একটা ক্রিকেট দলের তেমন তেমন খেলা হলে দেশের নাড়ী বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। হাসপাতালে ডাক্তার থেকে শ্মশানে ডোম কিছুই থাকে না প্রায়। এমন এমন দিনে যাদের ভোগান্তি হয় তারাই জানে সে কেমন বিষয়! আরও অজস্র খেলা আছে, যাদের খেলোয়াড়রা এই প্রচার ও অর্থের শতকরা এক ভাগ-ও পায় না। অথচ তারাও বছরের পর বছর খেলে যায়, জেতা-হারা মিলিয়ে চেষ্টা করে যায় ভাল খেলার। এবারে সেই দল হেরেছে। কিছু কিছু অতি রুচি-বিগর্হিত কাজ হচ্ছে। অনেকেই এতে খুব রেগে যাচ্ছেন। রাগার মত বিষয় আছে বৈ কি! তবুও রাগার আগে কয়েকটা কথা একটু ভাবুন।

যারা কলকাতার ফুটবল মাঠে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান বছরের পর বছর দেখে আসছেন তাঁরা জানেন মাঠের দর্শক কেমন হয়। জিতলে (ভাল খেললে-টেললে না) মাথায় তুলে নাচে, হারলে আক্ষরিক অর্থে মা-মাসি উদ্ধার করে। কানে আঙুল দিতে না পারলে নতুন অশ্লীল শব্দের অভিধানের সংস্করণ প্রত্যেক ম্যাচে জানা হতে পারে। এবং সে সব শব্দের বেশীরভাগটাই নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গ ও যৌনাচার বিষয়ী শব্দ। টার্গেট বেশীটাই নারী। হয় কেন? সাধারণভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তাই নারী-কেন্দ্রিক গালিগালাজ ক্ষমতাতন্ত্রের পরিচয়। তাছাড়া যে দর্শক মাঠে যায় তাঁদের বেশীরভাগের অর্থনৈতিক শ্রেণীটি দেখতে হয়। জীবনে কিচ্ছু নেই প্রায়। কিছু হবে এমন সম্ভাবনাও বেশ দূরের। তাদের কাছে ফুটবল ম্যাচ জেতা-হারা তাদের জীবন-মরণ। ঠিক যেমন সিনেমার নায়ক-নায়িকার মিলন-বিরহ, ভিলেনের সঙ্গে সংঘাতে অজান্তেই দর্শকমন নায়কের দিকে চলে যায় এবং একাত্ম বোধ করে ভিলেন ঠেঙানোর সময় একই রকম ভাবে এখানেও তাই হয়। তাই খেলোয়াড়রা ঈশ্বর। সেই খেলোয়াড়রা সময় বিশেষে শয়তান।

ক্রিকেটেও এই জঙ্গি দর্শক না থাকলে বাজারে উত্তেজনা থাকবে কোথা থেকে? উত্তেজনা না থাকলে এই খেলাটাকেই বা বিপণনের জন্য বেছে নেওয়া হবে কেন? ধরা যাক বিরাট কোহলি কবাডি খেলে, অনুষ্কার সঙ্গে প্রেমের ন্যূনতম সম্ভাবনা ছিল? ছিল না। পকেটের টাকা থেকে কেমন দেখতে এমন সব জিনিস নিয়ে বিচার করলে বিরাটের মত ছেলে হাজারে হাজারে আছে। অনুষ্কার মত মেয়েও তাই। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে শহরে এবং শহরতলীতে নানা গ্ল্যামারঘটিত কারবারে কেমন দেখতে হলে ভাল তার নির্দিষ্ট ধাঁচ (যাকে সৌন্দর্য বলে বিক্রি করা হয়) বানানোর এখন বহু রাস্তা। আবার তাদেরই সেই সব হওয়ার উপাদান – জিনস থেকে লিপস্টিক, পায়ের জুতো থেকে মুখের ক্রিম – সব বেচতেই তো এই বিরাট-অনুষ্কা জাতীয় আইকন বানিয়েছে বাজার। বিরাট কোহলি-অনুষ্কা শর্মারা এই বিপুল চেহারা-হীন বাজার ব্যতিরেকে অন্য খেলার কোন খেলোয়াড়দের থেকে, অথবা সিনেমা বাদে অন্যান্য পারফর্মেন্সের জায়গায় আলাদা কিছুই নয়। আজ এ কাজ ক্রিকেট দিয়ে হচ্ছে। কাল এ কাজ যদি কবাডি দিয়ে হয় বাজার সেখানেই যাবে, বিপণন তাদের নিয়েই হবে, গ্ল্যামারের আলোতে সেখানকার খেলোয়াড়রা পর্যায়ক্রমে ঈশ্বর-শয়তান হবে।

