আমি বলেছিলাম, বলেছিলাম আমি ওইসব আলফাল অশুভ রদ্দি জিনিস প্যান্ডেলের ধারেকাছে না রাখতে।

ফুঁসে ওঠে মাতব্বর গোপাল, পূজো কমিটির সেক্রেটারি, চিমনির মতো ক্লাসিকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। রাত বারোটা। শহরতলি। পাশের বারোয়ারীতে এতক্ষণ বলিউডি গান বাজছিল। আপনার বাড়ির দামি সাউন্ড সিস্টেমে এই সঙ্গীত হয়তো খোলতাই হয়, পদ্মের পাপড়ির মতো পরতে পরতে উন্মোচিত হয় সুর।কিন্তু, শহরতলির বারোয়ারীতে বাজানো হয় অ্যালুমিনিয়ামের তোবড়ানো অ্যামপ্লিফায়ার। তার কর্কশ আর্তনাদ শরৎকালের শ্যামলী নৈঃশব্দ্যকে কসাইয়ের মতো হালাল করে। কোথায় যেন হারিয়ে যায় বাঁশঝাড়ের স্নিগ্ধ মর্মর। কারো মনে এতটুকু স্বস্তি থাকে না। সবাই চিন্তা করে সকালের দুর্ঘটনার কথা।

দেবীর বোধনের ঠিক পরপরই ঘটনাটি ঘটেছিল। আধপাগল মদন দেবীর সাজসজ্জা জরিপ করে নিচ্ছিল, যদিও এ কাজের ভার তাকে কে দিয়েছিল বলা মুস্কিল। প্রতিমার কাঠামোর আড়ালে কিছু দেখে ও হাঁটু গেঁড়ে বসে পরে, অবাক ভয়ে কেঁপে ওঠে আর চেঁচিয়ে উঠতে গেয়া তোতলাতে থাকে,

– ম-ম-ম-মাথা, কাট-কাটা মাথা! দুর্গার কাটা মাথা,পুজো থামাও!!!

– কি বললি? কার মাথা? কোথায়?

– দুর্গার মাথা? পাগল শালা, দুর্গার মাথা তো ঘাড়ের ওপরই আছে বে? পুজোর সময় ঠাকুরের নামে এসব বলছিস?

– না! না! ইদিকে এসে দেখে যা! আর একটা মাথা। দুর্গার। ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে। গোপালদাকে ডাক সবাই… গোপালদাগো! বাড়িতে খবর দাও গো… মদন মরে যাবে।

সেটা সকালের ঘটনা, এখন রাত বারোটা। সন্ধ্যের ভিড়টা এখন এই ছোটো মফস্বল ছেড়ে কলকাতার দিকেসরে গেছে, এখানে জনপ্রাণী নেই, শুধু এল ই ডি আলোর মালায় সাজানো শূন্য পথ। মাতব্বর গোপাল দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

– আগেই বলেছিলাম ওইসব আলফাল অশুভ রদ্দি জিনিস প্যান্ডেলের ধারেকাছে না রাখতে…

কেউ একজন ফোড়ন কেটে ওঠে,

– মুখে এনো না তোঅই রদ্দি মেয়েছেলের কথা। হটিয়ে দাও ওর জিনিস প্যান্ডেল থেকে।

পূজো কমিটির রাতজাগা ছেলে মেয়েরা ঘৃণাভরে অশুভ জিনিসটি দ্যাখে, থুতু ছিটকে পড়ে রাস্তা পার হয়ে নর্দমায়। আসলে ততটা ধার্মিক এদের কেউ-ই নয়, সবার রাগ এই মউজ মস্তির দিনটা একটা বিটকেল বিপর্যয়েবরবাদ হয় যাওয়ায়। পাঠক, আপনিও তাকান ওই অশুভটির দিকে। কি দেখছেন? প্যান্ডেলের পিছনে এঁদো গলির নর্দমার ওপর ঘাস, ঘাসের ওপর ব্লিচিং পাউডার। মহালয়ার আগে অবধি এই তৃণরাশি চাপা ছিল মেথরের তোলা পাঁকে,ডাবের খোলায়। নোংরা জলে ছপছপ করতো অন্ধকার গলি। অন্ধকারে আর একটু হাতড়ে দেখুন। হ্যাঁ, ওই নীলচে ভাঙাচোরা স্কুটিটির দিকেই আমরা চেয়ে আছি। ১৯৯৯ মডেলের বাজাজ স্পিরিট। ইঞ্জিন এখন আর চালু হয় না, অবশ্য সাইলেন্সর অনেক আগেই ফেটে গেছিল। কোথায় আজকে এর বিষণ্ণ আরোহিণী? কখন ফাটা সাইলেন্সরে বিকট আওয়াজ তুলে, কখনো মাঝরাস্তায় খারাপ হওয়া স্কুটি ঠেলতে ঠেলতে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে তুমি।

দিলাইলা, আজ তুমি কোথায়? রাত বারোটা বেজে গেছে আর ঠিক এই সময়ই ফিরতে নিজের ঘর।তোমার সেকন্ডহ্যান্ড লজঝড়ে স্কুটির ফাটা সাইলেন্সরের আওয়াজে জেগে যেত পাড়া; পাড়া-ঘরের মানুষের মধুর সম্ভাষণ বর্ষিত হত তোমার ওপর। বাইপাসের পাঁচতারা বারের নর্তকী দিলাইলা, দিনের শেষে প্রোমোটার, মন্ত্রী, যুবনেতা, ব্যর্থ নেতার মনোরঞ্জনের মক্ষীরানী  দিলাইলা – তোমার ছিল অসংখ্য পরিচয়– দারিদ্র, ধর্ম ও পেশার ট্যাবুতে একঘরে পরিবারে একমাত্র রুটি রোজগারি দিলাইলা, উদ্ধত মরালী গ্রীবায় উল্কির আলপনাময় দিলাইলা। আঙুরলতার মত দেহ-বল্লরী ও ফিনফিনে শাড়িতে আত্মবিশ্বাসী, অযত্নে খড়ি ওঠা মুখে বিষণ্ণ দিলাইলা। রেলকলোনির পেটমোটা মাস্তানরা তোমার পাশে ঘুরঘুর করার আছিলায় থাকতো, তবে মরালীর মতো ঋজু তোমার পাশে তারা কি নেহাতই লিলিপুট ছিল  না?

