হোম-অফিস হওয়ার মজা হল, রোজ রাস্তায় বেরতে হয়না। অফিস টাইমের ভীড়, ঘামের গন্ধ ভরা বাস, হঠাৎ থেমে যাওয়া মেট্রো রেল , অটোরিকশা বা ট্যাক্সি স্ট্রাইক, কিছু নিয়েই খুব একটা মাথা ঘামাতে হয়না। কিন্তু এর একটা কুফল ও আছে। মাঝেমধ্যে কাজের চক্করে বেরোতে হলে পুরো ঘেমে-নেয়ে-কেস-খেয়ে একশা কান্ড। তার মধ্যে যদি আবার বৃষ্টি পড়ে, ঝড় ওঠে বা মিটিং-মিছিল থাকে, তাহলে তো হয়েই গেল। আমি পুরো, ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘ক্লু-লেস’ সেটাই হয়ে যাই। তখন আমাকে দেখে কে বলবে এই আমি লোকাল ট্রেনে ডেলি-পাষন্ডগিরিও করেছি। এই তো গত সপ্তাহে অনেকদিন পরে কাজে বেরোতে হয়েছিল। দুপুর বেলা মেট্রো করে পার্ক স্ট্রীটে নেমে, ওপরে উঠে  দেখি বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে আবার ফোনটা কাজ করা বন্ধ করে দিল। আমি একগাদা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে, বহুদিনে অনভ্যাসের ফলে পার্ক স্ট্রীটে মেট্রোর মুখ কোন দিকে খোলে, সেটা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে, মাথার ওপর ছাতা খুলে, উলটো বাগে হাঁটা লাগালাম, আর ভাবতে থাকলাম- একি! মোড় থেকে স্টেশনের মুখ এত দূরে ??  প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে বুঝতে পারলাম আমি কি কেলোটাই না করেছি। অগত্যা, আবার পেছন ফিরে হাঁটা লাগাতে হল।

তো গতকালও আবার যেতে হল। এবার আর ভুল হয়নি। সারা দুপুর এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরিতে একটা কাজ সেরে, চারটে বাজার একটু পরে যখন বেরোলাম, তখন বাইরে আকাশ জুড়ে প্রচুর তর্জন-গর্জন চলছে। একটু বেশি পড়াশোনা করলে আমার আবার খুব খিদে পেয়ে যায়, তাই, বেরিয়েই মনে হল কিছু খাই, কিছু খাই , আর ভাবতে ভাবতেই হাঁটা দিলাম  দুই পা দূরে ‘হট কাটি রোলের’ উদ্দেশ্যে।  সেখানে একখানা এগ রোল হাতে নিয়ে সবে দু-কামড় দিয়েছি কি দিইনি, তেড়েফুঁড়ে নেমে এল বৃষ্টি।  দোকানের শেডের নিচে আমরা জনা পাঁচেক মানুষ দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে আমাকে নিয়ে তিন জন খুব মন দিয়ে রোল খাচ্ছে। বাকিরা আশ্রয় নিয়েছে। একসময়ে এমন উলটো পালটা হাওয়া দিল যে আমাদের আধখাওয়া রোলই ধারাস্নানে সিক্ত হওয়ার অবস্থা। আমি ব্যাগ থেকে হাতাটা বার করে পাশের ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে বললাম- খুলে দাঁড়ান, সবার মাথা বাঁচবে। তাতে তিনি যারপরনাই বিগলিত হয়ে -” আমি এইটাই বলব ভাবছিলাম, আজকালকার দিনে সবাইকে তো সব কিছু বলা যায়না, কে কি ভাবে নেবে …”ইত্যাদি বলতে বলতে  এক হাতে ছাতা ধরে অন্য হাতে রোলে কামড় দিলেন। আমাদের সামনে শুকনো মুখে আরেকটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তাকে বললাম, আপনিই বরং ছাতাটা ধরুন, আপনি সামনে আছেন।  সে-ও যথেষ্ট খুশি হয়ে ছাতা ধরল। আমরা বাকিরা আবার মন দিয়ে রোল খেতে লাগলাম।

