছেছি, ততক্ষণে দেখি রীতিমত হইচই পড়ে গেছে আর সেই ঠেলায় শীলও বন্ড নামে প্রায় বিখ্যাত হয়ে গেছে। যারা লুকিয়ে চুরিয়ে রিসেপশনিস্টকে দেখত, তারাও বিড়ম্বনায় পড়ে গেছে – পাছে আমি কখনও তাদের নিয়ে গল্প লিখে ফেলি। শীলের নানা রকম কীর্তিকলাপ আমার কানে আস্তে শুরু করেছে – যাতে অন্য কোনোদিকে না তাকিয়ে আমি দ্বিতীয় পর্বটাও ওকে নিয়েই লিখি। যেমন বন্ড নাকি জানে প্রজেক্টে কোন মেয়ের কোথায় ট্যাটু আছে, যার গার্ল-ফ্রেন্ড নেই, তার বন্ড আছে এইসব। তা বন্ড যতই কালটিভেট করার মত চরিত্র হোক না কেন, আমাদের তো লক্ষ্য হারালে চলবে না। আমরা কথা শুরু করেছি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। সেই নিয়ে আজকে আমাদের দ্বিতীয় পর্ব। গোড়া থেকে আরম্ভ করা যাক।

অনেকদিন আগের কথা, বছর দশেক হবে – আমি তখন দিল্লীতে। সেই সময়ের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ছবির মত ভাসে। বুঝিয়ে বললে আপনারাও মিল খুঁজে পেয়ে যেতে পারেন শ্রীকান্তর ছোটবেলায় মেজদাদার কাছে পড়তে বসার দৃশ্যটির সাথে। ঠিক সেইরকমই একটা ছোট্ট ঘর। সেখানে দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসি আমরা – একদল ছেলেমেয়ে যারা সদ্য সদ্য কলেজ পাশ করে ইন্টার্নশিপ জাতীয় কাজে বহাল হয়েছি সেন্ট্রাল দিল্লীর এক ধুদ্ধুড়ে সরকারি আপিসে আর মাঝখানে প্রজেক্ট আলো করে বসে আছেন ছোট খাটো সফেদ হাতীর মত এক বিহারী প্রজেক্ট ম্যানেজার। মাফ করবেন, জাতি বৈষম্য করার জন্য নয় – তবুও আমার আইটি কর্মজীবনের ঐ প্রথম প্রজেক্ট ম্যানেজারকে আর কোন বিশেষণে অভিভূত করতে পারলাম না।

Illustration - P2 - Hati o jangia - small

তখনও তো জানি না প্রজেক্ট ম্যানেজার কি চিজ – খালি দেখি ওনার কাজ বলতে ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে বসে এক কৌটো ফল খাওয়া আর মাঝে মাঝে ছাতে উঠে গিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়া। তবে কিনা হ্যাঁ একটা কাজ তিনি খুব মন দিয়ে করতেন তা হল চোখ গুলি গুলি করে দেখা আমরা কে কি কাজ করছি, থুড়ি আদৌ কোন কাজ করছি কিনা। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে – একদিন বসে বসে মিনিট খানেক ঘুমিয়ে পড়ে যেএসপি প্রোগ্রামের গুষ্টির তুষ্টি করেছি – উনি ধরতেই পারেন নি। পারবেন কি করে? কলেজ জীবনের কল্যাণে ততদিনে ঘোড়ার মত সোজা ঘুমনো অভ্যেস হয়ে গেছে আর তার ওপর সেদিন দুটো আঙুল থেকে গিয়েছিল কিবোর্ডের ওপরে, ব্যস আর যায় কোথা। ভুড়ভুড়িয়ে কিবোর্ডে থেকে এবিসিডি উঠে পাতা ভরাচ্ছে, আর ওদিকে দারোয়ান ম্যানেজারও খুশ যে ছেলে মন দিয়ে কাজ করছে।

