অবিভক্ত ভারতের সাহিত্য যদি ঠিক ঠাক বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করবো । অন্যান্য প্রদেশের তুলনায়, বাংলায় খাওয়ার রকম ও ধরণ বৈচিত্র্যে ভরা ।

বাংলা সাহিত্যের গোড়া থেকেই ( মূলত পদ্য) আমরা বিচিত্র সব খাদ্যবস্তুর উল্লেখ পাই ।এগুলো কিন্তু, অন্য কোনো অঞ্চলের সাহিত্যে পাওয়া যায় না । এই নানা রকম বৈচিত্র্য সব চেয়ে বেশী পাই – মিষ্টান্নে । বাংলায় মিষ্টান্ন মানে – যে সব খাবারের মূল উপাদান গুড় এবং চিনি । এই চিনি কিন্তু আমাদের পরিচিত সাদা চিনি নয় । এটা একটু লালচে, আর একে কাশীর চিনি বলা হয় ।পুরীতে সাদা চিনির মিষ্টান্ন, ভোগে দেওয়া হয় না, এটা আগেই বলেছি । সংস্কৃত ভাষায়, মিষ্ট বলতে মধুরও বোঝায় এবং সাথে আমিষ দ্রব্যও বোঝায় । যে সব খাদ্য বস্তু খেতে মধুর, সেগুলোও কিন্তু মধুর তাই মিষ্ট । মিষ্ট বলতে আবার সিক্ত বা ভেজা বোঝায় । তাই প্রিয় মাছের ঝোল বা মাংসকেও মিষ্ট বলা যায় ।

বৈদিক যুগ থেকেই দুধ এবং তার থেকে তৈরী ক্ষীর, দই, ঘি, মাখন সর্বশ্রেষ্ঠ খাবার ছিল । তাই এগুলোকে পবিত্র মনে করে দেবতাদেরও নিবেদন করা হতো। এই দুধের ব্যবহারে বাংলার মানুষ কিন্তু সবাইকে পেছনে ফেলে, রেসের ঘোড়ার মত ডার্বি জিতে নিয়েছে । ছানা আবিস্কার জন্য বাঙালি এই কৃতিত্বের দাবীদার ।ক্ষীর, দই, ঘি, মাখন কিন্তু কাঁচা দুধের স্বাভাবিক পরিণাম,  কৃত্রিম অথবা স্বাভাবিক – কিন্তু কোনো ভাবেই দুধের বিকৃতি নয় ।ছানা – ফোটানো দুধের কৃত্রিম বিকৃতি । বাঙালি যত্ন নিয়ে অন্য জিনিস দিয়ে দুধকে ছিন্ন – ভিন্ন করে দিয়ে জলীয় বস্তু আর সারবস্তু আলাদা করেছে। এই ভাবে ছিন্ন ভিন্ন করার জন্য নাম হয়েছিল – ছেনা, এখন ছানা নামে পরিচিত ।

সংস্কৃত ভাষায় ছানার কোনো উল্লেখ নেই , অন্য ভাষাতেও ছিল না । তাই অজ্ঞাত বলে পূজায় একে নিবেদন করার বিধান নেই । বুঝুন ব্যাপার !! জানি না বলে, খেতে পারবো না । ওনাদের অজ্ঞতা আমাদের মাথা ব্যাথার কারণ । তাই বলে, তো বাঙালি থেমে থাকবে না ।

দুটো শ্রেণী তৈরী হলো :-

প্রথম শ্রেণীতে পড়ল :-একটা মাত্র উপাদানের মিষ্টান্ন । গুড় বা চিনির নাড়ু আর চাকতি । গুড়ের চাকতি হলো :- নবাৎ পাটালি আর ফেনী বাতাসা । চিনির চাকতি হলো :- বীরখণ্ডি। চিনির নাড়ু – ওলা (ওলের মত দেখতে বলে)

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে :-দুটো উপাদানে তৈরী মিষ্টান্ন । যেমন, গুড় আর নারকোল কোরা মিশিয়ে – নারকোল নাড়ু । চিনি আর নারকোল মিলিয়ে :-নারকোল পুলি আর নারকেল ছাপা ( নকশা করা বলে, এই নাম ) ক্ষীর আর চিনি মিশিয়ে তৈরী হল – ক্ষীরের নাড়ু । ছানা, চিনি মিলিয়ে হলো – মণ্ডা বা সন্দেশ এবং অবশ্যই রসগোল্লা ।

