বাংলার নবাবী আমলের কোনো ইতিহাস লেখা এখন খুবই মুশকিল। ১৮৯৫ সাল থেকেই অক্ষয় কুমার মৈত্রয় ( মৈত্র) সাধনা এবং ভারতী পত্রিকায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখছিলেন।

পরে তিনি সিরাজদ্দৌলা নামেই একটা বই লেখেন  ওই প্রবন্ধ গুলি থেকে পরিমার্জিত ও পরিবর্দ্ধন করে । ১৯০২ সালে সেটা প্রকাশিত হয় ।

image002

সেই সময় বাবু জানকী নাথ পাণ্ডেকে একটি চিঠি দেন- তথ্যের জন্য। তখন উত্তর আসে :-

“There is little or no record of SherajuDowla’s time in the Nizamut office now.”

Babu Janaki Nath Pandey, B.A. Private Secretary to H.H. the Nawab Amir-ul-Dowla of Murshidabad, the Palace, the 23rd October 1895

নিজামতের ( সরকারী দপ্তর) প্রায় সব দলিলই ইংরেজরা নিয়ে গেছিল, বিলেতে আর সেগুলোর পাঠোদ্ধার একরকম অসম্ভব , কারণ এতই জরাজীর্ণ অবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে । ইচ্ছে করেই এসব মূল্যবান দলিলের এই অবস্থা করা হয়েছিল ।

The Office of Indian Records being unfortunately in a damp situation, the ink is daily fading, and the paper mouldering into dust- Preface to Stewart’s History of Bengal, 1813.

১৮১৩ সালেই যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তবে ২০১৫ তে কী অবস্থা হয়ে আছে, দুর্ভাগ্যবশত সেটা কেউ জানে না । তাই সেকালের ইংরেজ আর মুসলমান লেখকদের বই গুলোই ভরসা ।  কিন্তু পর্তুগীজ, ওলন্দাজ ( ডাচ), ফরাসীরা ঠিককীলিখে গেছেন, সেগুলোও দুষ্প্রাপ্য বা একেবারেই বিলুপ্ত ।

মুসলমান ঐতিহাসিকদের মধ্যে সৈয়দ গোলাম হোসেনের – সায়র- উল- মুতক্ষরীণ” ।  গোলাম হোসেন সলেমীর – “ রিয়াজ উস্ সলাতিন”, এবং সৈয়দ আলীর –“তারিখ- ই- মন্ সুরী” এই সব ফার্সী ভাষায় লেখা বই বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । “মুতক্ষরীণ” ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দে লেখা হয় ।  হাজী মুস্তফা নামে এক ফার্সী পণ্ডিত প্রথমে এর ইংরেজী অনুবাদ করেন । আবার মুশকিল হলো- এই অনুবাদে হাজী সাহেব তাঁর নিজের করা টীকা এর সাথে যুক্ত করেছিলেন । ওয়ারেন হেষ্টিংসের প্রাইভেট সেক্রেটারী জোনাথন স্কট – এই বইয়ের  আরেকটা ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশ করে । লক্ষ্ণৌ নিবাসী মুন্সী নওল কিশোরও একটা উর্দু অনুবাদ করেছিলেন । মুস্তাফা সায়েবের অনুবাদ বা নওলকিশোরের অনুবাদ মূল  বইয়ের ঠিক অনুবাদ হলেও জোনাথন স্কটের ইংরেজী অনুবাদ, কতখানি সঠিক, সে ব্যাপারে সেই সময় অনেক বিতর্ক হয়েছিল বলে জানতে পারা যায় ।

মূল বই আর অনুবাদ গুলো এখন প্রায় বিলুপ্তই বলা যায় । “রিয়াজউস্সলাতিন” ১৭৮৮ থেকে ১৭৮৯ য়ের মধ্যে লেখা হলেও এর কোনো অনুবাদ হয়নি বলেই জানা গেছে বলে অক্ষয় কুমার মৈত্রয় বলে গেছেন। যদিও এটাও বলেছেন তখন এটা এসিয়াটিক সোসাইটির যত্নে ছাপা হচ্ছে আর বাংলা অনুবাদ করার চেষ্টাও চলছিল । সৈয়দ আলীর –“তারিখ- ই- মন্সুরী” অপেক্ষাকৃত আধুনিক বই হলেও এর কোনো অনুবাদ হয়েছে বলে জানা নেই ।

ইংরেজদের লেখা আবার দু ভাগে বিভক্ত । কিছু প্রকাশিত, আর কিছু অপ্রকাশিত ।হাতে লেখা অপ্রকাশিত লেখাগুলো ব্রিটিশ মিউজিয়ামের হেষ্টিংস দপ্তরে ছিল । প্রকাশিত লেখাগুলোও এখন প্রায় নেই বললেই চলে । সমসাময়িক প্রকাশিত লেখা গুলো আবার তিনটে শ্রেণীতে ভাগ করা ।

১ । রীতিমত ইতিহাস

২ ।  রাজকীয় দপ্তর

৩ । ছোট ছোট বই

রীতিমত ইতিহাসের মধ্যে-অর্মি বলে এক লেখকের “ ইন্দোস্থান” বইটি সর্বশ্রেষ্ঠ বলে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় অভিমত প্রকাশ করেছিলেন বইতে । লেখক বহুদিন ধরে বাঙলায় আর মাদ্রাজে ( এখন চেন্নাই) থেকে সমসাময়িক রাজপুরুষদের সাহায্যে এই বিরাট ইতিহাসটি সংকলন করে লিখেছিলেন ।পরবর্তী ইংরেজ লেখকরা এই অর্মির “ ইন্দোস্থান”  বই থেকেই  প্রচুর সাহায্য নিয়েছিলেন ।

