ছেলেবেলার দিনগুলো একটু নয়, এখনকার থেকে বেশ অনেকটাই অন্যরকমের ছিলো। সে সময় না ছিলো কোনো আই-ফোন/আই-প্যাড, না ছিলো কোনো ভিডিও গেমস বা স্যাটেলাইট চ্যানেলের-র দৌরাত্ম্য। কিন্তু তাতে মনে হয় না যে কোনো কিছু মিস্ করেছি। আমাদেরকে ঘিরে থাকতো একরাশ নি:স্বার্থপর মানুষের দল – যাঁরা কোনো কিছুর প্রত্যাশা না করেই আমাদের ছেলেবেলার প্রতিটি দিনকে ভরিয়ে তুলতেন হাসি-ঠাট্টা-খেলা-গল্প-গান-আনন্দ দিয়ে। আর ছিলো অসাধারন সুন্দর রাশি রাশি গল্পের বই – রূপকথা, পক্ষীরাজ, ভুত-প্রেত, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, ঠাকুরমার ঝুলি, চাঁদমামা, সন্দেশ, আনন্দমেলা, শুকতারা, আরব্য রজনী. . . . দিগন্ত জোড়া মাঠ-গাছ-পালা, চোখ জুড়ানো শীতের নীলকাশ, শরতের আকাশে মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, কাশফুলের ভারে পথ হারিয়ে যাওয়া, কার্তিক মাসের হিমেল হাওয়ায় চাদর গায়ে বসে আচার খেতে খেতে গল্পের বই পড়া, হেমন্তের বিকেলে সূর্য্যের ঝুপ্ করে হঠাৎ ডুবে যাওয়া, বসন্ত-বিকেলের ঝিরঝিরে বাতাসে মন হারিয়ে যাওয়া, বর্ষার ঘনঘটায় আকাশ কালো করে বৃষ্টির উদ্দাম নাচন, কালবৈশাখীর দাপট উপেক্ষা করে কাঁচা আম কুড়ানো, ভরা-বর্ষায় কলাগাছের বানানো ভেলায় চড়ে পুকুরে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো, সুপারি গাছের শুকনো খোলা-কে ‘Go-Cart’ বানিয়ে খেলা, চেনা রাস্তা ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে সম্পূর্ণ অচেনা অঞ্চলে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যাওয়া – আরও কত্তো কি!

আমরা ছিলাম একান্নবর্তী পরিবার – জ্যাঠা-পিসেমশাই-কাকা-মামা আরও মজার মজার সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনে আমাদের গোটা বাড়িটা সারা বছর ধরেই গমগম করে থাকতো। বাড়িতে সেই সময় বেশ কয়েকটা গরু, একটা সাদা বিড়াল আর একটা কুকুর ছিলো। ছোটোবেলা থেকেই বিড়ালের প্রতি আমার একটা বিশেষ টান গড়ে উঠেছিলো  – কেন তা ঠিক জানিনা। যদিও ভালো করেই জানতাম যে ডিপথেরিয়ার মতো মারাত্মক কিছু অসুখ বিড়ালের থেকেই হয়। আমাদের পরিবারের সকলেই কম-বেশি বিড়াল পছন্দ করতো। একটাও বিড়াল নেই এরকম সময় আমার ছোটোবেলার জীবনে খুব কমই এসেছিলো। অদ্ভুত শোনালেও আমাদের বাড়ির সব কটা বিড়ালের নাম-ই ছিলো এক: ‘মেনি’ ! এমনও হয়েছে যে বিড়ালটা ছিলো এক হুলো বিড়াল, কিন্তু তাকেও অনেকে ওই  একই ‘মেনি’ নামে ডাকতো। এই বিড়াল নিয়ে বেশ কিছু মজার ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে, তার কয়েকটা এখানে গল্পচ্ছলে বলার চেষ্টা করলাম – তবে এই সব কটা ঘটনাতেই যে একই বিড়াল জড়িত ছিলো, তা কিন্তু নয়।