Mahaswetaএদিকে বৃষ্টি তো পড়েই চলেছে। আকাশ ঘোলাটে মেঘে ঢাকা। রাস্তাঘাটা মোটামুটি সাদা হয়ে গেছে। দ্রুত বেড়ে চলেছে রাস্তার দুধারের জমা জলের পরিমাণ। নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তায় এটা সাব্যস্ত হল যে, এই বৃষ্টি সহজে থামবে না, ঘন্টাখানেক চলবে ইত্যাদি…। আমি ততক্ষণে ট্যাক্সি ধরব ভাবছি। গন্তব্য বেশি দূর নয়, এল্‌গিন রোড। কিন্তু ফাঁকা ট্যাক্সি আর আসেই না। বেশ খানিক্ষণ অপেক্ষা করার পরে একটা ফাঁকা ট্যাক্সি হাঁকাহাঁকি শুনে দাঁড়াল। আমি পাশের ছেলেটির থেকে আমার ছাতাটা চেয়ে নিয়ে ফুট পাথ ছেড়ে রাস্তায় নামলাম। গন্তব্য বলতেই বয়স্ক ড্রাইভার মশাই রাজি ! কিমাশ্চর্যম! এক লাফে গাড়িতে উঠে বসতে বসতে এতক্ষণ  দাঁড়িয়ে যাদের সাথে আবহাওয়া নিয়ে গভীর আলোচনা করছিলাম, তাদের আর বাই-বাই বলা হল না। গাড়ি আর দোকানের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াল পরপর বসানো দুটি ইলেকট্রিক কানেকশন বক্স।

গাড়ি ছেড়ে চালকমশাই ঘোষণা করলেন যে তিনি আমাকে গাড়িতে তুললেন, কারণ, আমি ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর আমার কাছে ছাতা আছে। অর্থাৎ আমি অন্য অনেকের মত ভিজে জুব্বুস হয়ে যাইনি ! ফলে তাঁর গাড়ির সীটের কাপড়ের কভার নষ্ট হবেনা ! বোঝ কান্ড ! কত হিসেবনিকেশ। বললেন- এতক্ষণ কত লোক হাত দেখাল, পুরা পুরা ভিজে আছে, তাই হামি থামিনি। হামার গাড়ির সীট ভিগে গেলে সুখাবে কি করে…? শুনে আমি মন্তব্য করলাম- সত্যিই তো, আপনার তো অসুবিধাই হবে অমন হলে…লোকে যে কেন বর্ষাকালে ছাতা ছাড়া বেরোয়…”,

এক কথায় উত্তর এল – “ফেসান্‌ !”

এলগিন রোডের কাজ শেষ করে যখন বেরোলাম, সেখানেও ফুটপাথ আর রাস্তার মাঝের অংশ জলে ভরপুর। বৃষ্টি খানিক ধরেছে। গড়িয়াহাটা আসব বলে আরেক ট্যাক্সি থামালাম। সেখানে ড্রাইভার ওঠার আগেই শর্ত দিলেন, গড়িয়াহাট যাব, কিন্তু পথে জল থাকলে নেমে যেতে হবে, সে যেখানেই থাকুক, সে জায়গা গড়িয়াহাট থেকে যতদূরেই হোক। কারণ গাড়িকে জেনে বুঝে জলে ঢুকিয়ে তারপরে গুচ্ছ টাকা খরচা করতে তিনি রাজি নন। সৌভাগ্যক্রমে, এদিকে সেরকম জল না থাকায় তিনি আমাকে শেষে মোড়েই নামালেন।

তার পরের পর্বটা মোটামুটি সহজ। অটোস্ট্যান্ডে বেশ খানিক্ষণ অধীর হয়ে অপেক্ষা করে, আধভেজা হয়ে, শেষে আমাদের বাহন দেখা দিলে, তাতে চেপে, প্রতি দুই মিনিট অন্তর জ্যামে আটকে, আধা ঘন্টার রাস্তা প্রায় এক ঘন্টায় পাড়ি দিয়ে বাড়ির কাছাকাছি আসা। বাকি রাস্তাটা হেঁটেই মেরে দেওয়া যেত, কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে জামাকাপড় ততক্ষণে বেশ ভারি, হাতেও অনেক ব্যাগ, তাই প্লাস্টিক ঢাকা রিকশা চেপে অবশেষে গৃহে প্রত্যাবর্তন।