শহর কোলকাতা এবং ঢাকার ময়রাদের হাতেই মণ্ডা‍র অনেক রকমফের তৈরী হয়েছে । এসব রকমফের হয়, পাকের তারতম্য অনুযায়ী । কড়াপাক, নরমপাক,কাঁচাগোল্লা,জলভরা, রাতাবী ( অর্থ :- সাধারণ )- এই সব বিভিন্ন কেতা কানুন । সবচেয়ে বড় আবিস্কার অবশ্য – রসগোল্লা ।

এখানে এসে একটু ধাক্কা খেতে হয় । ওডিশার নামকরা ইতিহাস বিদ – জে পাঢ়ী তাঁর পুরোষত্তমতত্ব ও নব কলেবর ( ১৯৯৬ ) বইতে বলছেন :- ওডিশার পুরীতে এই রসগোল্লা , আদিতে ক্ষীর মোহন নাম নিয়ে জগন্নাথ দেবকে রথ যাত্রায় শীতল ভোগ দেওয়া হতো । পরে, কটক জেলার শালেপুরের বিকলানন্দ কর, এই মিষ্টির নাম দেন- রসগুল্লা । রসগুল্লা মানে হলো রসের গোলা । মূলত লক্ষ্মী দেবীকে এই মিষ্টি শীতল ভোগ দেওয়া হতো । “The rasgulla is more than 600 years old. It is as old as the RathYatra in Puri”.  পাঢ়ী তাঁর বইতে এই কথাই লিখেছেন ।

আরও একজন ইতিহাস বিদ এস সি মহাপাত্র বলছেন :-This practice of offering rasgullas to Lakshmi dates back at least 300 years. “The RathYatra, which started more than six centuries ago, has not changed with times. And until today, rasgulla is the only sweet offered to Mahalaxmi, Jagannath’s consort, to appease her when the deities return home,”

তা হলে, এই রসগোল্লা বাংলায় এলো কি করে ?

বলা হয় , নদে জেলার নবদ্বীপের চৈতন্য দেব পুরীতে এই রসগুল্লা খেয়ে মোহিত হয়ে গেছিলেন। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল মহাপ্রভুর এই মিষ্টির প্রতি দুর্বলতার কথা । শান্তিপুর ফুলিয়ার হারাধন ময়রা চলে গেলেন পুরীতে । মোটা মুটি, সেটা ১৮৬৪ সাল । বাংলার নব জাগরণের ( রেনেসাঁ) সময় । মূলত রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নবজাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন।

হারাধন ময়রার রথ দেখা আর কলা বেচা এক সঙ্গে শুরু হলো । সেখানে শিখে এলেন  রসগুল্লা বানানোর প্রণালী। কিন্তু, সেই পুরীর ক্ষীর মোহনের স্বাদ নাকি এলো না । নবীন চন্দ্র দাস,  বাগবাজারে দোকান খোলেন ১৮৬৬ সালে ।  তিনি জেনেছিলেন হারাধন ময়রার এই চেষ্টার কথা । লেগে গেলেন তাঁর মত তৈরি করতে । কলম্বাস হয়ে গেলেন নবীন ময়রা । আমাদের কাছে এলো স্পঞ্জ রসগোল্লা ।

ভগবান চন্দ্র বাগলা নামে এক কাঠের ব্যবসায়ী সপরিবারে, একদিন যাচ্ছিলেন নবীন ময়রার দোকানের পাশ দিয়ে । ছোট ছেলের জল তেষ্টা পেলে তিনি দাঁড়ালেন দোকানের সামনে জল নিতে । নবীন ময়রা একটা স্পঞ্জ রসগোল্লা দিলেন ছেলেটির হাতে । দিল তরর হয়ে গেল ছেলের । বাবাকে বলতে তিনিও খেলেন । শুরু হলো নবীন ময়রার জয়যাত্রা ।

