বাংলা ছবি বানানো খুব সহজ কাজ। এমনকি পৃথিবীর সহজতম কাজ বললেও ভুল হবে না।কেন? ধরুন আপনি একজন পরিচালক। উঁহু…ভুল বললাম।একজন বাংলা ছবির পরিচালক।এখন ধরে নিন আপনার হাতে প্রযোজকের মানিব্যাগ আছে।এন্তার চিট ফান্ড বা লেকমলজাত টাকা। আপনি কি করবেন?
১। প্রথমেই একজন বলিউড ফেরত নায়িকার ফাঁকা ডেট গুলো বুক করে নিন।
২। তারপর একজন ভালো ডি ও পি -র সাথে কথা বলে নিন।(সৌমিক হালদার হলে বেটার)।
৩। তারপর টি ভি চ্যানেলে একটা স্লট বুক করে নিন। ভালো ভালো কিছু টার্ম মুখস্থ করে যাবেন। (সংজ্ঞা -ও পড়বেন, কারন কিছু কিছু সাংবাদিক ঠ্যাঁটা হয়।খালি কোশ্চেন করে) যেমন সুররিয়ালিজম, দাদাইজম, কিউবিজম, নিও নোয়ার, স্লো সিনেমা, পোয়েটিক্স, হাংরিয়ালিস্ট আন্দোলন, হ্যানেকে,বার্গম্যান,ইরানিয়ান ডায়াস্পোরা ইত্যাদি। ইন্টার্ভিউ তে গিয়ে বলুন- আপনি এবার একটু “অন্যরকম” কাজ করতে ছান।এই “অন্যরকম” শব্দ টা আবার অনেক কিছু বোঝায়।মল্লিকা শেরওয়াৎ -ও অন্যরকম।আবার স্বদেশ সেনের কবিতা-ও অন্যরকম।
৪।যাকগে, এবার আপনি ছবিটা বানানো শুরু করে দেবেন। বলিউড ফেরতা নায়িকা কে নিয়ে বেশ কয়েকটা “অন্যরকম” শট নিন।মানে আপনি এতদিন টরেন্ট আর উইকিপিডিয়া ঘেঁটে যা যা শিখেছেন সেগুল কয়েকটা পারমুটেশন কম্বিনেশন করে দিন। বেলা টারের তুরিন হর্সের সাথে মাইকেল মানের চোখা সংলাপ—মেলাবেন আপনি মেলাবেন।
** ঋত্বিক বা শাশ্বত–এদের যেকোনো একজন কে নেবেন।এদের এখন পাবলিক খাচ্ছে ভালো।
৫।কিছু বোকা বোকা রমকম থেকে বামনদেব চক্রবর্তী মার্কা বাংলা অনুবাদ করা সংলাপ দেবেন। প্রেম যে আসলে দুনিয়ার সব সেরা ব্যাপার, অনেকটা পবিত্র, সাদা ভ্যানিলা আইসক্রিম বা ময়দানের বুড়ির চুলের মতো; আর রাজনীতি যে অতি বস্তাপচা, নোংরা খ্যাংরাঝাঁটা মার্কা জিনিস—এটা ভালো করে বোঝাবেন।তাহলে আনন্দবাজার ভালো নম্বর দেবে।
৬। আবার টিভি চ্যানেল।এবারে বলে আসবেন, এই ছবি টা করতে গিয়ে মানুষ হিসেবে আপনি এতোটাই পরিবর্তিত হয়েছেন, যে আর কোনোদিন আপনার আগের ছবি গুলোর মতো পাপিষ্ঠ ছবি বানাবেন না।তাই শুটিং শেষ করেই আপনি সিসিলি তে একটা ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন।
৭। ছবির শেষ টুকু ভাবাই আসল। বেশি চাপ নেবেন না। নেট ঘেঁটে কিছু না কিছু একটা পেয়ে যাবেন। আই এম ডি বি আছে না?আর মাথা খাটাতে চাইলে ৩ এর পয়েন্ট টা আবার একটু ঝালিয়ে নেবেন।
৮। মার্কেটিং, মশাই মার্কেটিং। ওটাই আসল। রেডিও, নিউজ চ্যানেল, রেস্টুরেন্ট, রকেট বড়ি,শপিং মল, আই পি এল–সবার সাথে কোলাবরেশন করে ফেলুন। বাকিটা ফ্যাল কড়ি, মাখ তেল।


