সেটা ১৯৮৬ সাল। আমাদের চাকরিতে প্রায়ই বদলির সংস্থান থাকে, বদলি হতেই হয়। আমার বদলি হল বর্ধমানে। অল্প কয়েকদিন পরেই আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল, হুগলি জেলার এক প্রান্তিক এলাকায়। জায়গাটা ব্যবসা বানিজ্যের জন্য সুবিধেজনক হলেও সে সময়ে জনসংখ্যা খুব একটা বেশি ছিলনা। একটু রাতের দিকে স্টেশনে গেলে মনে হত, এক্ষুণি এখানে ভূতের কাহিনী নিয়ে কোনও সিনেমার শূটিং হবে। স্টেশনের প্রায়ান্ধকার ঘরগুলোর পেছন থেকে মনু মুখার্জী একটা আলোয়ান গায়ে দিয়ে লন্ঠন উঁচু করে ধরে বেরোলেন বলে। আর অন্ধকারে অশ্বত্থ গাছের ডাল থেকে একটা পেঁচা ডেকে উঠবে তৎক্ষণাৎ।

সেই প্রায় জনমানব শূণ্য স্টেশন, যেখানে বিশেষ কয়েকটি ট্রেনের সময় ছাড়া মানুষ কেন কুকুরও দেখা যায়না, সেই স্টেশনের টিকেট কাউন্টারের পাশে একদিন দেখি, ‘ঋতুবন্ধ’, ‘ম্যাড্রাসি ডাক্তার’, ‘গোপনে মদ ছাড়ান’  এই সব বিজ্ঞাপনের পাশে হলদে কাগজের ওপর লাল দিয়ে দেবনাগরী অক্ষরে ছাপা, ‘গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যাঁয়’। ওপরে একটা ওঙ্কার চিহ্ন।

বেশ ঘাবড়েই গেলাম। ঘাবড়ানোর কয়েকটা কারণও ছিল, যেমন বাংলার মফঃস্বল অঞ্চলে টিভি প্রতিটি ঘরে ঢুকে পড়ার আগে পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ হিন্দি বলতে পারতনা, অন্য কেউ বললে যতদূর বাংলার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়, ততদূর বুঝত। হিন্দী লেখার পাঠোদ্ধার তো দূর অস্ত। সে সময়ে সব না হলেও কিছু বাড়িতে টেলিভিশন ঢুকতে শুরু করেছে, তবে কেব্‌ল চালু হয়নি, তাই শুধু দূরদর্শনের বাংলা অনুষ্ঠানই দেখে তখন লোকজন। এই পান্ডব-কৌরব উভয়পক্ষ বর্জিত জায়গায় হিন্দী পোস্টার? কে পড়বে এগুলো ? শুধু তাই নয়, আমার মাথায় ঢুকলনা, আমি যে হিন্দু, সেটা গর্ব করে বলার কী আছে। যেমন আমার পদবী সরকার, এটা নিয়ে কি কোনও গর্বের জায়গা আছে? নেই। তেমনি আমার বাবা হিন্দু বলেই তো ইস্কুলে রিলিজিয়নে হিন্দু লিখতে হয়েছে, বাবা ক্রিশ্চান হলে আমিও তাই হতাম। তো গর্বটা কিসের?

ওখানে একলাই থাকতাম আর এক জনের সঙ্গে শেয়ার করে। সে আবার প্রায়ই কলকাতা চলে আসত, তাই আমি পুরোপুরি একা। বাড়ি গিয়ে খুব চিন্তায় পড়লাম এই পোস্টার নিয়ে। ভেবে দেখলাম ‘হিন্দু’ ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ লাগেনা আমার। দুগ্‌গোপূজো, ধুনুচি নাচ, খিচুড়ি, কোলাকুলি, কালীপূজোয় তুবড়ি কম্পিটিশন, তাপ্পর ভাইফোঁটা, ইস্কুলে পড়া বয়সে সরস্বতী পূজোয় মেয়েদের ইস্কুলে ভোগ খেতে গিয়ে একটু ইয়ে, তাপ্পর দোল – এইরকম অনেকগুলো ব্যাপার বোধহয় যারা হিন্দু নয়, তাদের নেই। না থাকলেও আমাদের মেহবুব, আমাদের ফ্রান্সিস, এরা তো দিব্যি এইসব অনুষ্ঠানে চুটিয়ে আমোদ করে। তা করুক গে, কিন্তু প্রশ্ন হল এই নিয়ে গর্ব করব কেন? আসলে আমি অনেক বড় বয়স পর্যন্ত রাজনীতিমূর্খ ছিলাম। কাগজের প্রথম পাতা পড়তাম না, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম জানতাম না, বিজেপি বলে যে একটা পার্টি তৈরী হয়েছে, সে খবরই রাখতাম না, ভোটের সময়ে গিয়ে ব্যালট পেপারে প্র্যায়ই নানা রকম দুষ্কর্ম করে আসতাম।  এই কারণেই এমন অদ্ভুত হিন্দী পোস্টার দেখে বেজায় ঘাবড়ে গেলাম। আরও ঘাবড়ে গেলাম এই কারণে, যে আমার মত কিছু বহিরাগত ছাড়া ওখানে এটি কেউ পড়তেই পারবেনা। তবে কে সাঁটল এই পোস্টার এবং কেন?

