প্রাক-কথন

ইতিহাস কে বলা হয় – টাওয়ার অফ এক্সেলেন্স বা শ্রেষ্ঠত্বের মিনার। আমাদের পাঠ্যক্রমে যে ইতিহাস পড়ানো হয়, সেটা পরীক্ষায় পাশ করা বা করানোর জন্য। জানার আগ্রহ এতে বাড়েনা, এটা বোধহয় অনেকেই মানবেন। ফলে- ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায় এক নীরস বিষয় বস্তু। অথচ আমাদের জাতির শেকড় কিন্তু এখানেই লুকিয়ে থাকে।

ইংরেজিতে হিষ্ট্রি বলা হয় ইতিহাসকে। History কথাটার উদ্ভব, বহু হাজার বছর আগের গ্রীক শব্দ HISTOR থেকে। যার অর্থ:- Knowledge and judgment। পরে ল্যাটিন শব্দ Historia আরও একটা অর্থ যোগ করে। সেটা হল- বর্ণন বা narration। Knowledge বা জ্ঞান এবং বর্ণন বা narration আপনারা অনেক ইতিহাস বইতে পাবেন, তবে নিরপেক্ষভাবে judgment বা সিদ্ধান্ত নিতে গেলে যে পারবে, সেটা পাঠক বা আপনি নিজে কারণ এখানে অনেক মুশকিল লুকিয়ে থাকে। আমি আমার ক্ষুদ্র পড়াশোনাতে যা বুঝেছি, সেটা বলি। মুসলমান এবং হিন্দু ঐতিহাসিকরা নিজেদের মত ব্যাখ্যা করেন। যেমন লক্ষণ সেনের ব্যাপারে, মুসলমান ঐতিহাসিকরা বলেন – তুর্কি বিজয় আর হিন্দু ঐতিহাসিকরা বলেন, তুর্কী আক্রমণ। এইরকমভাবে আরও অনেক বিষয়ও ঠিক তাই।

একটা কথা আমরা ভুলে যাই ইতিহাসে কিন্তু সাধারণের কথা বিশেষ থাকে না। রামায়ণ, মহাভারত তো বটেই- অনেক ইতিহাসই বা কাব্য আবার লেখা হয় নতুনভাবে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (৩৭৫ থেকে ৪১৩/৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে এইরকমভাবে অনেক লেখা নতুন করে সম্পাদনা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসও কিন্তু অনেক সময় বিকৃত করা হয় সংবাদমাধ্যমের গুণে।সেটা আপনারা প্রত্যেকদিনই নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারেন।

এখানেই দরকার judgment বা সিদ্ধান্ত, যদি আপনার সেই আগ্রহ থাকে। মাত্র ৫০০ -৬০০ বছরের ইতিহাসকে বিকৃত করা কিছুইনা। সাধারণ লোকেরা এসব খুব ভালো করেই বোঝে, তবে ভয়ে কিছু বলতে পারেনা কারণ তার প্রচুর অর্ন্তনিহিত কারণ থাকে যেটা সহজবোধ্য। ইদানীং “ধর্ম” ব্যাপারটাও ঐতিহাসিকদের একপেশে করে দিচ্ছে – কিছুটা শাসকের নির্দেশে বা কিছুটা নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে। যুদ্ধ বিগ্রহ কখনোই সাধারণ মানুষের স্বার্থে হয়না- সেটা আমরা ছাড়া আর কে ভালো বুঝবে?

আজকাল গণতন্ত্র কে সামনে রেখে যে নির্বাচন হয়- বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন- সেটা কতখানি গণতান্ত্রিক? যদিও বা মেনে নেই, তবু আমাদের ভোট দেওয়া ছাড়া কি প্রকৃত অর্থে কোনও কাজ থাকে? দল ঠিক করবে- কে নির্বাচনে দাঁড়াবে বা কোথা থেকে দাঁড়াবে। জিতে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলে দলই ঠিক করবে কে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হবে। আমাদের ভূমিকা এখানে কোথায়- শুধু উত্তেজনায় ভোগা এবং নিজেকে কোনও দলের সমর্থক বলে বা সদস্য হয়ে পরিচয় দেওয়া ছাড়া? ভূমিকা অনেক হল। ২৩শে জুন কিছু আগে চলে গিয়েছে তাই আমার প্রথম লেখা হবে সিরাজকে নিয়ে। চেষ্টা করছি- ব্যর্থ না সফল সেটা তো আপনারাই বলবেন। আমি শুধু আমার চিন্তাধারা এখানে লিপিবদ্ধ করব।

Illustration - 1 - small

নবাব সরফরাজ খানের ( মৃত্যু- ২৯শে এপ্রিল, ১৭৪০) সময়ে বাংলার অবস্থা কি ছিল, সেটা একটু দেখা যাক! সরফরাজ খানের আসল নাম ছিল :- মির্জা আসাদুল্লাহ। সরফরাজ খানের মাতামহ নবাব মুর্শিদকুলি খান সরফরাজকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব হিসেবে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। একটা ব্যাপার কি কখনও লক্ষ্য করেছেন বা ভেবেছেন – এই যে ঢাকাইয়া মসলিন এত বিখ্যাত ছিল, সেটা কেন উবে গেল? বলা হয়, একটা হাতে পরার আংটির ভেতর দিয়ে গলে বেরিয়ে যেত এই মসলিন, তবে এটা মিথ বা অতি কথন হতে পারে তবে ওই যে একটা প্রবাদ আছে :- যা রটে, তা কিছুটা বটে!

