[লেখার মাঝে অনেক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ইচ্ছাকৃত – শুধুমাত্র ঘটনা ও চরিত্রে প্রয়োজনে, এজন্য পাঠকদের কাছে আমি ক্ষমা-প্রার্থী]


কাচের দেওয়ালে হালকা টোকা, “আসব?”

“তুমিই পদ্মিনী? এস ভেতরে এস। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”

ভিতরে আসতে আসতে পদ্মিনীর জবাব, “ইয়েস স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ। তবে আপনি আমাকে মিনি বলতে পারেন-”

“মিনি? কেন? আমি তোমাকে খামোকা মিনি বলতে যাব কেন?”

“পদ্মিনীটা আমার বাবামার দেওয়া নাম হলেও বড্ড সেকেলে – আর ঐ নামে ডাকাও খুব মুশকিল – ফোনেটিকালি। তাই আমাকে বন্ধু বান্ধবীরা সবাই একটু ছোট করে এক সিলেবল বানিয়ে দিয়েছে – মিনি। এমনকি আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলেও মিনি লিখি আজকাল। ওটাই ভালো লাগে শুনতে- শর্ট, সুইট আর স্মার্ট।”

“না না, আমি ওসব জানতে চাই না – আমার প্রজেক্টে ওসব চলবে না”

“কেন স্যার?”

“মিনি বললেই কেমন যেন মিনিস্কার্ট টাইপ মনে হয়”

“মিনিস্কার্ট খারাপ কিসে স্যার?”

অরিজিৎ একটু মুখ তুলে তাকালেন – “আজকে প্রথম দিন তাই জানিয়ে দিচ্ছি – আমার মুখে মুখে তর্ক করবে না। আমার প্রজেক্টে থাকতে হলে শুধু মন দিয়ে কাজ করবে, বুঝেছ? কেউ তোমাকে ওসব মিনিটিনি বলে ডাকতে পারবে না আর তুমিও স্কার্ট পরে ছেলেদের ডেস্কে বসে আড্ডা দিতে যাবে না – মিনি আর মিনিস্কার্ট আর ইকুয়ালি কনডেমড।ইস দ্যাট ক্লিয়ার?

পদ্মিনী খানিক মুখ নিচু করে রইল, তারপর ঘাড় নাড়ল।

“শুধু মাথা নাড়লে হবে না – হ্যাঁ বা না বল”

“আচ্ছা, আপনি যখন বলছেন তখন আপনি পদ্মিনীই বলবেন, তবে আর কে কি বলে ডাকবে তার গ্যারান্টি আমি নিতে পারব না।ড্রেস কোডের ব্যাপারটা মাথায় রাখব”

“এই জন্যেই, ঠিক তোমাদের মত এইসব মেয়েদের জন্যেই টিমের মোরাল এত লো হয়ে যাচ্ছে- শুক্রবার এক একদিন মনে হয় জাস্ট ঘুম থেকে উঠে যা পেয়েছ হাতের কাছে পরে চলে এসেছ। আমি ওসব পছন্দ করি না।”

Lampat O lasyamoyi - small

“আমি কি একটু বসব স্যার? নাকি বাকি ইন্টারভিউটাও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?”

“আচ্ছা, বোস। এক মিনিট, এক মিনিট তোমার হাতে ওটা কি? স্টিকার ফিকার নাকি?”

“না না, স্টিকার হতে যাবে কেন? ট্যাটু স্যার।”

“ট্যাটু?”

“মানে পার্মানেন্ট মার্ক স্যার – ইট ইস নাও এ পার্ট অফ মি। আরও একটা আছে স্যার, কাঁধে। এই যে! আই থিংক ইট ডিফাইনস মি।”

অরিজিৎ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর আস্তে আস্তে বললেন – “তুমি কর্পোরেট পলিসি যান না?”

“কোন পলিসিটা স্যার?”

“তোমার শরীরে কোথাও ট্যাটু থাকলে ওরকমভাবে খুলে রাখা যাবে না যাতে সবাই দেখতে পায়। ঢেকে রাখতে হবে?”

“হাত কি করে ঢেকে রাখব স্যার?”

“যেভাবে আর দশটা মেয়ে রাখে, ফুল স্লিভ পরে। এটা অফেনসিভ – মনে রাখবে। আর হ্যাঁ, স্লিভলেস এমনিতেও অ্যালাওড না।”

“কেউ দেখলে অফেনসিভ না, আর আমি পরলেই অফেনসিভ?”

“দেখ, আমি এই নিয়ে তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। আমি যা বলব শুনে চলতে হবে। তোমার মত একটা মেয়ের জন্য আমার টিমের ওয়ার্ক কালচার খারাপ হবে আমি চাই না”

“ওকে, স্যার-”

“এখন বল – তুমি এই প্রজেক্টে জয়েন করতে চাও কেন?”

“নীলের জন্য।”

“নীলের জন্য? নাও হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?”

“ঐ যে সুনীল – ওর সাথে কদিন আগে আমার একটা পার্টিতে আলাপ হয়েছিল। ও কে আমার দারুণ লাগে, ও প্রমিসও করেছিল আমি এলে আমাকে নিয়ে নেওয়া হবে টিমে।”

“সুনীল মানে আমার টেকনিকাল লিড – ময়লা, লম্বা চেহারা, কোঁকড়ান চুল, সরু গলা?”

“হ্যাঁ ঐ – ওর সাথে আলাপ হয়ে দারুণ লেগেছিল”

“এক মিনিট, তুমি বিবাহিত না?”

“হ্যাঁ, স্যার”

“তবে তোমার সিঁথিতে সিঁদুর নেই কেন?”