ওখানে আমার ঘরে একটা কাঠের তক্তপোষ ছিল। বাড়ি থেকে একটা খেশ আর একটা ফোলানো বালিশ নিয়ে গেছিলাম। শীতকালে একটা শাল গায়ে দিয়ে ঘুমোতাম। সেই তক্তপোষে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে লাগলাম, হিন্দু ব্যাপারটা কী আসলে। বিভিন্ন ইতিহাসের বই পড়ে আমার যা ধারণা জন্মেছিল, তা হল ‘হিন্দু’ কোনও ধর্মের নাম নয়। যাঁরা বলেন পারসিকরা ‘স’ উচ্চারণ করতে পারতনা বলে সিন্ধু নদীর অববাহিকায় থাকা মানুষদের ‘হিন্দু’ বলতে শুরু করেছিল, তাঁরাও ১০০% ঠিক নন সম্ভবতঃ।  তবে ইতিহাস ঘেঁটে এটুকু পাচ্ছি, সেকালে মুসলমানরাও ‘হিন্দু’ হত। বিখ্যাত ইসলামিক হিস্টোরিয়ান ফরিস্তা-র পুরো নাম ছিল, মুহাম্মদ হিন্দু শাহ ফরিস্তা। যেমন, কামাল জালালাবাদি, যেমন সুর্মা ভোপালী, ঠিক তেমনি হিন্দু ফরিস্তা অর্থাৎ এই লোক ‘হিন্দ-ই-স্তান’ (‘হিন্দুস্থান’ নয়) এর বাসিন্দা।

সে যাই হোক। আন্ডার পপুলার পারসেপশন, আজকাল হিন্দু হচ্ছে একটা ধর্মের নাম। আগেকার ব্রাহ্মরা ‘হিঁদুয়ানী’ বলে বেজায় উন্নাসিক মতামত রাখতেন এ আমি পুস্তক আর সিনেমার দৌলতে জেনেছি। তা হিন্দু ধর্মটি কেমন? আমি কিন্তু এখন থেকে যা বলব, তা আমার নিজের চোখে, আমাদের সময়ে দেখা ঘটনা বা উপলব্ধির কথা। আমাদের ছেলেবেলায়, একবার  জীবনে প্রথম রামমন্দির দেখে এক বন্ধুকে বলেছিলাম, এ কীরে, রামের আবার মন্দির কেন রে, লোকে তো ভুতে ধরলে ‘রাম রাম’ করে। বিহারিদের হনুমান পূজো নিয়ে তো আমরা সেরদরে পেছনে লাগতাম। তারা ধুতিতে মালকোঁচা মেরে তাড়া করত, আমরা পালাতাম। আমাদের দূর্গাপূজোর মত ( যেটা সম্ভবতঃ ১৫৩৮ সালে পৃথিবীতে প্রথম চালু হয়) লার্জ স্কেল বারোয়ারী উৎসব ভূ ভারতে ছিলনা, টিলক মশাই নাকি ‘জাতীয় সংহতি’ রক্ষা করার জন্য ‘বোম্বে’ তে প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে গাবদা গাবদা গনেশ বানিয়ে বারোয়ারী শুরু করান। তাতে জাতীয় সংহতি কীভাবে রক্ষা হচ্ছিল, নেহাত বুদ্ধি কম বলে বুঝতে পারিনি। তবে সেটাও আমাদের থেকে টুকে।