এর বাইরেও আছে নায়ক-নায়িকা খোঁজার বহু প্রাচীন তাগিদ। যখন খেলায় টাকা ছিল না তখন-ও উন্মাদ দর্শক ছিল। ফুটবলে বেশী ছিল। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে বাঙালির আভ্যন্তরীণ রাজনীতি, দেশভাগ এ সব জড়িয়ে ছিল। ক্রিকেটে কম। আবার ফুটবলে ভারতীয় দল খেললে এই আবেগ দেখা যেত না। ক্রিকেটও বেনসন-হেজেসের আগে ভদ্রলোকের খেলা ছিল। সেখানে যে স্বল্প সংখ্যক উন্মাদ দর্শক, তারা খেলোয়াড়দের সঙ্গে (আমি দেখেছি এঁদের অনেককে) খেলাটার প্রতিও উন্মাদ ছিল। অর্থাৎ তার উন্মাদনা খেলাটার টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান থেকেও আসত। এখন কিন্তু ঠিক তেমন না। যে নিজে কোনোদিন খেলাটা খেলেইনি হয়তো বা তেমন করে খেলেনি সেও খেলা নিয়ে টেকনিক্যাল আলোচনা জুড়ে দিচ্ছে। কমেন্টটরদের এবং পত্রকার দের বদান্যতায় অক্লেশে ভুলভাল বলে চলেছে। কেউ কেউ এখনো জানেন, সংখ্যাটা আগের মতই কম। আর কালে কালে যদি দেখেন যে মোহন-ইষ্টের উত্তেজনা চলে গেছে নতুন ফুটবল লীগে তাহলেও অবাক হবেন না। এভাবে বাজার ওঠে। দেশভাগ বাজারে বেচার ক্ষেত্রে খুব চাপ আছে। তার চেয়ে এ বেচা অনেক সস্তা।

তা সে যাই হোক, নায়ক-নায়িকা যারা হন তাঁরা যে কারণে নায়ক-নায়িকা সেগুলো মোটের উপর এরকম। নইলে জীবনে সত্যি নায়ক-নায়িকা কম নেই। জীবনের নানা পেশায়, নানা কর্মে যুক্ত অসংখ্য মানুষ নীরবে নিভৃতে তাঁদের কর্ম করে চলেছেন। এমন কর্মনাশা, কর্মকে সম্মান না করা দেশেও বহুজনায় এখনো কাজ করেন। করেন বলে ন্যূনতম যা যা পাচ্ছি, পরিষেবা থেকে নিরাপত্তা সব জুটছে। না হলে যে এটুকুও জুটত না। ভেবে দেখুন – দুর্নীতি, বজ্জাতি, দলবাজির বিপুল পর্বতের আড়ালে যারা এখনো দিনের পর দিন কাজ করে চলেছেন তাঁদের মত বড় নায়ক-নায়িকা কোথায়? কিন্তু আলো নেই সেখানে। নেই কেন? না সেখানে আলো পড়লে যে উলটোরথ চলবে না। ধরুন যদি বুঝতে পারেন এ দেশে এখনো শতকরা সত্তর জন সৎ অথবা বহুলাংশে সৎ, তাহলে কালকে আপনারও কি ভয় একটু কমবে না? আপনিও কি একটু বেশী জোরে নিজের কাজের জায়গায় কাজ করবেন না? অথচ সত্যিই তাই। না হলে এত বিপুল দেশ কিছুতেই চলতে পারে না।