ET00029563

ও হ্যাঁ, নির্বাক দেখলাম। সৃজিত মুখার্জির সব সিনেমাই প্রথম দিনে দেখে এসেছি এজাবত।পরিচালক হিসেবে সৃজিত ব্যাক্তিগত ভাবে আমার তেমন পছন্দ নন, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির ধারক বাহক পত্রিকাটির সৌজন্যে তাঁর প্রতিটি ছবিই সমালোচকের হাত খোলা নম্বর পেয়ে পাশ করে, তাই ভালো বাংলা ছবির কাঙ্গাল হিসেবে দেখতে যাই। অটোগ্রাফ আর জাতিস্মর বেশ ভালই লেগেছিল।কিন্তু নির্বাকে এসে ভদ্রলোক হতাশ করলেন।ছবির শুরুতে সালভাদর দালির নাম দেখে প্রত্যাশা বাড়তে বাধ্য।দালি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুনুয়েলের সাথে “আন সিয়েন আন্দালু” বা আন্দালুসিয়ান ডগ নামে একটি শর্টফিল্ম ও বানিয়েছিলেন।পিকাসো ও সহকর্মীরা ফিল্ম টির সমালোচনা করলে ক্রুদ্ধ দালি পকেটে ধিল নিয়ে থিয়েটারে যান জবাব দেওয়ার জন্য। আজও ছবি টি এই ২০১৫এর দর্শক কেও চমকে দেয়, ভাবায়।কিন্তু বঙ্গবাসী পরিচালকের থেকে সেই স্পর্ধা প্রত্যাশা করা টা বোধ হয় বারাবারি।যাই হোক, ছবিটি পাঠকরা এখন অনেকেই দেখেননি, তাই সংক্ষেপে স্পয়েলার ছাড়া নির্যাস টুকু বলি।ছবিটি চারটি গল্প নিয়ে তৈরী। আ ম্যান। আ ট্রি। আ বিচ। আ কর্পস্‌।প্রতিটি গল্পেরই থিম প্রেম, নীরবতা এবং মৃত্যু।প্রথম গল্পে অঞ্জন দত্ত একজন নার্সিসিস্ট মানুষ।যিনি নিজের প্রেমে মগ্ন।উডি আলেনের “সুইট অ্যান্ড লোডাউন” ছবির শন পেনের মতো সেলফ অবসেসড অঞ্জন অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।কিন্তু পরিচালক বোধয় ভুলে গেছিলেন যে সাদা অন্তর্বাস পরিয়ে চরিত্রকে চাড্ডি ইংরেজি বলালেই আন্তর্জাতিক মান ছোঁওয়া যায় না।দ্বিতীয় গল্প একটি প্রেমিক গাছকে নিয়ে।যে সুস্মিতা সেনের প্রেমে পড়ে সুস্মিতার বয়ফ্রেন্ড যীশুকে নাকাল করার চেষ্টা করে।তৃতীয় গল্প যীশুর কুকুর বিঙ্গিকে নিয়ে। সে যীশুর প্রেমিকা সুস্মিতা সেনকে মোটেই সহ্য করতে পারে না। এই গল্পের পরিনতি হয় একটি মৃত্যু তে। শেষ গল্পে মর্গের কেয়ারটেকার ঋত্বিক একটি মৃতদেহের প্রেমে পড়ে।কম্পাস দিয়ে আঁকা বৃত্তের মতই খুব প্রেডিকটেবল ভাবে এই গল্প টি শেষ হয়।তুলনামুলক ভাবে শেষ গল্পটি টেলএন্ডার ব্যাটসম্যানের মতো মান বাঁচানোর চেষ্টা করেছে ঋত্বিকের অসাধারণ অভিনয়ের গুনে।কিন্তু কয়েকটি বাজারচলতি চটুল হিন্দি গান অনাবশ্যক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে ঋত্বিককে বেমালুম রানআউট করে দিয়েছে।সুস্মিতা সেনের রোলটি করার জন্য মুম্বাই থেকে নায়িকা আনার কি দরকার ছিল কে জানে? টালিগঞ্জে নায়িকা কম পড়িয়াছে বোধ হয়।মোটমাট ছবিটি একটি কারনেই দেখতে পারেন,সৌমিক হালদারের সিনেমাটোগ্রাফি।বাংলা সিনেমাটোগ্রাফি-র হল অফ ফেমের দিকে আরেক ধাপ এগোলেন হালদার মশাই।


শেষপাতে বলে রাখি ছবিটি নিয়ে ফেসবুক/টুইটারে পরিচালক-প্রযোজকের বন্ধুবর্গের লাগামছাড়া প্রশংসা মনে করিয়ে দিল চলচ্চিত্রের বিগ থ্রি ফেস্টিভ্যালের অন্যতম ভেনিসে এই বছর সেরা নবীন পরিচালকের সম্মান পাওয়া ছবি “আসা যাওয়ার মাঝে”(লেবার অফ লাভ) এখনো ফান্ডের অভাবে কলকাতায় মুক্তি পায়নি।সবার তো ভেঙ্কটেশ থাকে না রে,তোপসে।


Latest posts by ঋতম ঘোষাল (see all)