 আমাদের হিন্দুপনা দুগ্‌গা ঠাকুরকে নিয়ে, যে একাধারে আমাদের মা আর মেয়ে। তার হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর, যাবার সময়ে মুখে পান মিষ্টি। আমাদের হিন্দুপনা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের ‘শ্যামা কালী’কে নিয়ে, একেবারেই বাঙালি কালী, পুরাণ বর্নিত, করালদ্রংষ্ট্রা, লোলজিহ্বা কালী না। পাশাপাশি রাসমণির ভবতারিনী তো আছেনই। আমাদের কেষ্ট হামাগুড়ি দেয়া গোপাল, বা নবদ্বীপের শ্যামরাই। আমরা জোয়ানমদ্দ নীল রঙের শঙ্খচক্রগদাপদ্ম ধারী পালোয়ান কেষ্টকে চিনিনা। আমরা বাঙালি। আমাদের লোকাল কিছু ঠাকুর ছিল, এক ছিল পঞ্চানন ঠাকুর, কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের আনাচে কানাচে গন্ডায় গন্ডায় পঞ্চাননতলা। সে ঠাকুরের গায়ের রঙ টকটকে লাল, তার ভাঁটার মত চোখ, তার ইয়াব্বড় পালোয়ানি গোঁফ, তার পঞ্চানন নাম হলেও সে কোনও দিন শিব না। ইদানীং ধীরে ধীরে সেই ঠাকুর হাইজ্যাক হয়ে শিব বনে যাচ্ছে বেমালুম। আমাদের ধম্মোঠাকুর কষ্মিনকালে ধর্মরাজ ‘যম’ না। সেও হাইজ্যাক হচ্ছে। উত্তর ভারতীয়দের পাড়ায় আমাদের বাঙালি সিংহবাহিনী কে সরিয়ে শেরাওয়ালী জয় মাতাদি গেড়ে বসছে। আমরা ভাই হিন্দু না, আমরা বাঙালি।

মরেও যে মরেনা, সেই বালকের দলের লোকেরা মাঝে মাঝে দেয়ালে কালো কালিতে লিখত, ‘বাঙালি গর্জে ওঠো’। তার তলায় অন্যদের লেখা কাঁচা ঘুম সম্পর্কিত মন্তব্য এখন ক্লিশে। বাঙালি ‘হিন্দু’ তার নিজস্ব কালচার নিয়ে দিব্যি ছিল। যদি গর্বিত হয়ে হয়, আমি তাতেই গর্বিত। বাঙালির হিন্দুয়ানি একটা কালচার, যারা দুগ্‌গোপুজো করে, তাদের ক’জন ধর্ম-উৎসব হিসেবে সেটা করে? মুশকিল হচ্ছে, কিছু তীব্র আঁতেল নিজের নাস্তিক বলেন, তাঁরা পূজো ফুজো মানেন না। আমাদের কমিউনিস্টরা ‘দ্বিতীয়া তিথি’তে ভাইফোঁটা নেন, কিন্তু পূজোকে বলেন শারদোৎসব। আর কিছু পদলেহি বাঙালি, উত্তর ভারতীয় আগ্রাসনকে আসন পেতে আমন্ত্রণ জানায়, ঘরের উমা কে ছেড়ে ‘জ্জে মাতাদি’ বলে হুঙ্কার ছাড়ে।

গর্ব করে বল, আমি বাঙালি।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আমরা প্রায়ই শুনি, ‘কমিউনাল রায়ট’। বাংলা কাগজগুলো লেখে ‘জাতিদাঙ্গা’। কথাটার মানে কী? চট্‌ করে কমিউনাল রায়ট কথাটা শুনলে, অ্যাট দা ব্যাক অফ ইয়র মাইন্ড হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা মনে হবে নিশ্চয়ই। অনেকে চুরাশি সালের হাজারে হাজারে শিখ নিধনকে ‘দাঙ্গা’ বলে চালিয়েছে। ওটা দাঙ্গা ছিলনা। দাঙ্গা মানে দুপক্ষ দুপক্ষকেই মেরেছে। এমনকি গোধরার মাচ পাবলিসাইজড দাঙ্গাতেও শ’আড়াই হিন্দু মরেছে। শিখ জেনোসাইডে একজন শিখ একটা হিন্দুরও একগাছা চুল ছেঁড়েনি। আসলে ওটা জাতিদাঙ্গা ছিলনা, কংগ্রেস পার্টি হাজার হাজার শিখকে মেরে ফেলেছে।  বোম্বেতে কিছু টেরই পাওয়া যায়নি, কলকাতায় কংগ্রেসের লোকেরা নিজেদের এলাকায় ক’টা দোকান পুড়িয়েছে মাত্র, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও তেমন কিছু খুন খারাপি হয়নি। শুধু দিল্লী হরিয়ানা ও কুমায়ুন অঞ্চলে ব্যাপক হারে শিখ নিধন হয়েছে। তার কারণ অন্য সব দাঙ্গার মতই বেসিকালি ইকনমিক। তবে দাঙ্গা মানে কি শুধুই হিন্দু-মুসলিম মারামারি ?

