আগের পর্ব

কোলকাতার চলচ্চিত্র জগতে, এর পরের পরিবর্তন যা এলো, তা হল আজকের ডিজিটাল ব্যবস্থা। সবটাই এক সাথে ডিজিটাল হয়ে যায়নি। ফিল্ম অর্থাৎ সেলুলয়েড চলে যেতে আরও কয়েক বছর সময় নিয়েছে। প্রথম ডিজিটাইজ্‌ড হয় এডিটিং এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডাবিংও।

ফিল্মের এডিটিং ঘর ছিল বিশাল মাপের। এডিটিং মেশিন স্টেনবেক ছিল যন্ত্রপাতি লাগানো ছ-সাত ফুটের একটা টেবিলের মত। সঙ্গে ফিল্ম, সাউন্ড, এফেক্টস এসব নিয়ে ক্যান এর সংখ্যা থাকত কম করে তিরিশ থেকে চল্লিশটা। কোনও সময় আরও বেশী। সেই এডিটিং ঘর হয়ে গেল ঘুপচি মত। কয়েকখানা টিভি মনিটর আর কি বোর্ড ও মাউস। হার্ড ডিস্কে ঢুকে গেল সম্পূর্ণ ছবির রাশ। এই ছোট্ট ঘরেই সঙ্গীত বসানো, এফেক্টস বসানো, সব হয়ে যায় এখন।

সঙ্গীত গ্রহণের জন্যে অবশ্য মিউজিক স্টুডিওর ব্যবহার এখনও আছে। তবে, সঙ্গীতের কোন যন্ত্র না ব্যবহার করেও সঙ্গীত সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে কম্পিউটারে। ডাবিং এর জন্যে আর সিনেমা হলের মত বড় স্ক্রিনের দরকার রইল না। টিভি মনিটর’এর সামনে বসেই অভিনেতা সংলাপ বলে মিলিয়ে দিচ্ছেন।

এর পর সেলুলয়েডের ব্যবহারও চলে গেল। ডিজিটাল ক্যামেরা এসে গেল বাজারে। ফিল্মকে সরালেও তার রেজোলিউশন, আজও কোন ডিজিটাল ক্যামেরা দিতে পারেনি। চেষ্টা চলছে।

২০১৫ তে শুনলাম ভারতবর্ষের সব ফিল্ম ল্যাবরেটরিগুলি নাকি বন্ধ হয়ে গেল। ফিল্মে আর ছবি তৈরিই হবে না। কোডাক কোম্পানি নাকি দেউলিয়া ঘোষণা করেছে নিজেদের।

অনেক সুবিধেও হল। ফিল্ম অপচয়ের ভয়ে দৃশ্য গ্রহণের সময় অনেক সতর্ক থাকতে হত। অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও আরও ভালো শট থেকে পরিচালককে বিরত থাকতে হত। এখন ডিজিটাল হওয়াতে যত ইচ্ছে দৃশ্য গ্রহণ করা যায়। ছবি তৈরির নতুন সংজ্ঞা তৈরি হতে শুরু করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় ভারী ক্যামেরা নিয়ে কাজ করা কষ্টকর ছিল। কোন কোন জায়গায় অসম্ভব ছিল। এখন সেখানে অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের ডিজিটাল ক্যামেরা অনায়াসেই জায়গা করে নিয়েছে। কাজের সুবিধে করে দিয়েছে।

ক্ল্যাপ বোর্ড নিয়ে কিছু কথা বলব বলেছিলাম, এই বার বলি। ক্ল্যাপ বোর্ড কেন ব্যবহার হয়, সে তো আগেই বলেছি। আবার বলছে, একটা শটকে পরিচিতি দেবার জন্যে, তার নাম ঠিকানা দেবার জন্যে, এই ক্ল্যাপ বোর্ডের ব্যবহার। শব্দ মেলানোর জন্যেও এর ব্যবহার অনস্বীকার্য।

