image002

(প্রথম ভাগ) (দ্বিতীয় ভাগ)

বিড়াল কাহিনী – ৩

আমাদের বাগানটা ছিলো বেশ বড় – আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কুল, নারকেল, সুপারি, লিচু, জামরুল, কলা, চালতা, ফলসা, সবেদা, বাতাবি লেবু আরো হরেকরকম ফলের গাছে ভরা ছিল জায়গাটা। ফুলের গাছও  ছিলো অনেক রকমের – হাস্নুহানা, কদম, গোলাপ, দোপাটি, কাঞ্চন, অপরাজিতা, মাধবীলতা, বোগেনভলিয়া, জবা, রঙ্গন, গন্ধরাজ……  এ ছাড়া ইউটিলিটি সব্জি, যেমন লাউ-কুমড়ো, লঙ্কা, পেঁপে, ডুমুর, পালং/পূঁই/কলমী, ওল-কচু, বেগুন, থানকুনি, ইত্যাদি তো ছিলই। এতো বড়ো বাগান ওই অঞ্চলে আর কোথাও ছিলনা। সে’জন্যে অনেক সময় সাপ-খোপ, পেঁচা, বাদুড়েরও উপদ্রব হতো। মাঝে মাঝে ‘শোড়েল’ বলে শিয়ালের মতো এক জন্তু রাতের বেলা এসে হানা দিতো। তার গায়ে থাকতো এক বিশ্রী রকমের গন্ধ, যা বহুদূর থেকে নাকে আসতো। আর তা থেকেই বুঝতে পারতাম যে বাগানে শোড়েল ঢুকেছে! তখন টর্চ, লাঠি-সোঠা নিয়ে বাগানে গিয়ে তাড়া করা হতো। বাদুড়রা অন্য কোথাও থেকে ‘বাক্স বাদাম’ নিয়ে এসে রাতের বেলা গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে খেতো। কিন্তু বাক্স বাদামের খোলা খুলে খাওয়া সহজ কথা নয় – তাই বেশিরভাগ সময় ওরা কিছুটা চিবিয়ে বাদামটা ফেলে চলে যেতো। পরের দিন সকালে গিয়ে আমরা সেই সব বাদাম খুঁজে খুঁজে বাড়িতে নিয়ে এসে ভালো করে ধুয়ে, হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে খেতাম। খেতে আহামরি হয়তো তেমন ছিলো না, কিন্তু সেই বয়সে এই ভাবে বাদাম খোঁজার মধ্যে বেশ একটা রোমাঞ্চ লুকিয়ে থাকতো। যাই হোক সেই বাগানে মাঝেমাঝেই বাইরে থেকে একটা কুকুর এসে তার প্রাত্যহিক কৃতকর্ম করে যেতো। বাগানের চারদিকে পাঁচিল থাকলেও, ঢোকার মুখের যে গ্রীলের গেট-টা ছিলো, সেটার মধ্যে দিয়ে কুকুর অনায়াসেই গলে যেতো পারতো। ঢিল ছুঁড়ে, বা তাড়া করেও সেই কুকুরকে ভয় দেখানো যায় নি। তাছাড়া কুকুরটা ছিলো অত্যাধিক চালাক। সে যেন আগে থেকেই  জানতো যে কোথায়, কখন, বা কে তাকে লক্ষ্য করছে।