এখানে একটা কথা বলব, প্রথমেই বলে রাখি,  এটা উইকি-বিদ্যে নয়। এবার তাহলে বইয়ের রেফারেন্স দেয়া প্রয়োজন। তাও সম্ভব নয়, কারণ আমার নিজের সংগ্রহেই কয়েক শো(হাজারও হতে পারে) বইয়ের কোনই সংরক্ষণ নেই। মাঝে মাঝে ধূলো ঝেড়ে কোনও একটা বের করে দেখা যায়, বইপোকারা একটা অক্ষরও গোটা রাখেনি। কাজে কাজেই রেফারেন্স ছাড়াই বলি, ভারতের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দাঙ্গা হয়েছিল শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে। বহু মানুষ মারা গেছিল, সংখ্যাটা ভয়াবহ। ইস্যু ছিল উত্তর ভারতে একটা জায়গার নাম ‘হরিদ্বার’ হবে, না ‘হরদ্বার’। এখন অবশ্য ওই দু-রকম নামই চালু আছে। সেটা হয়েছিল, কারণ তখন কেউ নিজেদের ‘হিন্দু’ ভাবতনা। আমি শৈব, ও বৈষ্ণব, সে গাণপত্য, অমুক লিঙ্গায়েত, এমনি। পরে আবার এর মধ্যে ‘শাক্ত’ এসে জুটল বৌদ্ধ ধর্মের বাইপ্রডাক্ট হিসেবে, সে অন্য কথা। কোনও তেমন টেনশন না থাকলেও একটা লক্ষ্যণীয় তফাত দেখা যায় দক্ষিণে গেলেই। আইয়ার আর আয়েঙ্গারদের কপালের আলাদা তিলক দেখেই।

তাহলে গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যায় মানে? হম আইয়ার হ্যাঁয় না আয়েঙ্গার হ্যাঁয়? আসলে এখনকার ‘হিন্দু’ হচ্ছে নন-মুসলিম, নন ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ড নন বুদ্ধিস্ট পপুলেস অফ ইন্ডিয়া।

এখনকার কলকাতাবাসী বা সে হিসেবে বাঙালিরা বুঝবেন না, আমাদের বয়সকালে হনুমান পূজো টুজো কেমন উপহাসের বস্তু ছিল। রামও ছিল স্পাইডারম্যান বা সুপারম্যানের মত কেবল একজন কমিক বুক হিরো। তাকে পূজো করতে হবে তা আমরা জানতাম না। ধীরে ধীরে তারা জায়গা করে নিল বাংলায়। শুধু কি তারা?  এর পরে আসছি আরও বিশদে।

পাবলিকে শুনলে বলবে, ধুর মশাই অত হীনমন্যতায় ভোগেন কেন? ভাগাভাগি কার নেই? মুসলমানদের শিয়া-সুন্নি নেই? ক্রিশ্চানদের ইউনিটারিয়ান-ট্রিনিটারিয়ান কিংবা ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট? বৌদ্ধদের মহাযান-হীনযান নেই কি? এছাড়া এই সব ধর্মের অফশূট হিসেবে, আহ্‌মেদিয়া, সুফি, বাহাই ফেথ, ব্রাহ্মধর্ম – ও রকম সব ছোট ছোট গ্রুপ ধর্মপালদের হাত ধরে নিয়ত আসছে। জৈন, শিখ, এসব তো আছেই। তাতে হয়েছেটা কী? গর্ব্‌ সে বোলো হম হিন্দু হ্যাঁয়।