রসগোল্লায় বিশুদ্ধ ছানা গাঢ় রসে সেদ্ধ করা হয় আর রসে ডুবিয়ে রাখা থাকে ।ছানার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে রসগোল্লার মত পাক করে যদি শুকনো অবস্থায় অল্প চিনি মিশিয়ে রাখা হয়, তবে তাকে বলে :- দানাদার । ছোট সাইজের দানাদারকে বলা হয় :-রসমণ্ডি । সাইজটা যদি চ্যাপ্টা আর কিছুটা রস থাকে তবে বলা হয় ক্ষীরমোহন ।রসগোল্লাকে ঘন দুধের মধ্যে রাখলে বলা হয় – রসমালাই ।

আরও একটা মিষ্টান্ন আছে- দরবেশ । এটার মূল হলো – মোতিচুর । মোতিচুর কিন্তু সাদাটে এবং শক্ত  মণ্ডা । দরবেশ হলো নরম আর এর দানা হরেক রঙের ।ফকির দরবেশদের আলখাল্লা নানা রঙের কাপড় দিয়ে তৈরী হয় বলে এই দরবেশ নাম হল ।

এবারে আসি বোঁদে বা বুঁদিয়াতে । সংস্কৃত বিন্দু থেকে এই নামটা এসেছে । ঘৃতপক্ক কলাইডালের গুঁড়ো দিয়ে সাধারণত তৈরী এই বোঁদে । বোঁদেকেই চিনি দিয়ে শক্তপাকে বানালে হয় মতিচুর । মতি  মানে মুক্তো আর চুর মানে চূর্ণ । তাই সংস্কৃত নাম :- মৌক্তিক । এককালে এটার নাম ছিল – মেঠাই আর অখণ্ড ভারতের সবচেয়ে পুরোনো মিষ্টান্ন ।

ল্যাংচা হলো ক্ষীর আর ছানার তৈরী শিবলিঙ্গের আকারে তৈরী চিনির রসসিক্ত মিষ্টান্ন। হয়তো কোনো খোঁড়া ময়রা তৈরী করেছিল বলে এর নাম ল্যাংচা । এরই গেঁড়ে সংস্করণ :- পানতুয়া  । পাতলা রসে ডোবানো থাকে বলে এর নাম পানতুয়া ( পানিতাওয়া) । লেডিকেনী হলো পানতুয়ার রাজসংস্করণ । লেডি ক্যানিংয়ের নামে এটা তৈরী করা হয়েছিল ।

তার পর আছে – চমচম, রসকদম্ব । সবই ক্ষীর, ছানা আর চিনির তৈরী । বোঁদে মতিচুরের পর উল্লেখযোগ্য হলো জিলিপি । এটা কিন্তু বাদশাহী খাবার । নামটার প্রথম অংশ আরবী । জিল্লা মানে জেল্লা বা উজ্জ্বল । তারপর ঢুকেছে সংস্কৃত খাদিক মানে চমৎকার খাদ্যবস্তু । জিলিপির উপাদান কিন্তু বোঁদের মত । তবে, ভাজার পরে রসে ফেলা হয় ।  খেতে শক্ত, বোঁদের মত নরম নয় । জিলিপির রাজসংস্করণ হলো অমৃতি । নামটাও সংস্কৃত থেকে এসেছে । অমৃত >অমৃতি । তবে, অনেকেই বলেন :-অমৃতি — এই মিষ্টিকে উত্তর ভারতে বলা হয় ‘ইমারতি’। ইমারত অর্থাৎ উঁচু বাড়ি যেমন থাকে থাকে তৈরি হয়, এও সেভাবে হয় বলে এই নাম। অরিজিন সম্ভবতঃ আরবি বা ফারসি। জিলিপির আরও একটা রকমফের আছে । মোটা আকারের এই জিলিপি দই মিশিয়ে রাখা হয়/ হত । এর নাম দই জিলিপি । শোনা যায়, এই দই জিলিপি খেতে এতই ভালো যে এক ডাক্তার গদ্যকার ইনসুলিন ইনজেকশান নিতে নিতে জিলিপি রসিয়ে খেতেন ।