ব্রিটিশ শাসন আসেনি বটে, তবে কোম্পানি চলে এসেছে ব্যবসা করতে। মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, সুতানুটি ( এখনকার শোভাবাজার), ঢাকা এবং বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় কুঠি। কেতার নাম ছিল এইসব কুঠির – ফ্যাক্টরি। এখানে কাজ করা বেশীরভাগ লোকই ছিল হিন্দু। এরা সেকালের সরকারি ভাষা ফার্সি সেভাবে শেখেনি, তবে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি শিখেছিল।এদের পোশাকি নাম ছিল – গোমস্তা। ফার্সি শব্দ গুমস্তা থেকে এই গোমস্তা এসেছে। আসল অর্থ হল জমিদারদের খাজনা আদায়কারী, কিন্তু এরা ইংরেজদের হয়ে খাজনা তো আদায় করতোই – উপরন্তু এরা কেরানীর কাজও করত।

মুসলমানরা-তো তখন শাসকের জাত। তাই সরকারি ফার্সি ভাষা ছেড়ে ইংরেজি শিখতে এরা আগ্রহী ছিল না। ভাবতেও পারত না, কোনোদিন ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করবে। এটা অবশ্য হিন্দুরাও ভাবেনি, তবে ফাটকা টাকা ইংরেজদের কাছ থেকে বেশী পেত বলে ফ্যাক্টরিতেই কাজ করতো। গোমস্তা অবশ্য নবাবদেরও থাকতো, তবে সেখানে হিন্দুরা থাকলেও দাপট ছিল কম। কোম্পানির গোমস্তারা গ্রামে গ্রামে অত্যাচার চালাত খাজনা আদায়ের নামে। নিরীহ গ্রামবাসী থেকে তাঁতি, রাজা –জমিদাররাও চুপ করে থাকতো। নবাব সরফরাজ তো বটেই। সোজা কথায়- এরা ইংরেজদের দাপটকে প্রচণ্ড ভয় পেতো আর নবাব পেতো মোটা অঙ্কের ঘুস। কোম্পানির এই দ্বি-শাসনে (ডাবল গভর্ণমেন্ট) অতিষ্ঠ হয়ে গেছিল লোকজন। সারা বাংলায় তখন অনাচারের রাজত্ব। (BOLTS: – CONSIDERATION OF INDIAN AFFAIRS)

ব্যক্তিগত স্বার্থের মোহ এতটাই যে নবাব এগুলো জেনেও চুপ করে থাকতেন। প্রতিবাদ করাই যেত। অসুবিধে ছিলনা কারণ তাতে ইংরেজ ব্যবসায়ীদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ হতো না। ফলে- গোমস্তারা নিজেদের কাছারিতে তাঁতিদের ডেকে এনে নিজেদের শর্ত মতো দাদন দিত আর শাসানী থাকতো- ওলন্দাজ বা ফরাসী ব্যবসায়ীদের কাপড় বিক্রি করা চলবে না। শর্ত না মানলে সকলের সামনে চাবকে পিঠের ছাল তুলে নিতো ওরা আর স্থানীয় জমিদাররা কিছু বলতেই সাহস পেত না।

জমিজমা যতটুকু থাকতো তাঁতিদের, সেটা তো যেতই উপরন্তু ঘরের মেয়ে-বউদের টেনে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো যৌন-ক্ষুধার্ত ইংরেজদের হাতে। কারা সেইসব ইংরেজ? ভালো ঘরের ছেলেরা আসতো না। কারণ ছিল নানা রোগের ভয়। সব ছিল বাপে খ্যাদানো মায়ে তাড়ানোর দল। ইংরেজ মেয়েরা আসতোই না তখন। এবারে তখনকার মেয়েদের “সতীত্ব” চলে গিয়ে সমাজে পতিত হত। মোটকথা গৃহহীন সহায় সম্বলহীন তাঁতিরা, আর বাস করতেই পারতোনা সেই গ্রামে।

প্রবাদ আছে ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আর ১৭৭৮ তে কাশিমবাজার আর ঢাকা থেকে যথাক্রমে ৭০০ আর প্রায় ১০০০ তাঁতি শহর ছেড়ে পালিয়ে যান অজানার দিকে। অনেকটা লুপ্ত হল বাংলার বয়নশিল্প আর মসলিন তো বটেই। ধর্ম এক হলেও ক্ষমতার লিপ্সা মানুষকে তখতের দিকে টানে। কিছুটা এই পরিস্থিতি আর অনেকটা তখতের লোভ ৭০ বছরের আলীবর্দিকে টেনে আনল বাংলায়। ওড়িশার ডেপুটি সুবেদার আলীবর্দি ধেয়ে এলেন বাংলার দিকে। সরফরাজ খানের দুর্ভাগ্য যে তিনি আলীবর্দি খাঁর মত একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছিলেন যার ৭০ বছর বয়সেও নেতৃত্ব দেওয়ার অসাধারণ গুণ ছিল এবং তিনি সরফরাজ খানের দুর্বলতা গুলো জানতেন।