কিন্তু নাঃ সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। আমরা বোধহয় সকলেই শুনেছি আগরওয়ালদের নাম। আমাদের সম্ভবতঃ ধারণা ছিল, এরা মাড়োয়ারি (মাড়ওয়ারি)। মাড়ওয়ারি কারা? রাজস্থানে আরাবল্লি পর্বতমালা মেঘ আটকে দেয়ার একটা দেওয়াল ছিল কিছুদিন আগে পর্যন্ত। এখন আর নেই। আরাবল্লি রেঞ্জটাই কিছুদিনের মধ্যে কেটে সমতল বানিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং হবে। তবে এটা আবার অন্য গল্প, এখানে নয়। সেই আরাবল্লির আগে পর্যন্ত মেঘ থাকত, বৃষ্টি হত। আরাবল্লির ওপাশে মেঘ সচরাচর যেতনা, বৃষ্টি কবে হবে তা নিয়ে ঈশ্বরেরও সন্দেহ থেকে যেত এককালে ( এখন নয়)। যেদিকে বৃষ্টি হত, সেটা মেবার (‘মেবার পতন’ মনে আছে তো?) আর যেদিকে হতনা, সেটা মাড়ওয়ার।

বৃষ্টি যেবার হতনা, স্বভাবতই তখন খরা। তখন চাষ হবেনা কিন্তু পেট তো চালাতে হবে। তাই কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবি সম্প্রদায় ঋণ নিত। এমনিতে কে ঋণ দেবে,তাই জমি বন্ধক। তার পরের বছরও যদি মেঘ দেওয়াল টপকাতে না পারে? তখন ‘বাবু কহিলেন বুঝেছ উপেন’। কিন্তু না, বাবু তো তাও ‘কিনেছিলেন’। মাড়ওয়ার নন্দনরা তো এমনিতেই পেয়ে যেত, বন্ধক আছে যে। তা ছাড়া দলিলে কী লেখা হয়েছে, কত দশমিক সুদ, তা কি টিপসই চাষি পড়তে পেরেছে? কারা এই মাড়োয়ারি ? সবাই নয়। যারা ঋণ নিত, তারাও তো সেই অর্থে মাড়ওয়ারি, কেননা ‘মাড়ওয়ার’ প্রদেশের বাসিন্দা তারাও। কিন্তু তাদের কি আমরা মাড়ওয়ারি বলি? – না।

একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে বক্তব্য। যাঁদের ধৈর্য থাকবে, দয়া করে তাঁরাই পড়বেন, অন্যদের বিরক্তি উৎপন্ন হলে বেশিদূর যাবার প্রয়োজন নেই । আমরা যাদের, মানে আগরওয়ালদের মাড়ওয়ারি বলে জানি, তারা কিন্তু অতীতে হরিয়ানা থেকে মাইগ্রেট করে এসেছিল। তাই এখনও বেশ কিছু আগরওয়ালের চেহারায় হরিয়ানভি জেনেটিক সিগনেচার দেখা যায়। আরও একটা মজার কথা বলি, আগরওয়াল কিন্তু শুধু রাজস্থানে নেই, বিহার ইউপিতেও বেশ কিছু আগরওয়াল আছে। ঠিক যেমন বিহারি ‘শিখ’ হয়, রাজস্থানী শিখ হয়,(জানতেননা?) তেমনি। এগুলো অবশ্য ব্যাপক ঘোরাফেরা না করলে জানা যাবেনা। আসলে রাজা অগ্রসেন এর সাড়ে সতের জন পুত্রের বংশধররাই আগরওয়াল। এবং তাদের সাড়ে সতেরটি গোত্র। পুত্র এবং গোত্র ‘সাড়ে’ কী করে হয়, জিজ্ঞাসা করিয়া লজ্জা দিবেন না।

এঁরা আবার সবাই ‘আগরওয়াল’ পদবিধারী নন, সুরেকা, মিত্তল, কুচ্চল, এইসব পদবিধারীরাও আদপে আগরওয়াল। আসলে এখানে একটা ভাঁওতা আছে, এইসব সাড়ে সতেরটি গোত্র ভুঁই ফুঁড়ে ওঠেনি, মিত্তল আসলে ‘মৈত্রেয়’ গোত্র। কুচ্চল আসলে ‘কাশ্যপ’ গোত্র। ম্যাংগো পাবলিককে বোকা বানাতেই এই ‘পরিবর্তন’। এঁদের ধারণা এঁরা জাত পাতে শ্রেষ্ঠ ভারতবাসী। আমি অন্ততঃ জনা দুই আগরওয়ালকে, ‘ব্রাহ্মণ’ জাতিকে ‘নিচু জাত, ভিখমাঙ্গা’ বলে উল্লেখ করতে শুনেছি।


(পরের পর্ব পড়ুন এখানে)