স্টার্ট দেওয়ার পর নিউট্রালে পা রেখে তিনবার অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিলাম, গাঁগাঁ করে উঠল ইঞ্জিন। ব্যাটা খ্যাপামোষের মতো হাঁকড়াচ্ছে, তার মানে ছোটার জন্যে রেডি।  রেয়ার আয়নায় দেখলাম, ‘প্রতিবন্ধু’ আর সিনিয়ার সিটিজেনের চারটে সিট যা খালি, বাকি সিটগুলো সব ভরে আছে। স্ট্যাণ্ড থেকে এই সিটগুলো রোজই ভরে যায়। মাছেরঝোল ভাত খেয়ে সাজুগুজু অফিসবাবুরা, এই বাসের টায়েম জানে। বাসে উঠে সিট পেয়েই ঝিমোতে থাকে। মেয়েরা আবার কানে হেডফোন গুঁজে মোবাইলে গান শোনে। ইসটাটারের থেকে চার্ট নিয়ে হারুদা দোকানে গিয়েছে বিড়ি আর দেশলাই কিনতে। ও এলেই গাড়ি ছেড়ে দেব। আটটা বাজল।

ড্যাশবোর্ডে মা কালীর পেতলের মতো রঙ করা মূর্তিতে তাজা জবাফুলের মালা। পাশের ধুপদানিতে তিনটে ধুপ জ্বলছে। জয় মা, গাড়িভরা প্যাসেঞ্জার দিও মা। লোক তোলার সময় মোড়ের সার্জেন্টগুলো যেন কাটি না করে, মা। সব শালার বাস যেন পিছনে পড়ে থাকে, মা। এই রুটের পরের বাস চালাচ্ছে মনাদা, সে আমায় ধরতে এলেই, তার যেন টায়ার পাঞ্চার হয়, মা।  হারুদা আমার সিটের নিচেয় রাখলো ছ্যাতলা ধরা পেপসির বড়ো বোতলে টিপকলের জল। ওটা আমার জন্যে। গুটখা খাওয়া মুখ ধুয়ে, নতুন গুটখা ঢালার জন্যে। হারুদা বিড়ির প্যাকেট আর দেশলাই ড্যাশবোর্ডে রাখতে আমি পয়লা গিয়ার মারলাম। এতক্ষণ বাসটা ঘিজি ঘিজি ঘিজি ঘিজি কাঁপছিল, এবার প্রাণ পেয়ে চাকা চালু হল।

ডানদিকে স্টিয়ারিং মেরে রাস্তার মাঝখানে যাবার মুখেই বাধা। একটা সাইকেল রিকশা প্যাঁক, প্যাঁক করে উঠল, আর দুটো বাইক উড়ে যাবার জন্যে হর্ন মারতে লাগল। ব্রেক মারলাম, রিকসাওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ে প্যাডেল মারছে। যাবার সময় বলে গেল – ‘শুয়োরের বাচ্চারা রাস্তাটাকে কিনে লেছে, এতক্ষণ দেঁইড়ে থেকে থেকে…’। রিকশাটা পার হয়ে যাবার পর গাড়িটাকে রাস্তার মাঝে এনে গিয়ার ঠেললাম দু নম্বরে। রিকশটাকে ওভারটেক করার সময় ঠেসে হর্নটা বাজিয়ে দিলাম, ব্যাটার কানের ষষ্ঠীপুজো। গালাগাল দিল, ‘যা না শালা, ফাঁকা রাস্তা পড়ে রইচে, চোকে দেকতে পাস না নাকি, গুয়োর ব্যাটা?’ গিয়ার তিন নম্বরে ঠেলে নিশ্চিন্ত হলাম, আজ দিনটা ভালোই যাবে।