দুর্নীতির পাহাড় উপর মহলে। নীচ তার তাঁবেদারি করে মাত্র। সে নীচের পরিমাণও বিপুল না। একটা সরকারী অফিসে পঞ্চাশ জন থাকলে প্রকাশ্যে বজ্জাত কিন্তু এখনো দু-তিনজন। তারা এমন চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যে বাকীরা ভয়ে ভয়ে মেনে নেয়। কেউ কেউ মানতে পারে না বলে কষ্ট পায় নিজের ভেতরে। বেসরকারি ক্ষেত্রে যারা জানে কোম্পানির অন্যায্য ও অশ্লীল মুনাফা বৃদ্ধিই তাদের চাকরী তারাও দিনের শেষে বহুজনই অস্বস্তিতে থাকে। নিজে নিজেকে এবং অন্যদের নানা কথা বলে সান্ত্বনা দেয়। করেছি, বেশ করেছি, কেন না আমিই একমাত্র বাঁচার অধিকারী, বাকি সব চুলোয় যাক, এ কথা প্রকাশ্যে বলার মত লোক এখনও বেশ কম। যারা বলে তারা দেশের উন্নতি থেকে অর্থনীতির উন্নতির নানা হাবিজাবি আঁক কষে বলে। অর্থাৎ যদি এ সবের ব্যাপার না থাকত তাহলে সে কখনোই এ কথা বলত না। সোজাসুজি, আমি যেভাবে হোক বাঁচব, বাকীদের মেরেই বাঁচব, এতো স্বয়ং রাষ্ট্রশাসকরাই বলতে পারে না। পারে না বলে তাদের আইন-কানুন, তাকে রক্ষা করার ভড়ং এ সব লাগে। তাহলে এক নাগরিক একলা বলবে কি করে? এ সব কথা যদি জানা হয়ে যায় তাহলে কাল থেকে আপনিও ভয় একটু কম পাবেন। আপনিও আপনার কাজের ক্ষেত্রে গলাটা পরিষ্কার করে বলতে পারবেন, যে – ‘বলছেন বটে মিস্টার অমুক বা মিস তমুক, কিন্তু কাজটা তো ঠিক কাজ না। আমি এ কাজ করব না।’

এইটা যাতে আপনি বলতে না পারেন তাই দুর্নীতি নিয়ে এত ধাক্কাধাক্কি। যেন দেশের আগাপাছতলাই দুর্নীতির গাছ, যেন দেশের একশো শতাংশই ঘোটালা করে বাঁচে, যেন কেউ শুধু নিজের শ্রমে আর বাঁচে না, সবাই শুধু নির্লজ্জ মুনাফাভোগীতে পরিণত হয়েছে – এমন একটা আবহাওয়া চারপাশে। তাই আপনি সঙ্গোপনে আপনার গাড়ির ড্রাইভার, রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের সহযোগী এঁদের সবার মত দিনের শেষে নায়ক-নায়িকা খোঁজেন। তাদের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে, ভিলেন যখন যেমন, অস্ট্রেলিয়া থেকে অমরীশ পুরী মেরে, দিনের শেষে ক্যাথারসিস নিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করেন। আর আপনার রেডিমেড নায়ক-নায়িকা আছেও। বাজার হাতের কাছে সাজিয়ে দিয়েছে। তো সেই নায়করা যেমন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে পুজো পাবেন, কালে কালে লাথিও তো খাবেন। আপনার বা আপনার মত যাদের চাহিদা পূরণ হল না তাদের পুজো পেতে অখুশি না যখন আইকনরা বা সেলেব্রিটিরা কেউ, লাথি খেলেই বা রাগ করবেন কেন বলুন! ওঁরা রাগ করেন না। বেশী রাগ তো একেবারেই করেন না। করলেও বেশী করে সে সব খবর হবে না। করলে বা হলে, বিজ্ঞাপন চলে যাবে। কোটি কোটির বিলাস চলে যাবে।

