tiktikir_lyaj

যারা ভেবেছিল আপদ বিদেয় হল তাদের মুখে সম্মিলিত ছাই ও নুড়ো জ্বেলে পাড়া দিয়ে গটগটিয়ে হেঁটে গিয়ে পুরনো চেনা “সর্বকর্মকার” বোর্ড টাঙ্গানো দর্মার দোকানটার ঝাঁপ তুলল রতন। এযাবৎ বাপ ছিল বলে তার বাপের নামেই লোকে দোকানটাকে চিনত। মুখে মুখে নাম ছিল ডোমের দোকান। কে বা কারা কেন এই ডোম নামখানা পিতৃদত্ত নামের আগে বসিয়েছিল তা রতনের বাপও জানতো না বোধহয়, কিন্তু তার তাতে আপত্তি ছিল না।

দিন বাপ ছেলের কেটে যেত যথাসর্বস্ব সেলাই-ফোঁড়াই, রিপু করে। ছাতা থেকে জুতো, কিছুই বাদ ছিল না। ইদানীং রতন রেডিওর কাজ শিখে এসে আরও দুপয়সা বেশী ঘরে তুলছিল। রতনের মা সেই কোনকালে কোন মোটরওলা না লরিওলার সাথে পালানোর পর থেকে ঘরে মেয়ে না থাকায় এইবার সেইসব ব্যাপার একটু করে মনে ধরছিল রতনের বাপের।

কিন্তু পতাকা সেসব জানতো না। পতাকা পাড়ার হোমরা-স্থানীয়। পতাকা তোলা, ল্যাম্পপোস্টের গায়ে বাঁধা কিংবা মেরে পতাকার মতো করে লটকে দেওয়ার কারণেই হয়তো সবাই তাকে পতাকা বলে চেনে। সামনে কী ডাকে বলা মুশকিল অবশ্য। সে যাই হোক, এক শনিবারের বারবেলায় রতনের বাপের পেট ফাঁক করে দুপুরের আধ-হজম খাবারের শেষটুকু খোঁজার সময় পতাকা জানতো না যে রতনের বাপের স্বপ্নগুলোও সে একসাথে ড্রেনে ভাসিয়ে দিল।

পতাকার কল্যাণে রতন বাদে বাঁশে কাঁধ দেবার কেউ ছিল না বলে বাঁশ ছেড়ে রতন দড়ি বেঁধে টেনে এনে বাপকে পোড়াল। তারপর সে আধপোড়া চ্যালার মুখের আগুন নিয়ে লাগালো পতাকার গায়ে। পতাকা তখন নেশায় বুঁদ হয়ে ঢুলছিল।

সেই থেকে শুরু হল এক মাথা চাড়া দেবার লড়াই। মাটি কেঁপে উঠলে যেমন হাজার হাজার কেঁচো একসাথে মাটি ফুঁড়ে এ ওর ঘাড়ে উঠে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে আসার চেষ্টা করে, খানিকটা তেমন।

এই ওঠানামার লড়াইয়ে রতন যে কী করে থাকতে পারে তা কেউ না বুঝলেও রতন ছিল। মঞ্চের পাশে, আলো খোলার কাজে, এমনকী বিশেষ সব রাতপাহারার পার্টিতেও। যারা তখন তার দোকানে আসতো, তারা ক্রমশঃ তাকে ‘তুমি’ বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেলো। বাকি আরও অনেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিত না।

তারা সবাই বারান্দায় ভিড় জমালো যখন কেউ কানাঘুষো শুনল নাকি রতনের ঘরের দখল নেবার চেষ্টায় বাসমালিক এবং নির্বাচিত নেতা বোসবাবু রতনকে গুম করেছেন। গুম বলতে ঠিক কী তা সবাই সবার মতো ভেবে নিল এবং ছাতা ও রেডিওর মালিকরা আগের চেয়ে বেশী মজবুত ও দামী জিনি্স কিনে আনতে বেরোলেন। কদিন পর বোসবাবুর মাথা ছ্যাঁচা লাশ খুঁজে পেয়ে তাঁদের সেই কেনার সার্থকতা উপলব্ধ হল।

ডোম বা তার ছেলে রতনের ” সর্বকর্মকার” সেই থেকে এযাবৎ দর্শনীয় এক বস্তু হিসেবে পাড়ার ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। মুখে মুখে রতনের মতো আপদ যে বিদেয় হয়েছে সে কথা ছড়াতে ছড়াতে কানের ওপারটুকুর অব্দি মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল।

————————————————————————————————————————————-

 

সে হেন রতন যে আবার ফিরবে এবং ফিরেই দোকান খুলবে সে কথা নিশ্চিত কেউ ভাবেনি। ভাবলেও এই মুহূর্তে তাদের বলার কিছু ছিল না। এযাবৎ বোসবাবুর মড়া পাবার পর অনেক হাওয়া বদলেছে, তাই যে সব গুণগ্রাহী ছিল তাদের দৌড় থেমেছিল বিকেলের আড্ডায় চা আর সন্ধ্যের আগে বাড়ির দরজার ফাঁকে সেঁধিয়ে যাবার মধ্যে।