প্রতি মিনিটেই দাঁড়াতে হচ্ছে লোক তোলার জন্যে। হারুদা গেটে চেঁচাচ্ছে। খালিগাড়ি। খালিগাড়ি। মেট্রো মেট্রো, রাসবিয়ারি, হাজরা, একসাইড। লোক উঠছে। লোক উঠছে। শুরুতে এই সুবিধে, নামার পাব্লিক নেই, শুধু ওঠে। রাস্তার ধারে, গলির মোড়ে যে হাত দেখাচ্ছে, দাঁড়িয়ে তুলে নিলেই হল। বাস ভরে উঠছে। হারুদাকে আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু গলা শোনা যাচ্ছে। ‘বাঁয়ে চাপ, বাঁয়ে চাপ। আস্তেল্লেডিস। একদম আস্তে করে দে। ওকাকু, গেটটা ছেড়ে ভেতরে যান না। পেছনে এগিয়ে যান, পেছনে এগিয়ে যান। এই যে ভাইটি, ব্যাগটা সামনে নিন, সামনে নিন, লোককে ঢুকতে দিন। বাঁ দিকে সাইকেল, বাঁ দিকে সাইকেল। বাসের বডিতে থাবড়া মেরে হারুদা বলল – হোইইইই। মাসীমা, ড্রাইভারের পিছনে দাঁড়িয়ে যান’।

দরজায় লোক ঝুলছে। বাঁদিকের মিররে লাগাতার চোখ রাখতে হচ্ছে। শালা, উনিশবিশ হলেই এক আধটা খসে যাবে। আর কপালে জুটবে পাব্লিকের ক্যালানি। আমি তো শালা গেট খুলে ঠিক টপকে যাবো। মরবে বেচারা হারুদা। পালাবার রাস্তা পাবে? একটা মারও শালা বাইরে পড়বে না।

পাইলটদের শুনেছি হেব্বি কামাই। ড্রেসটেস মেরে একঘর মাঞ্জা। মালগুলো পারবে এরকম চালাতে? মধ্যমগ্রামে দেখেছি পেলেনগুলো সাঁ করে ওঠে কিংবা ঝুপ করে নামে। রাস্তাগুলো? শালা ওরম রাস্তা আমাকে দিক না। গাড়ি চালানো শিকিয়ে দেব সব ব্যাটাকে। আর মালগুলো আকাশে যখন ওড়ে? শালা একটা পাব্লিক নেই। লোক তোলা নেই, লোকের নামা নেই। সাইকেল নেই, অটো নেই, রিকশা নেই। পেছনে সেম রুটবাসের বাঁশ নেই। সামনে পাছা বেঁকিয়ে দাঁড়ানো পাব্লিক বাস নেই। এই যে এখন আমি এই বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। ডানদিকে বুড়োটা পাছা উঁচু করে মাছের কানকো মাপছে, পেট টিপছে, হর্ন মারছি, শালার হেলদোল নেই! ওদিকে বাঁয়ে স্কুলভ্যানে ছাগল গাদানোর মতো বাচ্চা তুলছে। এদিকে বাসের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছি,

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’।

‘কি কণ্ডাকটার, সেই থেকে লোক তুলচো, বাসটা এবার চালাতে বলো’।

‘এবারে একটু টান বাপ, আধাঘন্টা হয়ে গেল এইটুকু আসতে’।

‘এ শালা গরুরগাড়ির ড্রাইভার নাকি রে’?

পাব্লিক বাসের বডি পেটাচ্ছে, ধপ ধপা ধপ।

 

আকাশে এসব আছে? কিচ্ছু নেই। তবু শালাদের এত মাঞ্জা কিসের? মেজাজ খিঁচড়ে লাভ নেই, যার যা নসিব। মাইনে যা পাই সে না বলাই ভালো। দিশি ছাড়া আর কিছু জোটে না। লাভের মধ্যে কমিশন। পার টিকিটে দশপয়সা। জয় মাকালী, এতক্ষণ প্যাসেঞ্জার ভালোই দিয়েচ, মা। মেট্রোতে গাড়ি খালি হয়ে যাবে। ওখানে যেন গুচ্ছের পাব্লিক ওয়েটে থাকে, মা, বাসে ঝাঁপিয়ে ওঠার মতো। আমার দরজার বাইরে লিখে রেখেছি পাইলট, ড্রাইভার নয়, পাইলট। লটে পাব্লিক যেন পাই, ওইটুকুনি দেখো, মা।

Latest posts by কিশোর ঘোষাল (see all)