যারা বিরাট-অনুষ্কাকে নিয়ে কুরুচিকর কান্ড করছে তাদের উপর রাগ করার আগে আরেকটা দিক-ও ভাবুন। বলুন তো ক্রিকেটে যে এত টাকা, খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয় কি দিয়ে? ক্রিকেটে সে কি এমন কাজ করছে যা রামা-শ্যামা-যদু-মধুরা নিয়মিত করে না তাদের জীবনে? প্যারামিটারটা ঠিক কি? দেখবেন, সেই বাজার এসে যাবে। তাই না অনুষ্কা শর্মা স্যুইম স্যুট পরে ছবি ছাপান। নইলে উনি সাঁতার যত খুশী কাটুন না, তার ছবি তুলতে দিয়ে এবং ছাপিয়ে কি হবে? বলবেন না প্লিজ যে স্যুইম স্যুট পরে ছবি তোলা কি গণতন্ত্রে নিষিদ্ধ! একদম না। কিন্তু নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে লিঙ্গ-চেতনা এবং যৌন-চেতনা তো আছেই। না থাকলে, এই আদিমতম শ্রেণী-দ্বন্দ্বে তো একদল আরেকদলকে, মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বের মতই নিকেশ করে ফেলার ডাক দিত। দিতে পারা যাবে না। দিলে স্পিসিসটাই উবে যাবে এই গ্রহ থেকে। অতএব লিঙ্গ-চেতনা ও যৌন-চেতনা থাকবেই।

তা অনুষ্কা শর্মাকে স্যুইম স্যুটে, বা বিরাট কোহলিকে ধরুন জাঙ্গিয়ায় যারা দেখবেন সকলে কি এঁদের ভাই-বোন, যে নিষ্কলুষ শ্বেত পাথরের মূর্তির মত দেখে মালা-টালা পড়িয়ে বিদায় নেবেন? মনে মনে ভাববেন না যে, ইশ‌, একে যদি বিছানায় পেতাম তাহলে না জানি কি হনু হতাম? ভাববেন তাঁরা। আমি রাগলেও ভাববেন, না রাগলেও ভাববেন। এবং ভাববেন জানা আছে বলেই না উনি স্যুইমস্যুটে, রোনাল্ডো জাঙ্গিয়ায় সেজে ছবি তোলেন। এইভাবে জনপ্রিয়তা ও বাজার বাড়ানোর খেলা খেলা হয়। এইভাবেই রাজ কাপুরের সিনেমায় মন্দাকিনী সন্তানকে স্তন দেখিয়ে দুধ খাওয়ায়। এতো সোজা খেলা। এ খেলা যদি কোটি কোটি অর্থ দেয়, তাহলে কিছু নোংরাও দেবে। ওই অজানা প্যারামিটার যুক্ত অকারণ কোটি কোটি নিতে হলে এ নোংরাও নিতে হবে। যে পুজোর যে ফুল তাই তো দেওয়া হবে। কাজেই একজন, দুজন বা কিছু লোককে শুধু দায়ী করলে বোধহয় ঠিক হবে না। এদের যৌন অবদমন থেকে শুরু করে রুচিহীনতা যেমন আছে, তা কেন আছে ও থাকায় কারা লাভবান হয় সেই সিস্টেমটাকেও দেখতে হবে। যাঁদের ভিকটিম হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে তাঁরা এই সিস্টেম থেকেই তো উপকৃত। তাহলে ভিকটিম কেন? বিচারটা যেন একপেশে হয়ে যাচ্ছে মনে হল।

Latest posts by শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ (see all)