বাড়ি ফিরে  গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে পড়ল ছাত্রজীবনের কথা। আমার প্রথম কলকাতার বৃষ্টির অভিজ্ঞতা। সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছি। তখনো বালিগঞ্জে মামার বাড়ি থেকে উওরে বেথুনে পড়তে যাই রোজ। ২৪০ নম্বর বাসে চেপে। কোন এক ভয়ানক বৃষ্টির দিনে, কি কারণে যেন ২৪০ না চেপে অন্য কোন একটা বাসে চেপেছিলাম ( সম্ভবত ৩সি/১)। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। বাসের সবকটা কাঠের জানলা বন্ধ, খোলা দরজা দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, সে শুধুই সাদা জল। বাস কোন পথ দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সত্যি বালিগঞ্জে যাচ্ছে কিনা কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে মনে একটু ভয় করছে। সাহস শুধু দুটো, সময়টা শেষ বিকেল, দিনের আলো রয়েছে, আর বাসে অনেক লোক। পথ হারিয়ে গেলেও কেউ না কেউ ঠিক বলে দেবে। সেদিন পথ যেন আর শেষ হচ্ছিল না। কতক্ষণ পরে মনে নেই,  কন্ডাক্টরের মুখে ‘রাসবিহারি-কালিঘাট’ শুনে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। যাক! তাহলে হারিয়ে যাব না আর। এখান থেকে বালিগঞ্জ কি করে যেতে হয় সেটা আমি জানি।

তারপরে তো একডালিয়ার মোড়ে নেমে স্টেশন রোডের দিকে যেতে গিয়ে আমার প্রথম আলাপ কলকাতার রাস্তার জমা জলের সাথে। প্রথমে বীর দর্পে পা দিয়েও একটু পরেই বুঝলাম, ব্যাপারটা যত সোজা মনে হচ্ছে ততটা নয়। পুরীর সমুদ্রতীরে বালির মধ্যে পা এঁটে দাঁড়িয়ে রইলাম, ঢেউরা নিজেদের মত এল, পায়ের তলা থেকে সরসর করে খানিক বালি সরে গেল, আহা কি রোমাঞ্চ- মোটেও সেই গোছের ব্যাপার না। জল নিজের মত ঢেউ তুলছে, যৎসামান্য হলেও তার একটা নির্দিষ্ট স্রোত আছে, সেই জল কেটে এক পা এক পা করে এগোনো কম পরিশ্রম নয়। তার মধ্যে আবার  ফুটপাথের দিকে যত এগোই,  জল যেন তত বেড়ে ওঠে ! কি জ্বালা।  এর ওপর তো রয়েইছে পাশ দিয়ে হু-উ-শ করে জলে ফোয়ারা তুলে বেরিয়ে যাওয়া চারচাকার দল। সেদিন বাড়ি পৌঁছাতে পেরে প্রায় যুদ্ধজয়ের অনুভূতি হয়েছিল।

পরে উত্তর কলকাতায় হোস্টেলে থাকতাম। হোস্টেল ছিল হেদুয়ার কাছে।  সপ্তাহে দুই দিন টিউশন পড়তে যেতাম।  স্যারের বাড়ি সুকিয়া স্ট্রীট মিনিট পনেরো হেঁটেই চলে যাওয়া যায়।  কিন্তু এই বর্ষাকালে, সেখানে যাওয়াও ছিল প্রায় যুদ্ধ জয়ের শামিল। একেকদিন বেশি বৃষ্টি হলে রাস্তার জল হাঁটু ছাড়িয়ে কোমরের কাছাকাছি চলে আসত। দুয়েকদিন এমনও হয়েছে, রাতভর বৃষ্টির পরে , আমহার্স্ট স্ট্রীট ধরে সুকিয়া স্ট্রীট অবধি  যাওয়ার পরেও , সেই ভয়ানক জলের ঢেউ দেখে ফিরে চলে এসেছি।

একদিনের কথা বিশেষ ভাবে মনে আছে। সকালে স্যারের কাছে যখন পড়তে ফেলাম, সাতটা নাগাদ, তখন টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। তারপরে ঘন্টা দুয়েক যা বৃষ্টি হল, ন’টা নাগাদ বেরোতে গিয়ে দেখি সে এক যা তা অবস্থা। জল কোমর-ও ছাপিয়ে গেছে ! সুকিয়া স্ট্রীট দিয়ে বেরনো অসম্ভব। আমরা প্রায় সাত-আটজন ছেলে-মেয়ে ছিলাম। স্যার বললেন- এক কাজ কর, বাড়ির পাশের গলি দিয়ে উত্তর দিকে হেঁটে চলে যাও। ওদিকটা উঁচু, আর গলিটা গিয়ে শেষ হয়েছে মানিকতলা মোড়ের পুলিশ ফাঁড়ির (অথবা থানা) পেছনে। ওদের পেছনের গেট দিয়ে ঢুকে ওদিকে বেরিয়ে গেলেই মানিকতলা মোড়। সেখান থেকে যে যার মত হেঁটে বা বাস ধরে বাড়ি চলে যেও।