সেই সময়ে আমাদের বাড়িতে যে পুঁচকে বিড়ালটা ছিলো, সে বয়সে তখন বড়ো জোর তিন কি, চার মাস হবে। প্রচন্ড চটপটে আর ফুল অফ এনার্জি ! সেও কেমন করে জানি  বুঝে গিয়েছিলো যে আমরা কুকুরটাকে ভয় দেখাতে চাই। বাগানের ঘাসগুলো ছিলো বিড়ালের থেকে উঁচু হাইটের – তাই ঘাসের মধ্যে বসে থাকলে তাকে চট করে খুঁজে পাওয়া যেতো না। একদিন আমি বাড়ির দোতলা থেকে লক্ষ্য করলাম যে কুকুরটা বাগানে ঢুকে যথারীতি তার পছন্দ মতো জায়গা খোঁজা শুরু করেছে। সবে ভাবছি যে নিচে নেমে তাড়া করবো, এমন সময় দেখলাম আমাদের সেই পুঁচকে বিড়ালটা ঘাসের মধ্যে দিয়ে খুব আস্তে আস্তে কুকুরটার পিছনে যাচ্ছে। এত নিঃশব্দে যাচ্ছে যে কুকুরটা খেয়ালও করেনি। কুকুরটা যেই তার কৃতকর্ম শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় বিড়ালটা তার পিছনে এসে হঠাৎ ‘ম্যাঁওওও’ বলে একলাফে নখ দাঁত বার করে, কুকুরের পিঠে চড়ে বসলো – ঠিক যেমন ঘোড়ার পিঠে সহিস উঠে বসে! কুকুরটা এই অতর্কিত আক্রমনের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না। সে ব্যাটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে, প্রাত:কৃত্য বাকি রেখেই ‘কেঁউ কেঁউ’ করতে করতে দিলো এক লম্বা দৌড়। একবার ফিরেও দেখলো না যে তার প্রতিপক্ষ একটা ছোট্ট পুঁচকে বিড়াল….. সেই যে সে পালালো, আর কোনদিনও তাকে বাগানে ঢুকতে দেখিনি। আমরা সবাই মিলে কুকুরটাকে যা শেখাতে পারিনি, ঐ ছোট্ট  বিড়াল তা একদিনেই করে ফেলেছিলো। অনেক সময় শাসন করেও যা শেখানো যায় না, ভয় দেখিয়ে তা কিন্তু সহজেই আদায় করে নেওয়া যায়!

এই একই বিড়াল আরেকটু বড় হয়ে অচেনা এবং ভীতু মানুষদের ভয় দেখাতো – বিশেষ করে একা একা যাওয়া-আসার সময়। সে, কোথাও কিছু নেই, আচমকা ছুটে এসে পায়ের হাঁটুর কাছের মাংস ধরে একটু ঝুলেই পালিয়ে যেতো। অনেক সময় তার নখের আঁচড়ে রক্ত পর্যন্ত বার হয়ে যেতো। কিন্তু বকে বা মেরে তার এই দুঃসাহসিক খেলা বন্ধ করা যায় নি। আমাদের বাড়ির বাইরের গ্রীলের গেট থেকে পুকুরের দিকের দরজা পর্যন্ত আসতে যেটুকু গলি মতো ছিলো, সেই জায়গাটাতে ছিলো তার অবাধ রাজত্ব। চেনা-জানা মানুষদের যাওয়া আসার সময় সে কোনো ভ্রুক্ষেপ করতো না। কিন্তু অচেনা আর ভিতু মানুষদের কাছ থেকে সে মাশুল নিয়েই  ছাড়তো। আমার দুই ভাগ্নী আমাদের বাড়ির কাছাকাছিই এক ভাড়া বাড়িতে থাকতো। তারা প্রায় প্রতি বিকেলেই আমাদের বাড়িতে খেলতে আসতো, কারণ বাড়িতে একটা বড়ো উঠান ছিলো, আর তাদের সমবয়সী আরো অনেকই সেখানে খেলতে আসতো। এদের মধ্যে ছোটোজনটি ছিলো কম্পারেটিভলি বেশী ভীতু। সেটা বিড়ালটাও না-জানি কেমন করে বুঝে গেছিলো। তাই তারা যখন দু’জনে আমাদের বাড়িতে ঢুকতো, সে ওই ছোটোজনকেই টার্গেট করতো। কোথায় যে সে ওদের জন্যে লুকিয়ে ওয়েট করে থাকতো, তা তারা কিছুতেই ধরতে পারতো না!  আর বড়োজনও তাই ছোটবোনকে গার্ড হিসাবে পাশে পাশে রেখে হাঁটতো! বিকেলবেলাতে আমরা অপেক্ষা করতাম ওদের জন্যে – যেই শুনতাম ‘ মামা, বিড়ালে কামড়ে দিলো  গো‘  বলে এক বিকট আর্তনাদ… তখনি বুঝে যেতাম যে তারা এসে গেছে। ফেরার সময়ও হতো এই একই ঘটনার পুন:প্রচার। তাই অনেকদিনই ফেরার সময় ওদেরকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে হতো। সুতরাং ‘হাইড-এন্ড-সীক’ কেবল যে মানুষরাই খেলে, এটা ঠিক কথা নয়। এতো রসিক বিড়াল আমাদের বাড়িতে আর দুটো আসেনি!

(চলবে)

Latest posts by কুন্তল মন্ডল (see all)