শিউরে উঠে টিভিটা বন্ধ করে দিলাম। রোগা পাতলা চেহারার একটা ছেলেকে মাটিতে ফেলে মারা হচ্ছে, আহত একটি মেয়ের নাক ফেটে দরদর করে রক্ত ঝরছে – দৃশ্যটা সহ্য করতে পারলাম না।

বুধবার সকাল থেকে বঙ্গবাসী বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে হাজারবার এই দৃশ্য দেখে ফেলেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নামকরা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে পুলিশ এবং অ-পুলিশ(নাম গোত্র পরিচয়হীন) কিছু ব্যাক্তি, ছাত্র ছাত্রী নির্বিশেষে অবাধে মারধোর করছে। একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভের যে এই পরিনতি হতে পারে, সেটা কল্পনারও অতীত।

এর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে শহর…যাদবপুর থানার সামনে বুধবার সকাল থেকেই হয়েছে দফায় দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন, সহ-উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে বের করা হয়েছে বিশাল মিছিল, তাতে অংশ নিয়েছেন বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবি। শিক্ষা মন্ত্রী পু্রো ঘটনার বিশদ বিবরণ সমেত রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন সহ-উপাচার্যের কাছে।

না, আমি যাদবপু্রের ছাত্র নই, কোনদিন ছিলামও না। এমন কী আমার ছাত্র জীবনও শেষ হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগে। আহতদের মধ্যে আমার পরিচিত কেউ ছিল না। এই রাজ্যের সাড়ে চোদ্দ আনা মানুষের মত আমিও একজন অতি সাধারণ, নির্বিবাদী মানুষ, যার কাছে সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রযন্ত্র – এসবের কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, নিজের ও নিজের পরিবারের গ্রাসাচ্ছদনই যার জীবনের মূলমন্ত্র। এই সাড়ে সাতাশ বছরের জীবনে বেশ কিছু ঘটনা দেখেছি বা শুনেছি, যা একজন স্পর্শকাতর দেশবাসী হিসেবে আমার কাছে প্রতিবাদ দাবী করে, আমি সেসব দেখেও দেখিনি। কিন্তু এবার আর পারলাম না। অবস্থান বিক্ষোভের ওপর পুলিশী তান্ডব, সহ উপাচার্যের গা–বাঁচানো মন্তব্য, প্রশাসাক দলের ভূমিকা – এই সব কিছুই আমাকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ উপাচার্যের সংবাদ মাধমের কাছে করা দাবী অনুযায়ী, তিনি নাকি প্রাণ সংশয় হওয়ায় পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন, এবং পুলিশ নাকি আদৌ মারধোর করেনি, উলটে বিক্ষোভকারীরাই নাকি পুলিশের গায়ে হাত দেয়। ওনার চেয়ার এর প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেও একটা প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি – স্যার, আপনি কি ভুল করে খবরের চ্যানেলের মাইক গুলো কে ‘মীরাক্কেল’ এর অডিশান ভেবেছিলেন ?

পুলিশ দাবি করল, তারা নাকি লাঠি হাতে ক্যাম্পাসে ঢোকেনি, কিন্তু ভিডিও ফুটেজে তাহলে আমরা কী দেখলাম পুলিশের হাতে?

আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছাত্রী ও ছিল, যদিও সেদিন পুলিশের দলে কোন মহিলা পুলিশ ছিল না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুলিশের ঢোকার অধিকার নেই, কিন্ত পুলিশ ঢুকল এবং প্রায় জনা চল্লিশেক পড়ুয়া হাসপাতালে ঠাঁই পেল। প্রায় বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গেলেও কোন স্পষ্ট সমাধান সূত্র বার হল না। খোদ কোলকাতা শহরের বুকে, যাদবপুরের মত এশিয়া খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঘটনা কি যথেষ্ট নিন্দনীয় নয় ?

জোরালো প্রতিবাদ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে…বিভিন্ন সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও তার আঁচ টের পাওয়া যাচ্ছে। একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে আমিও আমার মত করে প্রতিবাদ রাখলাম এই পাতায়। আশা রাখবো এই আন্দোলন যেন তার দিশা হারিয়ে না ফেলে।

আর যাই হোক, শহরে যেন আরেকটা মোমবাতি মিছিল না হয়।

Latest posts by কূপমন্ডুক (see all)