রতনকে দোকান খুলতে দেখে যারা আশ্চর্য হয়েছিল তারা আরও আশ্চর্য হল যখন নির্বিকার মুখে একরাশ ছাতা বের করে রতন সেলাই করতে বসার কিছু পরে একখানি মেয়েলোক এসে তার বোঁচকা খুলে অভ্যস্ত হাতে টুকটাক সেলাই করতে বসে পড়ল ঠিক পাশটিতেই। রতন না হয় ছোটলোক, কিন্তু এতদিন এই ভদ্দর পাড়ায় কাজ করে একটু সম্ভ্রমবোধ নেই — এই কথাখানা কানে কানে রতন অব্দি পৌঁছতে বড়োজোর লাগলো বোধহয় মিনিট দশেক। যদিও খুব কিছু বদলালো না তারপরেও।

তো, তারপর মোটামুটি আবার বেশ অভ্যাস হয়ে গেলো। দু একজন দায়ে পড়া গোছের ভদ্রলোক নেহাত বাদলা দিনে পুরনো সম্বন্ধীর কথা তুলে রতনের হাতে ছাতাটা, পুরনো রবারের জুতোটা আবার তুলে দিতে লাগলেন। মোট কথা, পুরনো গৎ যা ছিল তাই ফিরে আসার লক্ষণ দেখা দিল।

এবং ঘুরে ফিরে সেই শনিও এসে চাপলেন। শোনা গেলো নাকি স্থানীয় পার্টিঅফিস রতনের ঘরখানি চেয়েছে। তারা বদলে রতনকে অন্য এক জায়গায় ঘর করে দেবে। এই খবর শুনে যারা আগের ইতিহাস জানতো তারা ঘুরে ফিরে যেতে যেতে আড়চোখে রতনকে দেখে গেলো। রতন কাউকে দেখল না। সে তার ছাতা, জুতো আড় দোকান নিয়ে যেমন ব্যস্ত তেমনই রইল।

শনিবারের বারবেলায় হল এক কাণ্ড। পার্টির লোকজন নাকি রতনকে বলে রেখেছিল। কিন্তু একগুঁয়ে রতন হ্যাঁ বলতে বলতেও নাকি বেঁকে বসেছে। রাস্তার ধারে মোড়ের ঠিক মাথায় দোকানখানা। অন্যপাশে ব্যবস্থা পার্টি করেছে কিন্তু সেখানে যাবে না ডোমের পো! লোকের দুপুরের ঘুম ভাঙল রতন এবং স্থানীয় নেতার যৌথ চিৎকারে। রতনকে বৃহত্তর স্বার্থ বোঝাতে ব্যর্থ নেতা আস্তিন গুটিয়ে নেমেছেন। জুতোসেলাই না জানলেও তিনিও কিছু কম যান না সেটা ডোমের পো কে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে।

দেখতে দেখতে হাত পড়ল রতনের আনা সেই মেয়েলোকটির গায়ে। এবং সেলাই হওয়া ও না হওয়া জুতোর সশব্দ চুম্বনে নেতার মুখ লাল হয়ে উঠলো। ক্লাইমেক্সে বেমক্কা একটা পুলিশের গাড়ি আসায় যারা শেষটুকু মিস করে গেলেন তাঁদের জন্য– মেয়েটি বিস্রস্ত অবস্থায় রাস্তার এককোণে দৌড়ে গেলো ভিড় ঠেলে এবং তারপর সেখান থেকে তাকে আর দেখা গেলো না। রতন উঠলো পুলিশের জিপে এবং বেওয়ারিশ হয়ে গেলো।

——————————————————————————————————————————

 

মোড়ের মাথায় পার্টি অফিস উঠে আসেনি। স্বপক্ষ ও বিপক্ষ দলাদলিতে নামলে বসে বসে ক্লান্ত হয়ে পড়া নির্দলও কখনও কখনও নাম বাগিয়ে ধাম খোঁজার চেষ্টায় আসরে নামেন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দর্মার দোকানের দুখানি দেওয়াল ও নাম-লেখা টিনটুকু ছাড়া আর বেশী কিছু বাকি থাকে না। পথচলতি সবাই দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যেতে শেখেন আবার যতক্ষণ না হঠাৎ একদিন পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে একটা মেয়েলোক আসে এবং সেই দেওয়াল-দুটোর মাঝে বসে পড়ে সবার অলক্ষ্যে।

যারা দেখতে দেখতে পেরিয়ে যায় তারা প্রশ্ন চেপে রেখে ক্রমশঃ অম্বল বাড়ায়। যারা সেটুকু চাপতে পারে না তারা এগিয়ে আসে, জেনে নেয় নামধাম, ঘর-ঠিকানা। রতনের নাম শুনে এবং পোঁটলার মধ্যে মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠা একটা সজীব পিণ্ড দেখে তাদের কেউ কেউ বলে ফেলে- “বাঁচবে তো?… সাবধানে রেখো বাপু…”

মেয়েটি হাসে। হেসে হেসে বলে, “জিয়েছে, জিয়েছে… বাদ মে তুমাদের কাটবে বাবুসাব”… বলতে বলতে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। তারপর থেমে গিয়ে একসময় তুলে নেয় বুকের কাছে — দুধ দেবে।।

Latest posts by তপব্রত মুখার্জী (see all)