বারোটা বেজে দশ। পুজো কমিটির সদস্যা মৃত্তিকার মাথায় এসকটা কূট প্রশ্ন খেলে যায়, ও নিজেও যদি বার ড্যান্সার হতো? ওরবাবা যদি সরকারি আমলা না হয়ে মাতাল জ্যাকবের মতো শয্যাশায়ী হতো? আদরের মেয়েকে ডার্লিং না বলে জ্যাকব যেমন নিজের মেয়েকে রেন্ডি বলে তেমন বলতো? মুখ কুঁচকে যায় মৃত্তিকার। দিলাইলাকে তার মনে হয় আরশোলার মতো গা ঘিনঘিনে কোনো জীব। মনেমনে ভাবে,

– হাড় হাভাতেটা নেচে কুঁদে সিন্ডিকেট মাফিয়াদের মাতিয়ে রাখতো! কীভাবে? কিছু সস্তা মাঙ্কি ট্রিক্স ?

পাঠিকা, বলুন দেখি, কলকাতার পানশালার নর্তকীরা কি ব্যালেরিনা? লাল টকটকে পোশাকে চঞ্চলা ফ্লেমেঙ্কো ট্যাপ ড্যান্সার ? নাহ্, এসব কিছুই না, মহীয়সীকোনও শিল্পের চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় নিজের একটি ঘর ও অর্থের, দুধ- ভাত- কাপড়ের। লিভার সিরোসিসের লাস্ট স্টেজে মৃত্যুপথযাত্রীজ্যাকবের এঁটো বাসন দিলাইলা রাস্তার কলে ধুয়ে রাখতো, বাসনের ওপরই ঘুরতহড়হড়ে আরশোলা, ঘামে ভেজা  দিলাইলার গলার ট্যাটুও আরশোলার বাদামী শরীর বলে ভুল হোতো, হয়তো আরশোলার সঙ্গে ওর তফাৎটা শুধু অ্যানাটমিতে ছিল।

ওই যে মৃত্তিকার গা ঘেঁষে মাতব্বর ছাত্র নেতা সমু বসে, ওকে কি মনে নেই তোমার? কলেজ ফেস্টের রাতে তোমার শো ছিল না, দিলাইলা? তারপর, সমু গ্রিনরুমে লুকিয়ে আকণ্ঠ হুইস্কি গিলে তোমাকেকি জাপটে ধরেনি? রাখেনি কি তোমার ঠোঁটে ঠোঁট, বুকে হাত? তোমার মনে কি প্রেম ছিল, মেয়ে? আমাদের বলবে সে কথা? আমরা তোমার পায়ের কাছে বসে শুনব সে কথা। তবে কি জানো, ধুতিতে, তসরের পাঞ্জাবীতে সমু আজ ভদ্র ঘরের ছেলে।

মহাষষ্ঠীতে মণ্ডপে রাত এগিয়ে যায়। যে ধড়হীন মৃন্ময়ী মাথাটি কাঠামোর পিছনে পাওয়া গেছিল, সেটিও দেবী দুর্গার। মূল প্রতিমা অক্ষত, কিন্তু দেবীর ছিন্নমস্তা অবতার যেন কি আক্রোশে করেছেন নিজেরই শিরশ্ছেদ। ভারী শোরগোল পড়ে গেছিল, পুরোহিত পাতা উল্টেদোষ-স্খলনের বিধান দেন।

মহাসপ্তমীর ভোর হয়ে আসে। কোনও পুজোবাড়ি থেকে ভেসে আসে অনুপ জালোটার কণ্ঠে,

“আইসি লাগি লগন, মীরা হো গয়ী মগন্”

ভেসে আসে সে সুর,

“রাণা নে বিষ দিয়া, মানো অমৃত্ পিয়া

মীরা সাগরমে সরিতা সমানে লাগি

দুখ্ লাখ সহে, মুখ সে গোবিন্দ কহে

মীরা গোবিন্দ গোপাল গানে লাগি”

দিলাইলা, তোমার লাশ যেদিন গঙ্গায় ভেসে ওঠে একটা ব্যাপারে পুলিশ প্রথম থেকেই নিশ্চিত ছিল। তুমি নিজেই নিজের মুখে অ্যাসিড ঢালো নি, অন্য কেউ অ্যাসিডের বোতল খালি করে দিয়েছিলো। তোমার পটে আঁকা মুখখানির চামড়া মাংস গুটিয়ে হাড় বেরিয়ে গেছিলো। দেবী দুর্গার অবশ্য কিছুই বলার ছিল না, দেবী ছিন্নমস্তা নিজেই নিজের মাথা কেটে ফেলেছেন, তার দেখারও কিছু ছিল না। মৃত্যুই কি নয় সেই স্যামসন, যাকে তুমি প্রেমে প্রতারিত করতে চেয়েছিলে? দিলাইলা?

 

Latest posts by সৈকত দাস (see all)