সরফরাজ খান ভাগীরথী নদীর তীরে গিরকার যুদ্ধে নিহত হন। তার প্রতিপক্ষ আজিমাবাদের (বর্তমান পাটনা) সুবেদার আলীবর্দি তাকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করেন। যুদ্ধটি ক্ষণস্থায়ী ছিল কিন্তু এর ভয়াবহতা ছিল মারাত্মক। যুদ্ধের প্রথম দিকেই সরফরাজ খান গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু তার সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আলীবর্দি খানের নিপুণ রণ কৌশলের কাছে সরফরাজের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়।

প্রাথমিক ছত্রভঙ্গের কারণ ছিল সরফরাজ খান কখনো আলীবর্দি খাঁর কাছ থেকে এরকম যুদ্ধ আশা করেননি এবং আলীবর্দি খাঁ সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সরফরাজকে সময়ও দেননি। সিংহাসনে বসার ১৩ মাসের মাথায় তিনি আক্রমণ করেন। অপরদিকে সরফরাজ খান আরও বড় হুমকি নাদির শাহকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কারণ নাদির শাহ দিল্লি ও পাঞ্জাব আক্রমণ করেছিলেন।* বাংলার নবাবী তখতে বসলেন আলীবর্দি খান।

++++++

তথ্য :- দুর্গামোহন মুখোপাধ্যায়ের বই – মহারাজ নন্দকুমার (১৯৩০)। * বাংলা উইকি

++++++++

আলীবর্দি খানের কোন ছেলে ছিলনা। ছিল তিন মেয়ে। তিন মেয়েকেই তিনি নিজের বড় ভাই “হাজি-আহমদ”–এর তিন ছেলে,নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেজ মেয়ে এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের বিয়ে দেন। আমিনা বেগমের দুই ছেলে, এক মেয়ে ছিল। ছেলেরা হল মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজউদদৌল্লা) এবং মির্জা মেহেদী। আলীবর্দি খাঁ যখন পাটনার শাসন ভার লাভ করেন, তখন তাঁর ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের গর্ভে – মির্জা মোহাম্মদের জন্ম হয়।

এই কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্য পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তার দাদুর কাছে ছিল খুবই আদরের, যেহেতু তার কোনও ছেলে ছিলনা। তিনি মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। সিরাজদ্দৌলার জন্মতারিখ বা সাল নিয়ে সামান্য ভেদাভেদ আছে। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হল ১৭৩২ সাল।

মহারাজ নন্দকুমার এক বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র। তখনকার মুর্শিদাবাদ জেলার (এখন বীরভূম জেলা) ভদ্রপুর গ্রামে তার জন্ম , ১৭০৫ সালের মে মাসে ( তারিখ পাওয়া যায়না)। মাত্র বাইশ বছর বয়সেই নন্দকুমার বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁর রাজত্বকালে হিজলি ও মহিষাদল পরগণার আমিন (রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে পদ পান) ঠিক এখানেই একটা অধ্যায় সম্বন্ধে ইতিহাস নীরব। পলাশী যুদ্ধের সময় নন্দকুমারের ভূমিকা কি ছিল? তবে, পরের দিকে নন্দকুমারের অন্যান্য কাজ থেকে অনুমান করা যায়- তার সিরাজের পক্ষেই থাকা স্বাভাবিক। অনুমান দিয়ে তো কোনও সত্যিকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়না, তবে এটা ঠিক, ক্লাইভ থেকে শুরু করে ওয়ারেন হেষ্টিংস কেউই তাকে সহ্য করতে পারত না। খালি ঘুষ কাণ্ডের জন্য মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসি হয়ে থাকতে পারে, তবে অন্যান্য কারণ ও কি ছিলনা প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য ?

যদিও তখন নানা তুচ্ছ কারণে, রামা- শ্যামা- যদু- মধুর ফাঁসি হতো। এমনকি কলম চুরি করার জন্য ও ফাঁসি হয়েছিল- এরকম তথ্য পাওয়া যায়। এক কথায় কোম্পানি তখন – সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে, এক নির্দিষ্ট লক্ষ্য মাথায় রেখে – ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম করা। আমরা নন্দকুমারের এই সময়কার ভূমিকা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাইনা। হতে পারে যুদ্ধের ব্যাপারে তার কোনও অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি সামনের সারিতে আসেননি। তার মত একজন লোক চুপচাপ বসে থাকবে, এই বিপদে – এটা মানতে কষ্ট হয়।

সিরাজ এবং নন্দকুমারের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েই আপাতত শেষ করছি।

Latest posts by রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল (see all)