বিড়াল কাহিনী – ১  

আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা বেশ বড়ো পুকুর ছিলো। পুকুরে নামার মুখে বসার জন্যে সিমেন্টের বাঁধানো চারখানা সিট, আর বেশ অনেক কটা ধাপ-ধাপ কাটা সিঁড়ি ছিলো। গ্রীষ্মকালের বিকেলগুলোতে আমরা এই সীটগুলোতে এসে বসতাম। সারা দিনের দাবাদহের পরে বিকেলবেলার দিকে পুকুর থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়াতে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যেতো। বাবা এই পুকুরে মাছের সীজনে নানান রকমের চারামাছ ফেলতেন – ট্যাংরা, কই, মৃগেল, রুই, বাটা, সিলভার কাপ, আরও কতো কি।  বাঁক কাঁধে করে জেলেরা এসে ভালো ভালো কথা বলে মাছ গছিয়ে দিয়ে যেতো, যার বেশির ভাগ-ই পরে দেখা যেতো খুব নিম্ন মানের। সাইজে খুব একটা বাড়তো না, আর স্বাদও ছিলো বেশিরভাগ সময়ে বাজারের কেনা মাছের থেকে অনেক খারাপ। হয়তো আমাদের পুকুরের মাটি, বা জলেরও তেমন গুণ ছিল না। সে যাই হোক, এইসব চারা-মাছেরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতো। পুকুরের ধাপ কাটা কাটা সিঁড়িগুলোর একদম শেষ সিঁড়িতে, জলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হতো এঁটো-কাঁটা থালা-বাটি, হাঁড়ি-কড়াই। সেই সব বাসনপত্রে লেগে থাকা খাবারের লোভে মাছেরা দল বেঁধে সিঁড়ির কাছে এসে হানা দিতো। এমনও হয়েছে যে একদিকে মানুষজন হাত-পা ধুইছে, আর অন্যদিকে মাছেরা দল বেঁধে নিশ্চিন্তে খাবার খেয়ে যাচ্ছে। হয়তো বাচ্চা-মাছ বলেই মানুষের প্রতি অতোটা ভয় তখনো তাদের মধ্যে জেগে ওঠেনি।

সবাই জানে মাছের প্রতি আছে বিড়ালের চিরন্তন লোভ। আমাদের বিড়ালটাও মাছেদের এই বাড়াবাড়ি সাহস লক্ষ্য করেছিলো। এক বিকেলবেলায় সীটে বসে গল্পবই পড়ার জন্যে এসে দেখলাম যে বিড়ালটা সিঁড়ির একদম শেষ ধাপে মূর্তির মতো বসে, একমনে জলের দিকে চেয়ে আছে। বুঝলাম যে সে ওখানে আসা মাছেদেরকে লক্ষ্য করে চলেছে। আমি কয়েকবার ডেকেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলাম না। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলো – আমি তখন হাতে থাকা গল্পের বইতে ডুবে গেছি। হঠাৎ চমকে উঠলাম বড়সড় একটা ঝাপ্টাঝাপ্টির আওয়াজে। দেখি আমাদের বুদ্ধিমান বিড়াল জল থেকে দ্রুত উঠে আসছে – ভিজে একেবারে নেটিসাপটা! বুঝলাম মাছ ধরার প্ল্যান করে সে জলে ঝাঁপ মেরেছেন, কিন্তু মাছেরা যে তার থেকেও বেশি বুদ্ধিমান আর সুইফ্ট, সেটা ওর ছোট্ট মাথায় আসেনি! অগত্যা যা হবার তাই হয়েছে। মাছের দল দিব্যি পালিয়ে গেছে, আর সে অসময়ে জলে ঝাঁপ মেরে বৃথাই নাকানি-চুবানি খেয়ে, গোবর গনেশ হয়েছে – কোনো মাছই সে ধরতে পারেনি! সেই প্রথম আমার জীবনে দেখা কোনো বিড়ালের স্বেচ্ছায় জলে অবতরণ! এর পরে অবশ্য আর কোনদিনও তাকে এই একই ভুল করতে দেখিনি।

(চলবে)

দ্বিতীয় ভাগ

Latest posts by কুন্তল মন্ডল (see all)