এরই মধ্যে একদিন আমাকে দিয়ে ভাগ্নের কলেজের অ্যাসাইনমেন্ট করিয়ে নিলেন, কখনও বা হেড অফিস থেকে কাগজ-কলম-সিডি এইসব ষ্টেশনারী আনানর কাজ। তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না চাকরিটা সফটওয়্যারের না চাপরাশির – এমন সময়ে একদিন ক্লায়েন্টের জেনারেল ম্যানেজার ডেকে পাঠালেন। ইয়ে মানে আমাকে নয় – আমার মাধ্যমে বড় সাহেবকে। আমার ম্যানেজার আসতেই উনি গলা খ্যাঁকারি দিয়ে আরম্ভ করলেন – ‘কি পেয়েছেন কি আপনারা, অ্যাঁ? বলি এটা কোন রিপোর্ট হয়েছে? কিস্যু হয়নি, কি চেয়েছিলাম – আর এ কি সফটওয়্যার বানিয়েছেন মশাই আপনারা। ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা’। মাথা নাড়তে নাড়তে আরও কয়েকটা ‘ছ্যা’ হয়তো বলতেন, কিন্তু এর মধ্যেই আমার বস মাঠে নেমে পড়লেন। সোজা ডান পায়ের প্যান্ট কোন রকমে হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে বাবা গো মা গো করতে শুরু করে দিলেন – ‘দো দিন পেহলে পাটনা গায়া হুয়া থা, স্টেশন মে গির গয়া। আভি ভি দুখ রাহা হ্যায়’। ব্যস আর কি, সবাই প্রজেক্ট ছেড়ে হাঁটু নিয়ে পড়ল। মক্কেল জাতে হরিয়ানি তো কি হয়েছে, ইনিও তো বিহারি। যাকে বলে কিনা এক্কেবারে রাজযোটক – ঠিক যেন বুনো ওল বাঘা তেঁতুল কম্বিনেশন। আমাদের ঘরে ফিরে আসার পরে চোখ টিপে বললেন, ‘কেমন দিলুম?’ আমি তো থ। এই হচ্ছে কর্মজীবনে আমার দেখা প্রথম প্রজেক্ট ম্যানেজার।

কথায় বলে না মর্নিং শোজ দ্য ডে? দিল্লীর সেই প্রজেক্টের পর দেশ বিদেশ অনেক ঘুরেছি, অনেক প্রজেক্ট ম্যানেজার খপ্পরে পড়েছি। কেউ বাজার করিয়েছেন কেউ বা ঐ বাজার করানোটাই কেবল বাকি রেখেছেন। একের পর এক ম্যানেজার গেছেন, এসেছেন – কিন্তু একটা জায়গায় সব্বাই সমান। যখনই তেনাদের কাছে গিয়ে কিছু বোঝানর সময় হয়েছে, প্রায় সক্কলেই ঐ হাঁটু অবধি কাপড় তুলে (বা না তুলে) – ‘আমি তো কলা খাইনা’ গোছের একটা ভাব দেখিয়েছেন। সেদিন বুঝিনি, আজ বুঝি ঐ প্রথম দিনে সেই বিহারি ভদ্রলোকটি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বিদ্যার পরম দিব্যজ্ঞানটি আমাকে কিভাবে দিয়ে গিয়েছেন – “হাতীকে জাঙিয়া পরাইবেন না বা পরাইবার চেষ্টাও করিবেন না। কেবল জাঙিয়া হাতে লইয়া হাতির চারপাশে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করিয়াই যাত্রা সম্পন্ন করিবেন।”

গল্প আরও স্টকে আছে। ঢিল পড়ে বাড়ির কাঁচ টাচ না ভাঙলে আরও কয়েকটা শোনান যাবে এখন। আর এইসব গপ্প শুনতে হলে আমার কাছেই আসতে হবে। আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ – বড় বড় ম্যানেজমেন্ট ইস্কুলের খবর খুব একট জানি না – শুধু এত বছর ধরে ভুল ত্রুটি নিজের চোখে দেখে দেখে এইটাই বলতে পারি যে কিভাবে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট করবেন না। যাইহোক, আপাতত নটেগাছটি এখানেই মুড়োচ্ছি। আশা করি আবার দেখা হবে।


Latest posts by অভ্র পাল (see all)