যথা আজ্ঞা তথা কাজ। গলিতেও হাঁটু পেরনো জল। মাঝখানে মেয়েদের রেখে ছেলেরা সামনে পেছনে, একে অপরের হাত ধরে খুব সাবধানে এগনো হচ্ছে। ও হরি ! জল কম কোথায়? বরং যত এগোই, তত যেন বাড়ে। আমাদের মধ্যে একজন মেয়ে, তার মেরেকেটে চার ফুটের একটু বেশি উচ্চতা, জল তার বুক ছুঁয়েছে প্রায়। তাকে সবার মাঝে রেখে দুই দিক থেকে শক্ত করে হাত ধরে রাখা হয়েছে।  তার মধ্যে গলির দুই পাশের বাড়িগুলির জানলা বা বারান্দায় উৎসাহী মহিলারা দাঁড়িয়ে গেছেন- আরে- ওদিকে যেওয়া, ওদিকে ড্রেন !! – জলের তোড়ে ড্রেন আর পথ, সব তো মিলে মিশে একাকার। প্রায় অনন্তকাল এইভাবে চলতে চলতে, হঠাৎ এক জায়গায় গিয়ে দেখি, এক ফোঁটাও জল জমে নেই। সামনেই ডান দিকে সেই ফাঁড়ি/থানার কাঁটাতারের বেড়া।  তাদের গেট খুলে ঢুকে তবে স্বস্তি।

কয়েক বছর আগেই কাজের চক্করে রোজ ক্যামাক স্ট্রীটে যাতায়াত ছিল। আহা! ঘোর বর্ষায় ক্যামাক স্ট্রীট এবং তার আশেপাশের এলাকায় রাস্তার জলে অর্ধেক ডুবে থাকা ছোটখাটো চারচাকাদের দুরবস্থা, শান্তিনিকেতন বিল্ডিং-এর সামনে পেছনে বয়ে যাওয়া ইন্‌স্ট্যান্ট নদী, এবং হাতে টানা রিকশাওয়ালাদের দাবি-দাওয়া-রমরমা যে না দেখেছে, সে আর বর্ষার কলকাতা কি-ই বা দেখেছে?

এইসব দিনগুলিতে নিয়ম ছিল, হোস্টেল বা বাড়ি ফিরেই ডেটল মেশানো জলে হাত পা ভাল করে ধুয়ে ফেলা।  আর জামাকাপড়ের থেকে কালো কালো ময়লার ছিটে তোলার ব্যাবস্থা করা। না হলে সেই দাগ এমনই দাগ, যে শুকিয়ে গেলে তাকে ওঠাতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে। গতকাল, অনেকদিন পরে, ফিরে এসে সেই একই কাজ করতে করতেই মনে পড়ে গেল সব পুরনো কথা।

এটা না বলে উপায় নেই, কলকাতা শহরে বর্ষা ঘরের ভেতর থেকে দেখতে বেশ। খিচুড়ি, ইলিশ উৎসব ইত্যাদির জন্য বেশ।  মাঝেমধ্যে হাতে হাত ধরে এক ছাতার তলায় গরম পপকর্ন খেতে খেতে প্রেম করার জন্যেও বেশ।  কিন্তু  নিয়মিত বাইরে বেরিয়ে কাজকম্মো করার জন্য মোটেও বেশ নয়।

বহুদিন উত্তর কলকাতা যাওয়া হয়না। বর্ষাকালে তো নয়ই। আমহার্স্ট স্ট্রীট, কলেজ স্ট্রীট, ঠনঠনিয়া, সুকিয়া স্ট্রীটে কি এখনো সেই বছর কুড়ি আগের মত জল জমে? যে জলে ভেসে চলে পশু-পাখি-মানুষের যাবতীয় সম্ভাব্য বর্জ্য, প্লাস্টিকের প্যাকেট, শালপাতার ঠোঙা, পচা খাবার-শাক-সব্জী-ফল, ভেসে চলে গরীবের পুঁজি, আর এই প্রাচীন মহানগরের “আধুনিক” হয়ে ওঠার স্বপ্ন ?


(পোস্টটা  প্রথমে দিয়েছিলাম ফেসবুকে। পরে প্রকাশিত হয়েছে ও-কলকাতার পাতায় ও।)