বাংলায় গম অজানা ছিল না , তবে ব্যবহার অল্পই ছিল । যবের ব্যবহার ছিল বেশী । যবের ছাতু এখনও বেশ জনপ্রিয় । বাদশাহী আমলে গম ভাঙিয়ে হত আটা । এই সময় থেকেই বাংলায় আটার ব্যবহার চালু হয় । এখানে আটা আর ময়দার ভেতর পার্থক্য বলে রাখি । খোসাশুদ্ধ গম ভাঙালে- সেটা আটা আর খোসা ছাড়ানো গম ভাঙালে হয় ময়দা । ময়দার ব্যবহার শুরু হয়- পোর্তুগীজ আমলে , কারণ এরাই পাঁউরুটির প্রচলন করে এদেশে ।

প্রথম প্রথম বাঙালিরা ময়দা ব্যবহার করতো- সেমুই পায়েসে । তারপর রুটি লুচিতে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় । আবার শুরু হলো বাউনদের ফ্যকড়া । যবনদের দেওয়া আটা ময়দা চলবে না । সমাধান অবশ্য করলেন বাউনরা নিজেই । গব্য ঘৃততে উত্তমরূপে ভর্জিত হইলে  গোধূম ( গম) চূর্ণ দেবতাদের নিবেদন করিয়া ভক্ষণ করা যাইবে, কারণ গব্যঘৃত শুদ্ধ । আসলে ঘটনাটা হলো, খাওয়ার ইচ্ছে খুব- ওদিকে জনসমক্ষে কিছু বলতে হবে তো !! বিধানগুলো এই ভাবেই এসেছে । ধরুন- কোনো নামকরা বিধানদারের কোনো নির্দ্দিষ্ট খাবার খেতে ভালো লাগে না । বিধান চলে এলো- ওই খাবার শাস্ত্রসম্মত নয় । কে আর দেখছে কোন শাস্ত্রে কি লেখা আছে ? কেউ হয়তো মিনমিন করে বলল – কোন শাস্ত্র ঠাকুর মশাই ? অমনি উত্তর আসবে :- বেদ । এই বেদ এমন জটিল ব্যাপার , গ্রামের লোক আর ট্যাঁ ফুঁ করবে না । এবারে সেই একই খাবার অন্য গ্রামের  এক ঠাকুরমশাইয়ের  খেতে ভাল লাগে, উনি আবার উল্টো বিধান দিলেন । লোকমুখে শুনে সেই অন্য ঠাকুরমশাই এলেন এনার কাছে । তখন সমাধান হতো গব্যঘৃত , গব্যদুগ্ধ, গব্যদধির ফরমান দিয়ে ।

বড়লোকেরাও এই সব সমাজপতিদের হাতে রাখতেন । চালু কথায় এটা ছিল সমাজ ।এই কোলকাতার এক বড়লোক ছিলেন:- রামদুলাল  সরকার ( ১৭৫২-১৮২৫ ) । ইনি সৎ ছিলেন । সামান্য চাকরী করতেন দশটাকা মাইনের । এক ডোবা জাহাজ কিনেছিলেন, মনিবের পয়সায় । তাতে যে মুনাফা করেন, সেই পুরো মুনাফাটাই তুলে দেন মনিবের হাতে ( প্রায় এক লক্ষ টাকা) । মনিব সেই টাকা ফিরিয়ে দিতেই তিনি বড়লোক হয়ে যান । তাঁরই এক বন্ধু কালীপ্রসাদ তখন বড় হাঙ্গামা করছিলেন ,নিষিদ্ধ মাংস আর মদ্যপান করে । জাতি চ্যুত হওয়ার পর রামদুলাল বাবু তাকে আবার জাতে ফিরিয়ে আনেন । অন্যরা যখন সমাজের কথা তোলেন, তখন তিনি বলেছিলেন :- সমাজ আমার সিন্দুকে।

তাই আমার বক্তব্য- খাওয়ার বিচার করবেন না । সবই ওই সিন্দুকের খেলা ।

**********

তথ্যঋণ :-

সুকুমার সেন :-কলিকাতার কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স

সুবীর রায়চৌধুরী :- সেযুগের কেচ্ছা, একালের ইতিহাস ।

Latest posts by রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল (see all)