বুড়ির ভোট, ভোট বুড়ির।
-সব শেষ গো বাবু! সব শেষ! এতক্ষণে দুদন্ড শান্তি। ওদের চেঁচামেচি আর নিতে পারছিনা গো বাবু। আই-টি-ইউ থেকে আই-সি-ইউ এসেছি এবারে..বুড়ীটা হাউমাউ করে ডুকরে উঠল।
বললাম, কেন গো কি হল তোমার আবার?
বুড়ী বলতে শুরু করল..
-কত ডাক্তারবাবুর কত মত! কি ঝগড়া তাদের নিজেদের মধ্যি ! চীৎকার, চেঁচামেচি সব শেষ। এবার কালকের রাত পুইলেই পরীক্ষ্যে! তারপর সব রিপোর্টগুলো আসতে শুরু করবে। একে একে জানতি পারবা আসল রোগ কোথায়। তখন বুঝেশুঝে আবার আমাকে আবার না আই-সি-ইউ থেকে আই-সি-সি-ইউ তে ট্রান্সফার করে দেয় । ততক্ষণ চলুক আমাগো গীতাপাঠ, চন্ডীপাঠ!
বললাম, খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে তুমি!
বুড়ি বলল..
-আমি যত না অসুস্থ ওরা আরো আমাকে রোগে কাবু করে দিতেছে। জয় বজরংবলী! বাঁচিয়ে দাও এবারের মত। আর অনিয়ম করব না। জয় মা দক্ষিণা কালী! বাঁচিয়ে দাও এবারের মত। জয় নাস্তিকস্য মুনিঃ মাতা ! এবারটার মত আর আমাকে আই-সি-সি-ইউতে ট্রান্সফার কোরোনা। একে আমার দেনা গলা অবধি। তারপর আর আই-সি-সি-ইউর যা খরচ! পারবোনি বাপু পারবোনি অত ! একেই গুচ্চের টেস্ট করাতে করাতে ফতুর । শরীলের কোনো অংশ বাদ নেই গো বাবু।
বললাম, দাঁড়াও , দাঁড়াও সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে আমার! কেন ভর্তি হলে হাসপাতালে?
বুড়ি বলল..
-ভর্তি? আমি তো হ‌ই নি বাবু। ওরাই তো জোর করে আমারে ভর্তি করিয়েই দিলে! পাঁচবছর অন্তর অন্তর আমাকে নিয়ে বেকার টানাহ্যাঁচড়া। চামড়াটা ফুটিয়ে ফুটিয়ে শেষ। বলি তোমরা কি আমার নতুন চামড়া করে দিতি পারবা? তোমাদের না হয় হৃদয় বলে কিস্যু নেই। আমার হৃদয়টাতো গেল বাপু, তোমাদের ভালোবাসার চোটে! তোমরা এদ্দিনে বুঝতি পারলে? আমার মাথার অসুখটা কোনোকালে ছিলনা? অযথা মাথায় ফুটো করে, নল ঢুকিয়ে ব্যথা দিলে! এবার বলদিকিনি সত্যি করে, আমার রোগ সারাতে পারবে কিনা? আমার কিডনি দুটো পারফেক্ট ছিল। তোমরা বললে, পাথর হয়েচে। অপারেশন করে একটা কিডনি বাদ দিয়েই দিলে! জীবনে একটা বিড়ি-সিগারেট খাইনি। তোমরা টেস্ট করে বললে ফুসফুসে কালো প্যাচ আমার। আমার নাকি ফুসফুসে ক্যান্সার শুরু হয়েছে সবেমাত্র। দুটো কেমো দিয়ে দিলে!কেমো নিয়ে সে কি কষ্ট আমার! আমি যে আর ধকল নিতে পারছিনা বাবু!
বাপ্‌রে! এ কি অবস্থা তোমার! বলে উঠলাম
বুড়ি বললে..
-এবার বল তো আমাকে নিয়ে আর কত খেলবে? আমি জেনে গেছি গো বাবু, আমার এ রোগ সারার নয়। তোমরা কেউ পারবেনা আমাকে আগের মত সুস্থ করে দিতে। তাহলে? তাহলে কেন আমার ওপর এত অত্যাচার? মুক্তি দাও না আমায়! আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এসি কেবিনে রেখে দিয়ে লোককে দেখাচ্ছো আমাকে তোমরা কত্ত ভালোবেসে চিকিতসে করাচ্ছো। এর শেষ কবে হবে বাবু? কবে হবে এই ছিনিমিনি খেলার শেষ? আমি যে বড্ড অসুস্থ বাবু! আর নিতে পারছিনে তোমাদের এই লোক দেখানো আদিখ্যেতা!
বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের কোণা মুছতে লাগল। আমি হতভম্ভের মত চেয়েই র‌ইলাম ওর দিকে। আমি আজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বুড়িকে বাঁচানোর ক্ষমতা নেই আমার মত একরত্তির। বুড়ির আছে লোকবল। আমার আছে বুড়ি। কিন্তু আমারো তো দায় বুড়িকে বাঁচানোর। তবুও…. বুকের মধ্যে চাপ অনুভূত হল প্রচন্ড।
মনে হল বলি” চলো তো বুড়িমা। হাসপাতালের বন্ডে স‌ই করে তোমাকে আজ ছাড়িয়ে নিয়ে যাই!”

Latest posts by ইন্দিরা মুখার্জী (see all)