রাজকীয় দপ্তরের অনেক কাগজ পত্র, দলিল দস্তাবেজ  সংগ্রহ ও একজায়গায় করে পাদরী লং সায়েব একটা বই বের করলে- পার্লিয়ামেন্টারি কমিটি একটা  বড় রিপোর্ট বের করেছিল । এই ইন্দোস্থান আর পাদরী লংয়ের বই দুটোতেই তত্বকথা বেশী ছিল । ছোটো ছোটো বই যে কত বেরিয়েছিল তা ইয়ত্বাহীন । এদের মধ্যে- হলওয়েল, স্ক্রাফটন,  আইভ্সের  লেখা উল্লেখযোগ্য কারণ- এরা সেই  দুটো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল কোনো না কোনো ভাবে আর প্রত্যক্ষদর্শী তো বটেই ।

এই সব পুরোনো বইগুলো বহু বিতর্কপূর্ণ তথ্যতে ভরা । কারো বর্ণনার সাথে কারোরই ঠিক ভাবে মেলে না । তাই অনেকের ইচ্ছে থাকলেও আসল ইতিহাস বের করা বেশ কষ্টসাধ্য তো বটেই আর নির্ভুল হবার সম্ভাবনাও বেশ কম ।

পূর্ববর্তীরাই যেটা করতে পারেননি, সেখানে আমার মত এক সখের লেখক পারবে- এটা আশা করাই বাতুলতা , এমন কী আমার পক্ষেও । তবু, একটা চেষ্টা থাকবে আমার তরফ থেকে  সব বাধা যতটা পারি কাটিয়ে উঠে আপনাদের কাছে এক তথ্যনির্ভর ইতিহাস তুলে ধরা ।

একটা কথা :- সিরাজের কলঙ্কের কথা সবাই জানেন, কিন্তু কলঙ্ক তৈরি করার ইতিহাস যা লেখা হয়েছে , সেই ইতিহাস আমরা কতটা জানি ? এটাও মনে রাখা দরকার- ইতিহাস সত্যের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে । সেই সত্য আমরা কতটা জানি ?

একটা অপ্রিয় সত্য কথা না বলে পারছি না ! হিন্দুরা / ইংরেজরা, সিরাজকে  যতটা কলঙ্কের ভাগীদার করেছে, মুসলমানরাও একই ভাবে সিরাজকে কলঙ্ক মুক্ত করতে চেয়েছে । এটা ভুললে চলবে না- চতুর ইংরেজ এই সব নিয়ে দারুণ চালাকির সাথে খেলার ফলেই আমাদের কয়েকটা ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে । মুসলমানরা ভেবেছে- মুসলমান শাসকদের তাড়ানোর জন্য হিন্দুরা দায়ী আর হিন্দুরা ভেবেছে – যা শত্রু পরে পরে । এদিকে – ইংরেজরা, নেপো হয়ে দই খেয়ে গিয়েছে ।

আমরা যদি যুক্তিপূর্ণ ভাবে, ভাবতে চেষ্টা করি- তা হলে দেখবো, সিরাজ কলঙ্ক দুটো শ্রেণীতে ভাগ করা যায় ।

১ । প্রাচীন

২ । আধুনিক

আবার এগুলোও দুভাবে ভাগ করা যায় ।

১ । লিখিত

২ । অলিখিত

পুরোনো লিখিত কলঙ্ক খুবই কম আর ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ । অলিখিত কলঙ্কের সীমা নেই এবং এখনও কলঙ্ক গুলো নানা ভাবে জন্মাচ্ছে । ঐতিহাসিকরা এগুলোর প্রশ্রয় দিয়েছেন আর তার ফলে- আমরা এখনও সিরাজের নামে ভুরু কুঁচকাই বা তাচ্ছিল্যের সাথে উড়িয়ে দেই ।  তাই-  আমাদের একজনের নাম করতেই হবে । এই সায়েব ছিলেন – স্কটিশ ।

নাম – হেনরী বেভারীজ (১৮৩৭-১৯২৯)। মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন আমলা-ঐতিহাসিক প্রগতিশীল ধারণা নিয়ে ভারতের ইতিহাস চর্চা করেছেন, হেনরী বেভারীজ তাদের অন্যতম। বাংলার বহু জেলাতেই তিনি ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছিলেন । তাঁর বাবার লেখা :-Comprehensive History of India ( লণ্ডন, ১৮৫৮-৬২) পড়ে-বেভারীজের মধ্যে ভারতের ইতিহাস ও জনগণ সম্বন্ধে বিশেষ আগ্রহ জন্মায়।পরবর্তী কর্মজীবনে ভারতে থাকার সময়ে এবং অবসর জীবনে এ বিষয়ের ওপর তিনি বিরামহীনভাবে লিখে যান।বহুভাষা শেখার প্রবণতাও তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।

তিনি সিরাজ সম্বন্ধে বহু তথ্য সংগ্রহ করে একটা কথা বলেছিলেন:-“Shirajuddaulah was more unfortunate than wicked” (Shirajuddaulah বানান  অপরিবর্তিত)। অনেকের মনে হতে পারে- এটা সরল সিদ্ধান্ত, কিন্তু  আসল সত্যটা এখানেই লুকিয়ে রয়েছে ।

+++++++++

তথ্যঋণ :- সিরাজদ্দৌলা , অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় , ১৯০২ ।

+++++++++

(চলবে)

Latest posts by রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল (see all)