ব্যোমকেশ দেখলাম – নতুন ব্যোমকেশ। শুধু বয়সেই নতুন যে তা নয়, অভিজ্ঞতায়, চলনে বলনে বাঙালির কাছে এ এক নতুন ব্যোমকেশই বটে। হ্যাঁ, দিবাকর ব্যানার্জীর নতুন সিনেমার কথাই বলছি। যশ রাজের ব্যানারে এই নতুন সিনেমা – শুধু সিনেমাই, পাঠক হিসেবে তাকে শরদিন্দুর সাথে গুলিয়ে ফেললে একেবারেই চলবে না কিন্তু। সাহিত্য-ধর্মী কাহিনী থেকে সিনেমার পর্দায় উত্তরণের কিছু পদক্ষেপ আছে, দর্শক হিসবে পরিচালকের সেই স্বাধীনতাটুকু মন থেকে মেনে নিতে পারলে আজকের ব্যোমকেশ বেশ ঝকঝকে সিনেমাই বলতে হবে। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ সত্যান্বেষী – আর দিবাকরের ব্যোমকেশ ডিটেকটিভ। পরিচালক কিন্তু প্রত্যাশা পূরনের রাস্তায় হাঁটেননি একেবারে গোড়া থেকেই।

আজকের ব্যোমকেশ বললাম বটে – কিন্তু আদপে ১৯৪২ এর ঘটনা। প্রথমেই বলতে হবে, পুরনো কলকাতা তৈরি করতে বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক ও সেট ডিজাইনাররা। খুঁটিনাটির জোরে সময়টাকে মেনে নিতে অন্তত: অসুবিধে হয় না। কাহিনীকার দিবাকর ব্যানার্জী নিজেই। উনি কয়েকটি নাম ও চরিত্রই শুধু ধার করেছেন শরদিন্দুর কাছ থেকে। বাকীটুকু কল্পনা। সেই কল্পনার ব্যোমকেশ কলেজ পাশ করেছে, চাকরির চেষ্টায় আছে – প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে তার কষ্ট হয়। তারপর সেই কলেজেরই ছাত্র অজিতের বাবা ভুবন-বাবু নিখোঁজ হয়ে গেলে সে তদন্তে নেমে পড়ে – আর তারপর গোটা সিনেমা জুড়ে একের পর এক রহস্যের উন্মোচন।

বাসু চ্যাটার্জির ব্যোমকেশ দেখলে যেমন মনে হয় একেবারেই বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছেন রজিত কাপুর, সেখানে সুশান্তকে মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধে হয় বৈকি। বিশেষ করে সে যখন বুদ্ধির খেলায় মাঝে মাঝে হেরে যায়। কিন্তু এখানে এই পার্থক্যটা মেনে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। ব্যোমকেশ আর পাঁচজনের মত একজন কলেজের ছাত্র। তার সায়েন্স অফ ডিডাকশন যে প্রচণ্ড জোরালো তা নয় – বরং তার অস্ত্র হচ্ছে উপস্থিত বুদ্ধি এবং অনমনীয় জেদ। আজকাল ডিটেকটিভ বা থ্রিলারের নামে যেমন অনেকটা শ্যালকের (বেনেডিক্ট) কপি করতে নেমেছেন অনেক পরিচালক, সেখানে আমি বলব এই ব্যোমকেশের স্ক্রিন প্রেজেন্স বেশ ভালো।

বইতে পড়া দুটি গল্পের আদল এসেছে গল্পের কাহিনীতে আর সেই সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আন্তর্জাতিক টালমাটাল পরিস্থিতি। জড়িয়ে আছে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ব্রিটিশ সরকারের সাথে জাপানের দোলাচল – চীনে মাফিয়া। সব মিলিয়ে বর্ণাঢ্য পরিবেশ। এর মধ্যে কুহকিনী অঙ্গুরি-দেবীর চরিত্রে নেমে স্বস্তিকা দর্শককে একটু অন্যদিকে টানতে চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এরকম ঠাসবুনোন রহস্যের বাজারে স্বস্তিকায় মায়াবী অবতার কিন্তু এক রকম দর্শককে বিভ্রান্তই করে, বিশেষ করে সিনেমার শেষে যখন চরিত্রটি গল্পের একেবারেই অন্যরকম হয়ে পড়ে। যাক সে কথা।

আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার বেশ চমকপ্রদ – বিশেষ করে এক এক সময়ে তা বেশ উত্তেজিতও করে তোলে দর্শককে। যখন মনে হচ্ছে গল্প কোনদিকে যাচ্ছে, তখন এই আবহ সঙ্গীতই কিন্তু মোড় ঘুরিয়েছে গল্পের। তবে হ্যাঁ, গল্পের খাতিরে এতটা জটিলতা সৃষ্টি করতে গিয়ে কোথাও যেন একটু ঢিলে হয়ে গেছে কাহিনীর আবেদন – কারন এটা আগেও দেখেছি, খুব জটিলতা অনেকটা অসম্ভবের পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়; অর্থাৎ স্মাগলিং, মাফিয়া, খুন যখম অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক আবহটা না থাকলেই বোধহয় ভালো ছিল। তবে অন্যান্য গুনের জন্য বোধহয় এইটুকু ত্রুটি মাফ করে দেওয়াই যায়।

ব্যোমকেশের কথা তো বললামই। অজিত সে তুলনায় অনেক কাছাকাছি, তবে সে মাঝে মাঝেই উত্তেজিত হয়ে কেন মারামারি করে বসে, সেটা ঠিক বুঝলাম না। অনুকূলের চরিত্রে নীরাজ বেশ নজর কেড়েছেন। ব্যোমকেশ দেখতে চাইলে অবশ্যই দেখুন, তবে সিনেমা সিনেমাই – আর গল্প গল্প। ফেলুদার বা কাকাবাবুর নামে যেরকম হাস্যকর বাংলা সিনেমা দেখে আমরা বারবার বিরক্ত হয়েছি, সেখানে আমার তো মনে হয় পিরিয়ড ফিল্মের নামে ক্লাসিককে কাটাছেঁড়া না করে দিবাকর একটা ভালো সিনেমাই করেছেন। এখন দেখুন আপনাদের কি মনে হয়।

Latest posts by অভ্র পাল (see all)