“দ্যাট ইজ নান অফ ইয়োর বিজনেস স্যার। সিঁদুর পরা না পরাটা তো আমার পার্সোনাল ব্যাপার।”

“রিডিকিউলাস – ইট ইস আ সোশ্যাল অ্যান্ড মোরাল রেসপনসিবিলিটি। আমাকেই তো দেখতে হবে আমার প্রজেক্টে কে কি করছে। তোমার বর কোথায়? সে মাইন্ড করে না?”

“ও আর্মিতে – আর না ও কিছু মনে করে না। মেয়েদের বন্দী করে রাখার প্রথায় ও বিশ্বাস করে না।”

“বাহ – সিঁদুর পরা মানে বন্দী করে রাখা? এই বুঝেছ এত দিনে?”

“আগেকার দিনে মেয়েদের যুদ্ধে জিতে তাদের মাথা চিরে দেওয়া হত, আর্যদের সেই ট্র্যাডিশনই আজকের সিঁদুর পরা। কেন এইসব ভুলভাল নীতি মেনে চলব?”

“দেখ মিনি, চলবে না চলবে সে তোমার ব্যাপার। আমার প্রজেক্টে চলবে না। এটা আমার প্রজেক্ট – এখানে তুমি সিঁদুর না পরে অবিবাহিতা থেকে ফ্লার্ট করবে সে চলবে না”

“হোয়াট ক্র্যাপ?”

“যা বলছি, শুনেছ”

পদ্মিনী চোখ নামিয়ে নেয়। তার গলা ধরে আসে – যেন অনেক কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কোন কথাই মুখ ফুটে বলতে পারছে না।

অরিজিৎ গলা নামিয়ে হালকা করে পদ্মিনীর হাতে হাত রাখে –“সরি, আমি তোমাকে…”

পদ্মিনী কথা শেষ করতে দেয় না, “আর আপনারা যে শুক্রবার হলেই মেয়েদের দুচোখ দিয়ে গিলে খান, সেটা কি ভদ্রতা?”

“কি যা তা বলছ?”

“কেন গত শুক্রবার ঈশিতার পিছন পিছন আপনি সিঁড়ি দিয়ে ন-তলা উঠে আসেননি?”

“ঈশিতা? ঐ নামে আমি কাউকে চিনি না। আর এ তে কি প্রমাণ হয়? আমি তো এক্সারসাইজ করার জন্য উঠছিলাম।”

“এক্সারসাইজ মাই ফুট। আপনি ওর পিছন পিছন উঠছিলেন ওর টাইট জিনসের জন্য – তাই না? কমেন্টও তো পাস করছিলেন হালকা গলায়, বন্ধুদের সঙ্গে। কি ভেবেছিলেন শোনা যাবে না কিছু? শুনলেও কেউ কিছু বলবে না? কর্পোরেট হাউস? ভেবেছিলেন আপনাকে কেউ চিনতে পারবে না?”

“আ – আমি জানি না কি বলছ তুমি। ইন্টারভিউ ওভার। তুমি যেতে পার- তোমাকে আমার টিমে কোন দরকার নেই।”

“দাঁড়ান – এত সহজে কি? শুরুটা আপনি করেছিলেন, কিন্তু ইন্টারভিউ শেষ হবে, যখন আমি বলব। আপনি কি মনে করেন, মেয়েদের সাথে যা খুশি তাই করবেন? তাদের ভয় দেখিয়ে তারপর হাত ধরার চেষ্টা করেন? মেয়েদের পোশাক নিয়ে কমেন্ট করতে খুব ভালো লাগে, তাই না?”

“আমি তোমার কথার কোন মানে বুঝতে পারছি না – কি বলতে কি চাও তুমি?” অরিজিতের গলা কাঁপতে থাকে একটু একটু করে।

“সোজা কথা – আপনি একজন ক্রীপ। আপনার কি মনে হয় আপনার পজিশনের জন্য যে কোন মাইন্ড গেম খেলে আপনি পার পেয়ে যাবেন? আপনি মেয়েদের সামনে ছেলেদের বলেন না জাঙিয়া খুলে লুঙ্গি পরে শীর্ষাসন করতে? সেটা তো মেয়েদের ওপর নিজের ঠোঁটকাটা বয়ান দেখিয়ে সুযোগ নেওয়ার জন্যই। আপনার প্রজেক্টের জুনিয়ার ছেলেদের বলেন না কোন একটি মেয়েকে চায়ের দোকানে নিয়ে যেতে আর তারপর মেয়েটির সাথে জোর করে গল্প করেন, আনকমফর্টেবল সব প্রশ্ন করেন? বাজে বাজে জোক্ বলেন? এক একদিন তাদের আপনার নতুন গাড়িতে করে ঘুরিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার অফার দেন না?”

“কে – কে তুমি? এ সব কি যা তা বলছ?”

“আমি কর্পোরেট এইচ আর। অনেক কমপ্লেন পেয়ে আপনাকে ইভ্যালুয়েট করতে এসেছিলাম, ভেবেছিলাম ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেব, কিন্তু যা দেখলাম তাতে কোন অ্যাকশনই যথেষ্ট নয়। ট্যাটু নিয়ে এত সমস্যা, অথচ তখন থেকে কোথায় তাকিয়ে ছিলেন, আমি দেখতে পাইনি ভাবছেন? আপাতত: আপনার সাসপেনশন আপনি মেলেই পেয়ে যাবেন। নাও দা ইন্টারভিউ ইস রিয়েলি ওভার।”

গটগট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেরিয়ে যায় পদ্মিনি। অরিজিতের নড়বড়ে হাত খুঁজতে থাকে টাইয়ের নট’টা।


Latest posts by মনেস্প্রি (see all)