‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ আমি দেখতে গিয়েছিলাম দুটো কারণে – এক, এটা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সিনেমা (লোকটাকে আমার হেব্বি লাগে), আর দুই, সিনেমার ট্রেলারটা বেশ মনে ধরেছিল। তাছাড়া ‘মিরাক্কেল’ আর ‘দাদাগিরি’তে এই ফিল্ম ইউনিটের অভিনেতারা এসে সিনেমাটা সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল কথাও বলেছিল। তবে সেগুলোকে অবশ্য পাত্তা দিইনি, নিজমুখে নিজের সিনেমার নিন্দে কেউ করে, তাও আবার রিয়েলিটি শোতে এসে? যাই হোক, রবিবারের এক সন্ধ্যায় সিনেমাটা দেখার জন্য আন্ধেরী ওয়েস্টের ‘ইনফিনিটি মল’-এ পৌঁছে গেলাম। বেশ ছিমছাম জায়গাটা, ওই যাকে বলে ছোট্টর ওপর গুছিয়ে। একটু এদিকসেদিক করে, ‘কাপে কফি দে’-তে কফি আর সামোসা খেয়ে, মুম্বইয়ের বং ব্রিগেডের কলকাকলী শুনতে শুনতে ঢুকে পড়লাম প্রেক্ষাগৃহে।

কিছু কিছু সিনেমা থাকে, যেগুলো দেখতে বসলেই সিনেমার চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে, এবং নিজের পরিচিত মানুষজনকে একাত্ম করা যায়, যার ফলে মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে ওঠে। ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ ঠিক সেরকম একটা সিনেমা। সেই উত্তর কলকাতার গলিঘুঁজি, গায়ে-গায়ে পুরনো আমলের সব বাড়িঘর, একটা বাড়ির ছাদ থেকে অন্য বাড়ির ছাদে যেখানে লাফ মেরে চলে যাওয়া যায়,  প্রতিবেশীদের মধ্যে একটা টক-ঝাল-মিষ্টিমধুর সম্পর্ক থাকে। চরিত্রগুলো দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই মনে হবে, “আরে, এ তো আমাদের পাড়ার অমুকবাবু কিংবা অমুকদা অথবা তমুকবৌদির মতন!” ঘটনাগুলোও বেশ নিজেদের জীবনের সঙ্গে মেলানো যাবে।

OTB

কিন্তু ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এর মূল আকর্ষণ অন্য জায়গায়।  আমরা, যারা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছি, তারা এই ছবির পরতে পরতে নস্ট্যালজিয়া খুঁজে পাবে। অনেক পুরনো, মনের এককোণে দায়সারাভাবে পড়ে থাকা ঘটনা তাজা হয়ে যাবে সিনেমাটা দেখতে দেখতে। লাফিং ক্লাব, একমাসব্যাপী সাইকেল চালানো, মিলে সুর মেরা তুমহারা, কুছ খাস হ্যায় জিন্দেগী মে, সন্ধে সাতটার বাংলা খবর, কলকাতা ‘ক’, গণেশের দুধ খাওয়া, সূর্যগ্রহণের সেই বিখ্যাত ডায়মন্ড রিং – আরো অনেক ভুলে যাওয়া ঘটনা ছবির মতন চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ছবিটা দেখতে দেখতে মনে মনে বলে উঠেছিলাম, “কোথায় ছিলে ওস্তাদ, এতদিন কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলে?”

সিনেমার গল্পটা এতদিনে সবার জানা হয়ে গিয়েছে, তাই নতুন করে আর বলছি না। তবে ফোয়ারা আর ওর বন্ধুরা আমাকে দুটো ঘন্টার জন্য ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আমার ফেলে-আসা কৈশোরবেলায়। বন্ধুদের সঙ্গে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া, মেয়েদের ঝাড়ি মারা, বন্ধুর প্রেমিকা দেখে ঈর্ষায় দীর্ঘশ্বাস ফেলা, জানালার ফাঁক দিয়ে পাশের বাড়ির দাদা-বৌদির অ্যাডাল্ট শো, আরো নানারকম ‘নিষিদ্ধ’ অ্যাডভেঞ্চার দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আহা রে, আবার যদি সেইসব দিনগুলো ফিরে পাওয়া যেত! ফোয়ারা আর তিতিরের দৃশ্যগুলো খুব মিষ্টি। বিশেষ করে প্রথম সিনটা, যেখানে ফোয়ারা ওর নাম বলার পরে তিতির খিলখিল করে হেসে বলে ওঠে, “তোমার নাম ফোয়ারা? জল পড়ে?”

বন্ধুত্ব আর কৈশোরের প্রেম ছাড়াও এই ছবিতে মা-ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে, জীবনযুদ্ধে হেরে-যাওয়া একজন ফুটবল কোচের মরণপণ লড়াই আছে, কপালে চন্দনের ফোঁটা নিয়ে ট্রটস্কি আওড়ানো কমিউনিষ্ট নেতা আছে, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ বুলি কপচানো পাড়ার মাস্তান আছে, আলাভোলা যুবকের চৌকস মেয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়া আছে, বন্ধুবিচ্ছেদ আছে, সুখ-দুঃখ আছে, মাপা হাসি এবং চাপা কান্নাও আছে। অনিন্দ্য এই পুরো ব্যাপারটা খুব নিপুণভাবে বেঁধেছেন। ছবির সংলাপ বেশ বুদ্ধিদীপ্ত এবং ঝরঝরে।

দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকটা প্রেডিক্টেবল, খানিকটা মেলোড্রামাটিকও বটে। ‘অবিবাহিত মায়ের’ কনসেপ্টটাও না আনলে চলতো। তবে এইসব ছোটোখাটো খামতি ছাড়া প্রথম ছবি হিসেবে অনিন্দ্য ভালভাবেই উৎরেছেন। “পাগলা খাবি কি”, “ওপেন টি বায়োস্কোপ” এবং অনুপমের “বন্ধু চল” গানগুলো খুবই শ্রুতিমধুর।

সবশেষে আসি অভিনয়ে। চার বন্ধু ফাটিয়ে অভিনয় করেছে। ঋদ্ধি সেন, ধী মজুমদার, ঋতব্রত মুখার্জী আর রাজর্ষি নাগ, চারজনেই অনবদ্য। সুরঙ্গমা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ মিষ্টি। ফোয়ারার মায়ের ভূমিকায় সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং ফুটবল কোচের ভূমিকায় রজতাভ দুর্দান্ত। এছাড়া ছোটছোট রোলে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অম্বরীশ মুখার্জী, সোহিনী সরকার, অপরাজিতা আঢ্য, কৌশিক সেন, বিশ্বনাথ বসু – সকলেই চমৎকার। ন্যাচারাল এবং সাবলীল অভিনয়ে সবাই মাতিয়ে দিয়েছেন।

সিনেমার এন্ড ক্রেডিটে ফের “বন্ধু চল” গানটা বাজছিল। সুখ এবং দুঃখ মেশানো একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল গানটা শুনে।

মনে হল নিজের একটুকরো কৈশোরকে যেন খানিকক্ষণের জন্য কেউ ফিরিয়ে দিয়েছিল, আবার নিয়ে নিয়েছে।

Latest posts by অরিজিত ব্যানার্জী (see all)