ক্ল্যাপ বোর্ডটি হয় পাতলা বোর্ড দিয়ে তৈরি। চওড়া কাঠের পটি থাকে চারপাশে। আর ওপরের পটির সঙ্গে কব্জা দিয়ে আর একটি সরু পটি লাগিয়ে রাখা হয়। কব্জাটি এক দিকে লাগানো হয়, ফলে পটিটিকে ওপরে তোলা যায়। নিচে নামাবার সময় মূল ক্ল্যাপের পটিতে তোলা পটিটির ওপর এসে পড়লে ঠক করে শব্দ হয়। এই শব্দটিকেই ধরে সম্পাদনার কাজ এগোয়, শব্দের সঙ্গে ছবিকে মেলানো হয়।

এই ক্ল্যাপ বোর্ডের একদম ওপরে লেখা থাকে প্রোডাকশনের নাম। তারপর বড় করে ছবির নাম লেখা থাকে। তারপর লেখা থাকে তার পরিচালকের নাম। তারপর লেখা থাকে চিত্রগ্রাহকের নাম। দৃশ্যটি দিনের না রাতের তার উল্লেখ থাকে ক্ল্যাপ বোর্ডে। কত নম্বর ক্যান এ নেওয়া হচ্ছে তার নম্বর লেখা থাকত ক্ল্যাপ বোর্ডে। এখন আর সেটি থাকে না। কারণ ডিজিটাল’এ ক্যান বলে কোন বস্তু নেই। আছে চিপ আর ক্লিপ নম্বর। সেটা ক্ল্যাপ বোর্ডে লেখা যায় না। তা লেখা হয় কন্টিনিউটি বইয়ে।

মূলত: যে কটি জিনিষ লেখা থাকে তা হল, দৃশ্য নম্বর, তার ভাগ ও কত নম্বর গ্রহণ অর্থাৎ টেক। যেমন একটি দৃশ্যের  নম্বর যদি ২৪ হয়, আর সেই দৃশ্যের পঞ্চম শট নিতে যাই, তবে আমায় ক্ল্যাপ বোর্ডে লিখতে হবে, 24/5/1। ২৪ নম্বর দৃশ্য, পঞ্চম নম্বর শট এবং প্রথম টেক। দ্বিতীয় টেক নেবার সময় লিখতে হবে, 24/5/2, এই রকম।

যদি আমি প্রথম দৃশ্যের প্রথম শট প্রথমে গ্রহণ করি, তবে তার ক্ল্যাপ বোর্ড দেখতে হবে 1/1/1 এবং C1. প্রথম দৃশ্য, প্রথম শট, প্রথম টেক বা গ্রহণ। আর C1  মানে ক্যান ওয়ান। 1/1/1  ছবি তৈরির যে কোন সময়েই সম্ভব। কিন্তু তার সঙ্গে C1  হতে পারে তখনই যখন ওই শটটি ছবি তৈরির শুরুতেই গ্রহণ করা হয়।

এমন অবস্থা আমার চলচ্চিত্র জীবনে দুবার ঘটেছে। প্রথমবার ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবির সময়। তার প্রথম দৃশ্য প্রথম শট দিয়েই ছবি তৈরি শুরু হয়েছিল। আর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ‘খেলা’ ছবিতে। সেখানেও প্রথমে প্রথম দৃশ্যের প্রথম শট গ্রহণ করা হয়েছিল। এই ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ এটি খুবই বিরল অভিজ্ঞতা। সাধারনত ছবির শুটিং’এ এমন ঘটনা খুবই কম সময় ঘটে।

আমার চলচ্চিত্র জীবনের প্রথম পর্বে আমি কারিগরি আলোচনাই বেশী করলাম। তার কারণ এই যে পরিবর্তন এর মধ্যে মধ্যে দিয়ে আমি বা আমার সময়ের টেকনিশিয়ান বন্ধুরা যেতে পেরেছেন, এটি বিরল অভিজ্ঞতা। আমরা পুরনো, নতুন, দুই প্রান্তই ছুঁয়ে আছি।

আমার এই লেখার এই ‘অ আ এবং ই ঈ’ পর্ব এখানেই শেষ। এবার আসবে উ ঊ।